Wednesday, 15 March 2017

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন দিকে যাচ্ছে?

১৫ মার্চ ২০১৭
http://i.ndtvimg.com/mt/2015-01/barackObama_NarendraModi_hug_650_afp.jpg
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে ভারত ধীরে ধীরে আবারও পশ্চিমমুখী হতে শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় থেকে এই প্রসেস শুরু হলেও মূল কাজ শুরু হয় নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে। বারাক ওবামাকে অতি-উতসাহে জড়িয়ে ধরে মোদি সারা বিশ্বে কাছে সেই বার্তাটাই দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে মার্কিনীরা দুর্বল হয়ে যাবার পরে ভারত “প্রভুহীনতা”য় ভুগছে। মার্কিনীরা ভারতকে পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি সত্যি, তবে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে জর্জরিত থাকা এবং একটির পর একটি ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দেয়ার পর থেকে দিল্লী চিন্তায় রয়েছে। মার্কিন ক্রীড়নকে পরিণত হবার পরপরই ভারতের এহেন প্রভুহীনতা এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যা ভারতকে তার দুর্বলতাগুলিকে আরও বেশি প্রকাশ করতে বাধ্য করছে।


বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গেলে ভারতের বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে প্রথমেই, যেগুলি ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করতে প্রতিনিয়ত। এর মাঝেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের সূত্র।

ভারতের দৌর্বল্য

ভারত দুর্বল দেশ। আকৃতিতে বৃহৎ হলেও ব্রিটিশরা জানতে যে একত্রে রাখা হলে এই দেশ সবসময় দুর্বল এবং পশ্চিমের অনুগত থাকবে। এতো ভাষা, জাতি, বর্ণ, এলাকাভিত্তিক জাতীয়তা, আদর্শিক বিভেদ, এমনকি রাজ্যে-রাজ্যে দ্বন্দ্ব পেরিয়ে ভারতের পক্ষে যে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়া সম্ভব ছিল না, সেটা ব্রিটিশরা জানতো। ১৯৭০-এর দশকে অবশ্য ব্রিটিশদের এই চিন্তাটাই তাদের জন্যে সমস্যার জন্ম দিয়েছিল। ব্রিটিশরা দুর্বল হয়ে পড়ার পরে কিছু সময়ের জন্যে ভারতে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে ভারত ধীরে ধীরে আবারও পশ্চিমমুখী হতে শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় থেকে এই প্রসেস শুরু হলেও মূল কাজ শুরু হয় নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে। বারাক ওবামাকে অতি-উতসাহে জড়িয়ে ধরে মোদি সারা বিশ্বে কাছে সেই বার্তাটাই দিয়েছিলেন। বিশ্ব জেনেছিল যে এখন থেকে মার্কিনীরা ভারতের সবচাইতে কাছের বন্ধু। কিন্তু বাস্তবতার দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে এই সম্পর্ক সমধিকারের ভিত্তিতে নয়; ঠিক যেমনটি ছিল ব্রিটিশদের সাথে ভারতের সম্পর্ক। ভারত কি কি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সহায়তা’ পাবে, সেটার চাবি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই। এভাবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগও মার্কিনীরা পেয়ে যায়। চীনকে ব্যালান্স করতে ভারতের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে যেমন ব্রিটিশদের দুর্বল হয়ে যাবার পরে ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের কোলের শিশুতে পরিণত হয়, ঠিক একইভাবে ২০১৭ সালে মার্কিনীরা দুর্বল হয়ে যাবার পরে ভারত “প্রভুহীনতা”য় ভুগছে। মার্কিনীরা ভারতকে পুরোপুরি ছেড়ে যায়নি সত্যি, তবে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে জর্জরিত থাকা এবং একটির পর একটি ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার’ দেয়ার পর থেকে দিল্লী চিন্তায় রয়েছে। মার্কিন ক্রীড়নকে পরিণত হবার পরপরই ভারতের এহেন প্রভুহীনতা এমন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যা ভারতকে তার দুর্বলতাগুলিকে আরও বেশি প্রকাশ করতে বাধ্য করছে।

ভারত কেন আগ্রাসী?

ভারতের আগ্রাসী মনোভাবকে অনেকেই বিরাট করে দেখলেও সেই আগ্রাসী মনোভাবের কারণ সম্পর্কে সকলে চিন্তা করেন না। অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হওয়ায় এবং তার এই দুর্বলতার সূত্র আশেপাশের দেশগুলিতে প্রোথিত থাকায় ভারত সবসময়ই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। দেশের মানুষকে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ”এ অভ্যস্ত করতে দেশটির নেতৃত্ব আজও কঠিন সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কিন্তু বারংবার ঐ একই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে ধূলায় মিশিয়ে দিচ্ছে। আর এই অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাহীনতাই ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির সাথে পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের আবির্ভাবের কথা। সসময় ভারতের অনেকগুলি ভয় একত্রে এসে একেবারে জাপটে ধরেছিল চারদিক থেকে। প্রথমতঃ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানী বাহিনীর হিন্দুদের উপরে অত্যাচার এবং তার কারণে মারাত্মক শরণার্থী সমস্যায় ভারতের অভ্যন্তরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। দ্বিতীয়তঃ পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীরা মনে করছিল বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করাটা তাদের নৈতিক দায়িত্ব, যা কিনা পশ্চিমবঙ্গের “ভারতীয় পরিচয়” নিয়েই টান দিয়েছিল। তৃতীয়তঃ ভারতের অভ্যন্তরের বাম আন্দোলনগুলি বাংলাদেশের অভ্যন্তরের বাম আন্দোলনগুলির সাথে এক হয়ে যদি সীমানা মুছে ফেলার চেষ্টা করে, তবে তো ভারতের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। চতুর্থতঃ কোটিখানেক শরণার্থীর চাপে ভারত অর্থনৈতিক যে চাপের মুখে পড়বে, তা ভারতের কোমড় ভেঙ্গে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট হতে পারতো। পঞ্চমতঃ কোটিখানেক শরণার্থী ভারতের অভ্যন্তরে আইনশৃংখলা পরিস্থিতিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতের পূর্বের রাজ্যগুলির মানুষেরা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মতো বাঙ্গালী শরণার্থীদের বরণ করেনি। তাদের ধারণা ছিল তারা বুঝি বাঙ্গালী জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাঝ দিয়ে ভারতের যে দৌর্বল্য প্রকাশ পেয়েছিল, তা সচেতন মানুষদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। ভারত যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করতে চেয়েছিল এই সমস্যাগুলি থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্যেই। মজার ব্যাপার হলো, ভারত এই সমস্যাগুলি থেকে পুরোপুরিভাবে বের হতে পেরেছে কিনা, তা আজও কেউ হলফ করে বলতে পারেন না।
http://images.indianexpress.com/2016/06/1971-1.jpg
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের আবির্ভাবের সময় ভারতের অনেকগুলি ভয় একত্রে এসে একেবারে জাপটে ধরেছিল চারদিক থেকে। সচেতন মহলের কাছে ভারতের দৌর্বল্য প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল তখন। মজার ব্যাপার হলো, ভারত এই সমস্যাগুলি থেকে পুরোপুরিভাবে বের হতে পেরেছে কিনা, তা আজও কেউ হলফ করে বলতে পারেন না।


ইন্ডিয়া ইজ ডিভাইডেড

শুধু বাংলা নয়, ভারতের এরূপ সমস্যা পুরো ভারত জুড়েই। ১৯৪৭ সালে হায়দ্রাবাদ ভারতের সাথে যোগ না দিয়ে নিজামের অধীনে একটি মুসলিম রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ভারত সরকার লাখো মুসলিমকে হত্যার মাধ্যমে এই রাজ্য দখল করে নেয়, যাতে অন্ততঃ পাকিস্তানের সাথে যেন এই রাজ্য যুক্ত হতে না পারে, অথবা পাকিস্তানের প্রভাবে যেন তারা না থাকে। পরবর্তীতে হায়দ্রাবাদের স্বাধীনতার চেতনার পূণরুত্থান যাতে না হয়, সেজন্য রাজ্যটিকে ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করে চারটি আলাদা রাজ্যের (কেরালা, অন্ধ্র প্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং মধ্যপ্রদেশ) মাঝে বিরতণ করে দেয়া হয়। ভাষার ভিত্তিতে ভাগ করতে গিয়ে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধের সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মতো একিরূপ চিন্তা করতে হয়েছিল তামিলনাড়ুকে নিয়ে। শ্রীলঙ্কার তামিলদের জন্যে স্বায়ত্বশাসন সমর্থন করলেও এলটিটিই-এর স্বাধীন তামিল রাষ্ট্রের ঘোর বিরোধী ছিল ভারত। কারণ তাতে ভারতের ছয় কোটি তামিলের নিজস্ব রাষ্ট্র গড়ার ইচ্ছার পূণর্জাগরণ হতে পারতো। এলটিটিই-এর ইচ্ছের বিরুদ্ধে যাবার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে প্রাণও দিতে হয়েছিল। এরপরে সিকিম ও কাশ্মীরের কথা তো বহুল আলোচিত। ভারতের দক্ষিণ থেকে পশ্চিমের বিরাট এক এলাকায় রয়েছে মাওবাদী গেরিলাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ, যা কিনা নেপালের সাথে যুক্ত হবার ভয় ভারতের। ভারতের উত্তর-পূর্বের ‘সেভেন সিস্টার্স’ তো মাত্র ১৫ মাইলের শিলিগুঁড়ি করিডোরের উপরে নির্ভরশীল। এই করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ভারত সিকিম দখল করেছিল। আর উত্তর-পূর্বের সেই রাজ্যগুলিতেও রয়েছে ভয়াবহ সশস্ত্র বিদ্রোহ, যা দমন করতে ভারতের সেনাবাহিনীর কয়েকটি ডিভিশন সর্বদা মোতায়েন রাখতে হচ্ছে। এমনকি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ভারতের সামরিক অভিযানও চলেছে বিদ্রোহী দমন করতে। আবার পূর্ব-পাঞ্জাবের সিকদের একবারের বিদ্রোহ দমন করার পরে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীরই প্রাণ গেছে।

এর উপরে আবার রয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ। কেন্দ্রের সরকার যদি এক দলের হয় আর রাজ্যের সরকার যদি আরেক দলের হয়, তাহলে রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য যায় ভেস্তে। এছাড়াও ভারতে রয়েছে আন্তরাজ্য কলহ। পানি নিয়ে দক্ষিণের রাজ্যগুলির মাঝে রয়েছে বিরোধ। পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে বিহারে বন্যা হয়েছে, তা এই দুই রাজ্যের সম্পর্ককে করেছে কন্টকময়। মোটকথা রাজ্যগুলির স্বার্থকে উপরে তুলে ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থই ভূলুন্ঠিত হয়ে যাচ্ছে অহরহ।

ভারতের বিশ কোটি মানুষ এখনও দুই বেলা খেতে পারে না। পৃথিবীর সবচাইতে বেশি মানুষ এই দেশে বসবাস করে, যারা খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করছে। ভারতের বড় শহরগুলির উঁচু দালানগুলি দেশটির আসল ছবি দেখায় না। দেশটিতে বিত্ত, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা, রাজনীতি এবং আদর্শের দ্বন্দ্ব ছাড়াও রয়েছে বর্ণগত বৈষম্য। এটা পরিষ্কারভাবেই বলা যায় যে ভারত অত্যন্ত দুর্বল একটি দেশ, যা আকারে বিরাট হলেও এর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সুপারপাওয়ার রাষ্ট্র তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ভারতের নিরাপত্তাজনিত ভয় দেশটির নেতৃত্বকে বারংবার আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ করিয়েছে। অথচ প্রতিবারেই ভারত আপাতদৃষ্টিতে নিজের স্বার্থ বাস্তবায়ন করলেও প্রকৃতপক্ষে সে সুপারপাওয়ারের স্বার্থই বাস্তবায়িত করেছে।


বৈষম্যের রাষ্ট্র ভারত

ভারতের বিশ কোটি মানুষ এখনও দুই বেলা খেতে পারে না। পৃথিবীর সবচাইতে বেশি মানুষ এই দেশে বসবাস করে, যারা খোলা স্থানে মলমূত্র ত্যাগ করছে। ভারতের বড় শহরগুলির উঁচু দালানগুলি দেশটির আসল ছবি দেখায় না। দেশটিতে বিত্ত, ধর্ম, ভাষা, জাতীয়তা, রাজনীতি এবং আদর্শের দ্বন্দ্ব ছাড়াও রয়েছে বর্ণগত বৈষম্য। হিন্দু ধর্মে বর্ণপ্রথা একুশ শতকে এসেও তৈরি করছে নানা জটিলতার। দলিত সম্প্রদায়, প্যাটেল সম্প্রদায়, ইত্যাদি সমস্যা নিয়মিতই আসছে মিডিয়াতে। সাম্প্রদায়িক এই সমস্যা নিয়ে দেশটির সামরিক নেতৃত্বও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কারণ দেশটির সামরিক বাহিনীকে এক হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টাটাই তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতে পারে। দেশটিতে অভিবাসী আফ্রিকার কালো মানুষদের উপর যখন অত্যাচার চালানো হয়, তখন বোঝা যায় যে ভারতের সমাজে বর্ণবাদের প্রথা কতটা গভীরে প্রোথিত। এর মাঝে আবার মুক্ত বাজার অর্থনীতে ঢুকে ভারতের মিডিয়ায় যৌনতাকে যেভাবে বাজারজাত করা হয়েছে, তাতে সমাজে নারীর অধিকার ভূলুন্ঠিত হয়েছে এবং ধর্ষনের এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। সেনাবাহিনীতে জওয়ানরা ফেসবুক ব্যবহার করে তাদের উপরে চালু রাখা বৈষম্যের কাহিনী প্রচার করতে শুরু করেছে।

এটা পরিষ্কারভাবেই বলা যায় যে ভারত অত্যন্ত দুর্বল একটি দেশ, যা আকারে বিরাট হলেও এর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সুপারপাওয়ার রাষ্ট্র তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ভারতের নিরাপত্তাজনিত ভয় দেশটির নেতৃত্বকে বারংবার আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ করিয়েছে। অথচ প্রতিবারেই ভারত আপাতদৃষ্টিতে নিজের স্বার্থ বাস্তবায়ন করলেও প্রকৃতপক্ষে সে সুপারপাওয়ারের স্বার্থই বাস্তবায়িত করেছে। সুপারপাওয়ারের লক্ষ্য থেকে ভারত কখনোই বের হতে পারেনি; পারবেও না। এমতাবস্থায় বর্তমান সুপারপাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতকে নিজের উপরে ছেড়ে দিচ্ছে, তখন ভারত বিচলিত হবেই; এটাই স্বাভাবিক। ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলিকে কাজে লাগিয়ে সুপারপাওয়ার ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, কিন্তু কখনো ভেঙ্গে ফেলতে চায়নি। একারণেই ভারত বেঁচে আছে। ভারত তার অস্তিত্বের জন্যে পুরোপুরি নির্ভরশীল তার প্রতিবেশী দেশগুলির উপরে, যাতে তারা ভারতের বিরুদ্ধে কোন Subversion-এ লিপ্ত না হয়। ভারতের প্রতিবেশীরাও নিজেদের স্বার্থেই ভারতকে একত্রিত দেখতে চেয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

ভারতের দুর্বল থেকে দুর্বলতর অবস্থান এখন বাংলাদেশের সচেতন মহলে আলোচিত হচ্ছে। গত বছর ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতকারের সময় পত্রিকার সাংবাদিক শেখ হাসিনার ভারত সফরের নিশ্চয়তা আদায় করতে একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে তিনবার জিজ্ঞেস করেছিলেন। বাংলাদেশ যতটা না চাচ্ছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করুন, তার চাইতে বহুগুণে বেশি করে সেটা চাইছে ভারত। বিশেষ করে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সফর, বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা এবং শেখ হাসিনার দু-দু’বার ভারত সফর বাতিলের পর ভারতের কাছে দরদাম করার কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। ভারত বাংলাদেশের কাছে যা যা চেয়েছিল, তার সবই এতদিনে দিয়ে দেয়া হয়েছে; বিনিময়ে ভারত কিছুই ফেরত দেয়নি (সীমান্তে বিএসএফ-এর গুলিতে বহু লাশ ছাড়া)। উল্টো, বাংলাদেশ-বিরোধী কর্মকান্ডকে ভারত নিজের ভূখন্ডে অবাধে হতে দিয়েছে। এমতাবস্থায় ‘ভারতের চাপে’ কোন চুক্তি হতে যাচ্ছে – এধরনের কোন আলোচনা প্রকৃতই অর্থহীন। ভারত মহাসাগরের ভূরাজনীতি এখন বাংলাদেশের পক্ষে; ভারতের পক্ষে নয়। কাজেই ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে ততটুকুই আশা করতে পারে, যতটুকু বাংলাদেশ তাকে দিতে ইচ্ছুক।

Sunday, 12 March 2017

শ্রীলংকা-মাদাগাস্কার তাকিয়ে আছে প্রকৃত বন্ধুদের দিকে

১২ মার্চ ২০১৭
http://static.dailymirror.lk/media/images/image_1483026230-67fc2997f1.jpg
শ্রীলঙ্কার সাথে ক্রিকেট খেলে মন ভালো রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর চার দশকে সবচাইতে খারাপ খরার সময় দেশটিতে যখন খাবারের সঙ্কট চলছে (চালের মূল্য কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ রূপি), তখন তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানোটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?


এই মুহুর্তে শ্রীলঙ্কার নাম বললে বেশিরভাগ মানুষই হয়তো বলবে যে ব্যাটসম্যানদের দোষে শ্রীলঙ্কার কাছে শেষ দিনে টেস্ট ম্যাচটা হেরে গেল বাংলাদেশ। কিন্তু শ্রীলঙ্কার গুরুত্ব কি বাংলাদেশের কাছে এতোটুকুই? নারিকেলের মতো দেখতে সেই দ্বীপটিকে ভূগোল বইতে পড়েছে কতোজন? আজকাল ভূগোল সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান দেখতে আশ্চর্য না হয়ে পারাই যায় না। তবে ক্রিকেটের কারণেই হোক, বা অন্য কোন কারণেই হোক, শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে চিন্তা এদেশের মানুষকে করতেই হবে। একুশ শতকে এসে ভারত মহাসাগরে একটি শক্তিশালী, কিন্তু দায়িত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে ভূগোল-জ্ঞান জরুরি। খুব বেশি একটা মানুষের হয়তো জানা নেই যে এই মুহুর্তে শ্রীলঙ্কায় খরা চলছে (যদিও গলে টেস্ট ম্যাচ খেলার মাঝে এক সেশন বৃষ্টির কারণে পরিত্যাক্ত হয়েছিল)। গত অক্টোবর মাস থেকেই এই খরা চলছে এবং এটা গত চার দশকের মাঝে সবচাইতে বাজে খরা। আসুখ-বিসুখের মাঝ দিয়ে স্রষ্টা যেমন মানুষকে পরীক্ষা করে থাকেন, ঠিক তেমনি আশেপাশের মানুষকেও রুগীর সেবার মাধ্যমে পরীক্ষা করে থাকেন। প্রতিবেশী অসুস্থ থাকলে তার সেবা করা, বা নূন্যপক্ষে খোঁজ নেয়া গুরুত্বপূর্ণ কাজ; কারণ এই হিসেব একসময় স্রষ্টার কাছে মানুষকে দিতে হবে। ঠিক এই ব্যাপারটাই খাটে শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও। তাদের সাথে ক্রিকেট খেলে মন ভালো রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আর চার দশকে সবচাইতে খারাপ খরার সময় দেশটিতে যখন খাবারের সঙ্কট চলছে (চালের মূল্য কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ রূপি), তখন তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়ানোটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বৃষ্টি না হওয়ায় হাইড্রো-পাওয়ারের উৎপাদন কমে গিয়েছে অনেকে, যেখানে দেশটি মোট বিদ্যুতের ৪০% আসে হাইড্রো থেকে। ঘাটতি পোষাতে তেলের আমদানি বাড়ছে; ফলে দেশটির সরকার বাজেট ঘাটতি পোষাতে হিমসিম খাচ্ছে।
http://www.africareview.com/image/view/-/3841728/highRes/1584539/-/ywms9v/-/enawo.jpg
মাদাগাস্কারের। দেশটি সাইক্লোন “এনাও”-এর আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে। ৫০ জনের মতো নিহত হওয়া ছাড়াও ১৮০ জন আহত হয়েছে, ৫৩ হাজার মানুষ হয়েছে ঘরবিহীন, ১ লক্ষ ৭৬ হাজার মানুষ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত। দরিদ্র এই দেশটির উপর দিয়ে এরকম দুর্যোগের পরে তাদের অনেক সাহায্যের দরকার। আফ্রিকার অনেক দেশের সাহায্যে বাংলাদেশ সহায়তা দিয়েছে; মোতায়েন করেছে শান্তিরক্ষীদের। ঠিক তেমনই এক অবস্থা আবারও হাজির হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।


একইভাবে বলা যায় ভারত মহাসাগরের অপর দেশ মাদাগাস্কারের। এটা হলিউডের মুভির নাম নয়; আফ্রিকার উপকূলের একটি বড় দ্বীপদেশের নাম। দেশটি সাইক্লোন “এনাও”-এর আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে। ৫০ জনের মতো নিহত হওয়া ছাড়াও ১৮০ জন আহত হয়েছে, ৫৩ হাজার মানুষ হয়েছে ঘরবিহীন, ১ লক্ষ ৭৬ হাজার মানুষ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত। দুই কোটি ৪৪ লক্ষ জনসংখ্যার দেশটির জিডিপি ১০ বিলিয়ন ডলারেরও কম, যা কিনা বাংলাদেশের জিডিপির ২২ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। দরিদ্র এই দেশটির উপর দিয়ে এরকম দুর্যোগের পরে তাদের অনেক সাহায্যের দরকার। আফ্রিকার অনেক দেশের সাহায্যে বাংলাদেশ সহায়তা দিয়েছে; মোতায়েন করেছে শান্তিরক্ষীদের। ঠিক তেমনই এক অবস্থা আবারও হাজির হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

মাত্র ক’দিন আগেই আইওআরএ-এর শীর্ষ বৈঠক হয়ে গেলো ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায়। ঐ সংস্থার উল্লেখযোগ্য লক্ষ্যগুলির মাঝে একটি হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একে অপরকে সহায়তা দেয়া। সেখানে একত্রে সবাই মিলে কথা বলে আসার পর সেটাই কাজে করে দেখাবার পালা। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া – সকলেরই এখন দায়িত্ব বর্তাচ্ছে ভারত মহাসাগরের অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রগুলির জনগণের দরকারের সময়ে এগিয়ে আসা। এটা একটা মানবিক দায়িত্ব, যেটা করতে পারলে পুরষ্কার আসবে স্বয়ং স্রষ্টার কাছ থেকেই। শ্রীলংকা এবং মাদাগাস্কার তাকিয়ে আছে তাদের প্রকৃত বন্ধুদের দিকে; উপনিবেশ বসাতে আসা শক্তির দিকে নয়। বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া এই মানবিক কাজ করতে গেলে প্রথমেই বাধা আসবে ভারতের কাছ থেকে। কারণ ভারত আফ্রিকার দেশগুলিকে দেখে তার নব্য উপনিবেশ হিসেবে (যেমনটি সে করতে চেয়েছিল বাংলাদেশকেও)। যুক্তরাষ্ট্রও থাকবে ভারতের পক্ষেই। দিল্লী-ওয়াশিংটনের চোখ রাঙ্গানি স্রষ্টার ক্রোধের কাছে কিছুই নয়। দিল্লী শুধু কিছু সময়ই নষ্ট করতে পারবে, এর চাইতে বেশি কিছু নয়। বঙ্গোপসাগরে শুধু সাবমেরিন ভাসালেই চলবে না। প্রমাণ দিতে হবে যে সাবমেরিনের মালিকেরা সাবমেরিন চালাবার যোগ্যতা রাখে। এই যোগ্যতা ইঞ্জিনিয়ারিং যোগ্যতা নয়; দায়িত্বশীলতার যোগ্যতা। একুশ শতকে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রই হবে শক্তিশালী।

Friday, 10 March 2017

জাকার্তা সামিটঃ ভারত মহাসাগরে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

১০ মার্চ ২০১৭
http://greenwatchbd.com/wp-content/uploads/2017/03/PM-with-leaders-of-IORA-summit.jpg
স্থাপিত হবার দুই দশক পর প্রথম শীর্ষ সন্মেলনে ভূ-রাজনীতির বেশকিছু ব্যাপার উঠে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেখানে গিয়েছিলেন, যা কিনা বাংলাদেশকেও এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ করে ফেলেছে। অনেক বড় সংস্থা হলেও এর নাম কূটনৈতিক পরিসরের বাইরে তেমন একটা শোনা যায়নি। এটা প্রথম হেডলাইনে এলো প্রথম শীর্ষ সন্মেলনের মাঝ দিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ বছর পর এই শীর্ষ সন্মেলনের গুরুত্ব কতখানি?

   
আইওআরএ কিভাবে আবির্ভূত হলো?

ক’দিন আগেই ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন’ (আইওআরএ)এর প্রথম শীর্ষ বৈঠক (জাকার্তা সামিট)। স্থাপিত হবার দুই দশক পর প্রথম শীর্ষ সন্মেলনে ভূ-রাজনীতির বেশকিছু ব্যাপার উঠে এসেছে, যা নিয়ে অনেকেই কথা বলা শুরু করেছেন। বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেখানে গিয়েছিলেন, যা কিনা বাংলাদেশকেও এই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ করে ফেলেছে। ২১টি সদস্য দেশ এবং ৭টি ‘ডায়ালগ পার্টনার’এর এই সংস্থা ভারত মহাসাগরের সমুদ্রসীমাতে অবস্থিত দেশগুলি নিয়ে গঠিত। এতবড় সংস্থা হলেও এর নাম কূটনৈতিক পরিসরের বাইরে তেমন একটা শোনা যায়নি। এটা প্রথম হেডলাইনে এলো প্রথম শীর্ষ সন্মেলনের মাঝ দিয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, বিশ বছর পর এই শীর্ষ সন্মেলনের গুরুত্ব কতখানি? প্রথমে সংস্থাটির ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

ইন্ডিয়ান ওশান রিম এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সন্মানের বেশিরভাগটুকুই দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে দেয়া হয়। ১৯৯৩ সালে ঠান্ডাযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলির মাঝে সহযোগিতার সম্প্রসারণকে গুরুত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিক বোথার ভারত সফরের সময় প্রথম এই প্রস্তাব নিয়ে কথা হয়। এরপর ম্যান্ডেলা ১৯৯৫ সালে ভারত সফর করলে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা শুরু হয়। মূলতঃ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে লক্ষ্য রেখেই ১৯৯৭ সালে মরিশাসে প্রথম বৈঠক করে সাতটি দেশ – দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর, কেনিয়া ও মরিশাস। অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ভারত আরও পাঁচটি দেশকে তালিকায় ঢোকায়। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে নতুন সদস্যপদের জন্যে সকল বর্তমান সদস্যের একমত হতে হবে। ১৯৯৬ সালে আরও সাতটি দেশের কাছে সদস্য হবার প্রস্তাব পাঠানো হয়; এগুলি হলো – ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইয়েমেন, তাঞ্জানিয়া, মাদাগাস্কার এবং মোজাম্বিক। ১৯৯৭ সালে প্রথম মন্ত্রীদের সভা হয় মরিশাসে। দ্বিবার্ষিক এই বৈঠকের দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে মোজাম্বিকে, যেখানে বাংলাদেশ, ইরান, শেইসেলস, থাইল্যান্ড এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। একইসাথে প্রথম বারের মতো মিশর এবং জাপানকে আমন্ত্রণ জানানো হয় ‘ডায়ালগ পার্টনার’ হিসেবে, যে দেশগুলি ভারত মহাসাগরে অবস্থিত নয়। শেইসেলস ছাড়া বাকি সবাই ১৯৯৯ সালে এই সংস্থায় ঢুকে যায়, যখন এর সদস্যসংখ্যা হয় ১৮ এবং সাথে দুইজন ডায়ালগ পার্টনার।

১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সংস্থাটির গুরুত্ব বেশ কমই ছিল, যা পরিবর্তিত হয়ে যায় ২০০০ সালে ওমানের ‘বিশেষ অধিবেশন’এ ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে চীন এবং ব্রিটেনের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। পরের বছরের এপ্রিলে ওমানের আরেক সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয় ফ্রান্সকে। ভারত মহাসাগরে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স উভয়েরই কিছু কৌশলগত দ্বীপ উপনিবেশ হিসেবে রয়েছে। ২০১২ সালে পরবর্তী বড় পরিবর্তনটি হয়। এবছরে ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, সংস্থাটির বয়স ১৫ বছর হতে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের চোখে পড়তে! আর ২০১৫ সালে অনেককে অবাক করে দিয়ে জার্মানি এই সংস্থায় ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে যোগ দেয়। ২০১১ সালে শেইসেলস, ২০১২ সালে কমরুস, এবং ২০১৪ সালে সোমালিয়া সদস্য হয়। তবে মানচিত্রের দিকে দেখলেই বোঝা যায় যে ভারত মহাসাগরের সব দেশ এই সংস্থায় নেই। যারা নেই, তাদের মাঝে রয়েছে – পাকিস্তান, মালদ্বীপ এবং মিয়ানমার। একটু বাড়িয়ে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগর যোগ করলে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, কুয়েত, সুদান, এরিত্রিয়া, জিবুতিও চলে আসবে। যেহেতু সংস্থাটিই ম্যারিটাইম অঞ্চলের সংস্থা, তাই যেসব দেশের সমুদ্রসীমা ভারত মহাসাগরে রয়েছে, তারাই এক্ষেত্রে সদস্যপদের দাবিদার হতে পারে।

 
https://www.aspistrategist.org.au/wp-content/uploads/2015/06/8427451274_4f440722b4_z.jpg
আইওআরএ-এর মূল লক্ষ্যগুলি হলো – ১) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ, ২) সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (তথ্য আদানপ্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা), ৩) মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ৪) শিক্ষার আদানপ্রদান (সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা), ৫) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (নলেজ শেয়ারিং এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি), ৬) পর্যটনের উন্নয়ন, ৭) সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং ৮) নারীর ক্ষমতায়ন। এর মাঝে প্রথম প্রথম ছয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইওআরএ আসলে কি কাজ করে?

সংস্থাটির কর্মকান্ডের দিকে তাকালে কিছু ব্যাপার পরিষ্কার হতে শুরু করবে। সংস্থার মূল লক্ষ্যগুলি হলো – ১) বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণ, ২) সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (তথ্য আদানপ্রদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা), ৩) মৎস্য সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, ৪) শিক্ষার আদানপ্রদান (সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে গবেষণা), ৫) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (নলেজ শেয়ারিং এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি), ৬) পর্যটনের উন্নয়ন, ৭) সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান এবং ৮) নারীর ক্ষমতায়ন। এর মাঝে প্রথম প্রথম ছয়টিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলির মাঝে রয়েছে প্রযুক্তির আদানপ্রদান (ইরানের উদ্যোগ), বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আদানপ্রদান (অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগ), পর্যটন উন্নয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই (ওমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়), ম্যারিটাইম ট্রান্সপোর্ট কাউন্সিল (ওমানের উদ্যোগ), কন্সট্রাকশন সুযোগ খোঁজা (মালয়েশিয়ার উদ্যোগ), ফিশারিজ সাপোর্ট ইউনিট (২০০৪ থেকে ওমানের দায়িত্বে, যদিও ২০০৩ সালে শ্রীলঙ্কার নাম বলা হয়েছিল), প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (ইরান, কেনিয়া, মরিশাস, ওমান, শ্রীলঙ্কা, তাঞ্জানিয়া এবং ইয়েমেন এতে আগ্রহী) এবং সর্বশেষে সাংস্কৃতিক প্রচার (ভারত অগ্রগামী ভূমিকা নেয় ২০০৮ থেকে)। এই প্রকল্পগুলিকে এগিয়ে নিতে যে অর্থ দরকার, তার অর্ধেকেরও বেশি এসেছে ভারতের কাছ থেকে। প্রায় ১ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার এখন পর্যন্ত এই সংস্থার ফান্ড হিসেবে এসেছে, যা এতবড় একটি সংস্থা পরিচালনা করতে নিতান্তই নগন্য। তবে সংস্থাটি অন্য উৎস থেকে ফান্ডের ব্যবস্থা করে দেয়। এক্ষেত্রে চীন, জাপান, জার্মানির মতো দেশগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র-বাণিজ্য রুট হওয়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা এখানে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি।

সংস্থার ধনী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত খুব একটা আগায়নি, যদিও ইরানকে ব্যালান্স করার একটা চিন্তা তাদের থাকবে। ইরান চাইছে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকায় কিছুটা এগিয়ে যেতে। ওমান হয়তো চাইছে উপসাগরীয় জোটের বাইরে কিছু করতে। তবে ভারতের কাছে সমুদ্র নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতির প্রসার ছাড়া খুব বেশি কিছু গুরুত্ব পায়নি।
https://www.mcci.org/media/133222/iora-map.jpg?anchor=center&mode=crop&width=640&height=370&rnd=131050318770000000
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে আইওআরএ খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এই মহাসাগরের মাঝ দিয়ে গেছে। একারণে এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলির মাঝে চলছে প্রতিযোগিতা। সংস্থাটি ১৯৯৭ সালে চালু হলেও ২০০০ সালে চীনের অন্তর্ভুক্তির মাঝ দিয়ে আসল রাজনীতির সূচনা। এই অঞ্চলে চীনের অর্থনৈতিক শক্তির সাথে ভারত পেরে উঠছে না। সংস্থার বেশিরভাগ দেশই উন্নয়নের জন্যে চীনের সহায়তা চাইছে।


সংস্থাটির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব

সংস্থাটির ধরন অর্থনৈতিক হলেও রাজনীতি এখানে সবচাইতে মূখ্য; আর ২০০০ সালে চীনের ঢোকার সাথে সাথে এটা ভূ-রাজনীতিতে মোড় নিয়েছে। প্রথম থেকেই ভারত চাইছিলো পাকিস্তানকে এই সংস্থায় ঢুকতে না দিতে। পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় বলা হয় যে সংস্থার বাকি সবগুলি দেশ পাকিস্তানের ঢোকার পক্ষে ছিল; শুধুমাত্র ভারতের কারণে যোগদান সম্ভব হয়নি। তবে এর মাধ্যমে দু’টি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এই সংস্থায় ঢুকতে পারেনি – প্রথমটি অবশ্যই ভারত-পাকিস্তান, এবং অপরটি সৌদি আরব-ইরান। এখানে মজার ব্যাপার হলো, এতো বড় একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবার পরেও এবং শুরু থেকেই জড়িত থাকার পরেও ভারতীয়রা এই সংস্থাকে তেমন গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে না। ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র রাজা মোহন ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’এ লিখতে গিয়ে বলেন যে ভারতীয়দের মাঝে অর্থনৈতিক ছাড় দেয়ার প্রবণতা এতোটাই কম যে এক্ষেত্রে অন্য দেশগুলির সাথে বাণিজ্যের বিশেষ প্রসার ঘটানো তাদের পক্ষে সম্ভন নয়। আবার এই অঞ্চলে যোগাযোগের উন্নয়নের জন্যে চীন যে বিনিয়োগ নিয়ে আসছে, সেটাও ভারতের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তবে এখানে শুধু চীন নয়, জার্মানি এবং জাপানের কথাও চিন্তা করতে হবে। এ অঞ্চলে জাপানের বিরাট বিনিয়োগ থাকলেও সে তুলনায় জার্মানির তেমটা নেই। তবে ব্রেক্সিটের পরবর্তী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরমুখী নীতির দিকে ঝুঁকে পরার সময়ে জার্মানি যখন ইউরোপের নেতৃত্ব নিতে ফ্রান্সের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে, তখন ভারত মহাসাগরে জার্মানির উপস্থিতিকে আলাদাভাবে দেখতেই হবে। আতমাজায়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দিন্না উইসনু ‘দ্যা জাকার্তা পোস্ট’এ লিখতে গিয়ে বলেন যে এবারের শীর্ষ সন্মেলন থেকে তিনি জেনেছেন যে জার্মানি এখন এই এলাকায় চীনের মতো বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে ইচ্ছুক। পরাশক্তির দুর্বল হবার লক্ষণে জার্মানি হয়তো ভারত মহাসাগরের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। আবার পাকিস্তানকে বাইরে রাখার জন্যে ভারতের গোঁ ধরার প্রবণতাকে অনেকে চ্যালেঞ্জ করছেন।
http://images.indianexpress.com/2016/10/hamid-ansari-7591.jpg
ভারত থেকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট – দু’জনের কেউই যাননি; গিয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হামিদ আনসারি। ইরান পাঠিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে; সংযুক্ত আরব আমিরাত একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছিল। ভারতের বক্তব্যের মাঝে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস”এর কথা তুলে ধরে পাকিস্তানকেই টার্গেট করা হয়। পাকিস্তানকে এই সংস্থায় ঢুকতে বাধা দেয়ায় ভারতের গোঁয়াড় স্বভাবটা বাকি সকল দেশের বিরক্তির কারণ হবে এবং ভারতের স্বার্থকে ক্রমেই অন্য দেশগুলি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখতে শুরু করবে। ভারতকে তারা দেখবে উন্নয়নে বাধাদানকারী শক্তি হিসেবে, যা কিনা ভারতকে অযথা শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করবে।


জাকার্তা – সকল আলোচনার জন্ম যেখানে

দুই দশক পরেই কেবল প্রথম শীর্ষ সন্মেলন হলো সংস্থাটির, যা গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৩ সালে ভারতের কাছ থেকে চেয়ারম্যানের পদ যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে। ২০১৫ সালে সেটা যায় ইন্দোনেশিয়ার কাছে। তবে এর আগে কেউই শীর্ষ সন্মেলন ডাকেনি; ইন্দোনেশিয়াই সংস্থাটির গুরুত্বকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেল। অনেক দেশেরই রাষ্ট্র/সরকারপ্রধান যোগদান করেছিলেন সেখানে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের মধ্যে ছিলেন অস্টেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল, মালেশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক, মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপে জাচিনটো নাইউসি, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনা, তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট আলী মোহাম্মদ শিয়েন, ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদি (যিনি এখন সৌদি সমর্থনে হুথিদের সাথে যুদ্ধরত), ওমানের সুলতান কাবুস বিন সাঈদ আল সাঈদ, সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট মোহামেদ আবদুল্লাহি মোহামেদ এবং মাদাগাসকারের প্রেসিডেন্ট হেরি রাজাওনারিমামপিয়ানিনা। এছাড়াও অনান্য দেশ থেকে ছিলেন কোমোরুস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট আজালি অ্যাসাউমানি, ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হামিদ আনসারি, শেইসেলস-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, সিঙ্গাপুরের উপ প্রধানমন্ত্রী, থাইল্যান্ডের উপ প্রধানমন্ত্রী, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়াও চীন, মিশর, জাপান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মিয়ানমার, মালদ্বীপ, ইউনেস্কোসহ সংস্থার ২১ সদস্য দেশ ও ৭ ডায়ালগ পার্টনারসহ মোট ৩৪টি আর্ন্তজাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। খেয়াল করলে দেখা যাবে যে ভারত থেকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট – দু’জনের কেউই যাননি; গিয়েছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ইরান পাঠিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে; সংযুক্ত আরব আমিরাত একজন প্রতিমন্ত্রীকে পাঠিয়েছিল। সদস্য না হলেও মালদ্বীপ এবং মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

‘দ্যা ডিপ্লোম্যাট’ ম্যাগাজিনের এক লেখায় ইন্দোনেশিয়ার এই সংস্থাকে এগিয়ে নেয়া নিয়ে কিছুটা সন্দেহ পোষণ করা হয়। আসিয়ানের স্থবিরতাকে ইন্দোনেশিয়ার টার্গেট পরিবর্তনের কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও সেই রিপোর্টে মতামত দেয়া হয় যে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষে পূর্ব এশিয়াকে ছেড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তবে সেই লেখায় ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিমের দিকে যাওয়ার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে নিয়ে তেমন একটা আলোচনা করা হয়নি। ‘ফিনানশিয়াল এক্সপ্রেস’এর মতে এই সন্মেলনে ভারতের বক্তব্যের মাঝে “রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস”এর কথা তুলে ধরে পাকিস্তানকেই টার্গেট করা হয়। এর মাঝে এই সংস্থা যে রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তার প্রমাণ আবারও পাওয়া যাচ্ছে। ভারত যথারীতি সন্ত্রাসবাদ দমন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তাকেই এই সংস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করে। তবে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের মূল সমস্যা হিসেবে জলদস্যু, ডাকাতি, মানব পাচার, অস্ত্র পাচার ও অবৈধ মৎস্য আহরণ-কে উল্লেখ করে। একইসাথে আইওআরএ-কে এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। যেখানে ভারত এই সংস্থাকে খুব একটা গুরুত্বই দিচ্ছে না, সেখানে এমন একটি প্রস্তাব চিন্তার দাবিদার। প্রথমবারের মতো শীর্ষ সন্মেলন আয়োজন করে ইন্দোনেশিয়া এই অঞ্চলে এগিয়ে গেল। একসময় ভারত উঠতি শক্তি হিসেবে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে একত্রে এই সংস্থাকে এগিয়ে নেবার কথা বলেছে। কিন্তু প্রথমবারের মতো শীর্ষ সন্মেলন ডেকে ইন্দোনেশিয়া ভারত এবং অস্ট্রেলিয়ার মাঝে তো পড়েই নি, বরং তাদের বাইপাস করেছে।
http://assets.rappler.com/3E618760326B4247B205FB5DD933980C/img/D7AC705B973B405BBA0CFF8195D54CCC/epa-20150520-indonesia-rohingya-refugees-001-640.jpg
সার্ক এবং আসিয়ান (সাথে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত জাতিসংঘ) মিয়ানমারের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এইওআরএ প্ল্যাটফর্মকে নিয়ে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া নতুনভাবে ভাববে। জাকার্তায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের বড় সমস্যাগুলি হিসেবে যে কথাগুলি বলা হয়েছে, তা সেদিকেই পথ দেখাচ্ছে। সমুদ্র নিরাপত্তায় এই তিন দেশই বিনিয়োগ করবে, যা মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মিয়ানমারকে ভারতের দিকে (সামরিক সাহায্যের জন্যে) আরও বেশি ঝোঁকাবে। আর যেহেতু রাখাইনে গোলযোগের ফলে চীনের তেল এবং গ্যাস পাইপলাইন সমস্যায় পড়েছে, তাই চীনও এই তিন দেশের একত্রে কাজ করাকে সমর্থন করবে। এই সমর্থনে চীন অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে সহায়তা দিতে আগ্রহী হবে। এভাবে এই তিন দেশের একত্রে কার্যকলাপ বঙ্গোপসাগরে ভারতের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।


জাকার্তা-পরবর্তী ভারত মহাসাগর কেমন হবে

জাকার্তায় আইওআরএ-এর শীর্ষ সন্মেলন একটি বড় ভূরাজনৈতিক ঘটনা ছিল। এর ফলে ভারত মহাসাগরে যেসকল ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সেগুলিকে কয়েকটি পয়েন্টে বলা যায় –

১। ভারতের নেতৃত্ব হুমকির মুখে –

ভারত বুঝতে পারছে যে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই এলাকায় তার নেতৃত্ব নিশ্চিত হবে না। পাকিস্থানকে এই সংস্থায় ঢুকতে না দিলেও ২০০০ সালে ভারত চীনের ঢোকা প্রতিরোধ করেনি। সেই ভুলের খেসারত ভারতকে এখন দিতে হচ্ছে। চীন আইওআরএ-এর প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ করতে কোন সমস্যা বোধ করবে না। শুধু তা-ই নয়, সমুদ্র অর্থনীতি এবং সমুদ্র নিরাপত্তাতেও চীন বিনিয়োগ করবে সানন্দে, কারণ এতে ভারত মহাসাগরে চীনের হাত শক্তিশালী হবে এবং ভারতের আধিপত্যে ভাটা পড়বে।

২। মিয়ানমার সমস্যা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়াকে কাছে আনবে –

সমুদ্র নিরাপত্তায় অংশগ্রহণে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের অনেক কিছু পাবার রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে উদ্বাস্তু সমস্যা এই তিন দেশকেই সমস্যায় জর্জরিত করে রেখেছে। বিশেষতঃ মিয়ানমারের মুসলিমদের উপর অত্যাচারের কারণে এই সমস্যা প্রকট হয়েছে। এই তিনটি মুসলিম-প্রধান দেশে মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থনের জন্ম হয়েছে, যার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যাবে দেশ তিনটির মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেয়া কার্যকলাপে। [১] যদিও এই কার্যকলাপ এখনও তেমন কিছুই দেখা যায়নি, তবে সামনের দিনগুলিতে এই সমস্যা বঙ্গোপসাগরে এই তিন দেশকে কাছাকাছি আনবে। সার্ক এবং আসিয়ান (সাথে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত জাতিসংঘ) মিয়ানমারের সমস্যার সমাধান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এইওআরএ প্ল্যাটফর্মকে দেশগুলি নতুনভাবে ভাববে। জাকার্তায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলের বড় সমস্যাগুলি হিসেবে যে কথাগুলি বলা হয়েছে, তা সেদিকেই পথ দেখাচ্ছে। সমুদ্র নিরাপত্তায় এই তিন দেশই বিনিয়োগ করবে, যা মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মিয়ানমারকে ভারতের দিকে (সামরিক সাহায্যের জন্যে) আরও বেশি ঝোঁকাবে। আর যেহেতু রাখাইনে গোলযোগের ফলে চীনের তেল এবং গ্যাস পাইপলাইন সমস্যায় পড়েছে, তাই চীনও এই তিন দেশের একত্রে কাজ করাকে সমর্থন করবে। এই সমর্থনে চীন অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে সহায়তা দিতে আগ্রহী হবে। এভাবে এই তিন দেশের একত্রে কার্যকলাপ বঙ্গোপসাগরে ভারতের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যে কাজগুলি এই দেশগুলি সাম্প্রতিককালে মিয়ানমার সমস্যার সময় করা থেকে বিরত ছিল, সেগুলিই তারা তখন করে দেখাতে চাইবে।
http://www.eibela.com/upload/1462996856716.jpg
ভারত চেষ্টা করবে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে দূরে রাখতে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক-বিনিয়োগ-প্রযুক্তি-সামরিক চুক্তি করে এই কাজে এগুতে চাইবে ভারত। কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিম সমস্যা এবং মানব-অস্ত্র-মাদক চোরাচালান দেশগুলিকে আরও কাছে টেনে আনবে। বিশ্বের সবচাইতে বেশি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়াকে ভারত প্রভাব বিস্তার করতে বাধা দেবে; বিশেষত এই অঞ্চলের অন্য মুসমিল দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিপক্ষে থাকবে ভারত।


৩। ভারত চাইবে বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়াকে আলাদা করতে –

সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া ভারতকে দুশ্চিন্তা দিয়েছে যথাক্রমে চীনের দিকে ঝুঁকে [২] এবং আস্ট্রেলিয়ার সাথে সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করে। [৩] ভারত চেষ্টা করবে বাংলাদেশকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে দূরে রাখতে। বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং ইন্দোনেশিয়ার সাথে আলাদা আলাদা নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক-বিনিয়োগ-প্রযুক্তি-সামরিক চুক্তি করে এই কাজে এগুতে চাইবে ভারত। কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিম সমস্যা এবং মানব-অস্ত্র-মাদক চোরাচালান দেশগুলিকে আরও কাছে টেনে আনবে। বিশ্বের সবচাইতে বেশি মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ইন্দোনেশিয়াকে ভারত প্রভাব বিস্তার করতে বাধা দেবে; বিশেষত এই অঞ্চলের অন্য মুসমিল দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের বিপক্ষে থাকবে ভারত।

৪। চীন থাইল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবে –

এখানে থাইল্যান্ডের কথাও উল্লেখ করা যেতে পারে, কারণ মিয়ানমারের উদ্বাস্তু সমস্যা এবং মানব-অস্ত্র-মাদক পাচার থাইল্যান্ডকেও সমস্যায় ফেলেছে। চীন এক্ষেত্রে থাইল্যান্ডকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে থাকতে অনুপ্রাণিত করবে।
http://s3.india.com/wp-content/uploads/2015/03/sri-lanka-president-maithripala-sirisena-and-china-president-xi-jinping-023.jpg
শ্রীলংকা চাইবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে ভারতের প্রভাব কমাতে। ভারত সর্বদাই শ্রীলংকাকে নিয়ে ভয়ে রয়েছে; পাছে শ্রীলংকা ভারতের স্বার্থবিরুদ্ধ কোন কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যায়। ভারতের পক্ষে যায় না – এমন যেকোন সংস্থায় শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে ভারত। ভারত শ্রীলংকার উপরে চাপ বাড়াবে যাতে শ্রীলংকা ঐ তিন দেশের কাছাকাছি না যায়। এক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা ভারতে অনেকটাই ব্যালান্স করে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে শ্রীলঙ্কার পার্টনারশিপ সহজ করে দেবে।

৫। শ্রীলঙ্কা চাইবে ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বের হতে –

শ্রীলংকা চাইবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে যুক্ত হয়ে ভারতের প্রভাব কমাতে। ভারত সর্বদাই শ্রীলংকাকে নিয়ে ভয়ে রয়েছে; পাছে শ্রীলংকা ভারতের স্বার্থবিরুদ্ধ কোন কর্মকান্ডে যুক্ত হয়ে যায়। ভারতের পক্ষে যায় না – এমন যেকোন সংস্থায় শ্রীলঙ্কার অংশগ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে ভারত। [৪] ভারত শ্রীলংকার উপরে চাপ বাড়াবে যাতে শ্রীলংকা ঐ তিন দেশের কাছাকাছি না যায়। এক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা ভারতে অনেকটাই ব্যালান্স করে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার সাথে শ্রীলঙ্কার পার্টনারশিপ সহজ করে দেবে।

৬। মালদ্বীপও যুক্ত হতে চাইবে –

শ্রীলংকার সাথে মালদ্বীপও চাইবে যুক্ত হয়ে যেতে। পাকিস্তান এই সংস্থায় ঢুকতে পারবে না যতক্ষণ ভারত থাকবে। তবে পাকিস্তান চাইবে মালদ্বীপ যুক্ত হোক। মালদ্বীপ সদস্য না হয়েও এবারের বৈঠকে যোগ দিয়েছিল। বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-শ্রীলঙ্কাও চাইবে মালদ্বীপকে। ভারত এতে মহাবিপদ দেখবে!

৭। বঙ্গোপসাগরের শক্তিদের ভারত আফ্রিকার উপকূলে যেতে বাধা দেবে –

পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে আরব সাগরে এই সংস্থার তেমন কাজ নেই। তারপরেও শ্রীলংকা-মালদ্বীপ-ওমান পেরিয়ে আফ্রিকার উপকূলের সাথে যোগাযোগ নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে। ভারত চাইবে না বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া আফ্রিকার উপকূলে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-নিরাপত্তা সকল দিক থেকে প্রভাবশালী হোক। অন্যদিকে চীন ঠিক সেটাই চাইবে।

৮। ভারতের গোঁয়াড়তমি সকলের স্বার্থের বিরুদ্ধ হবে –

পাকিস্তানকে ঢুকতে বাধা দেয়ায় ভারতের গোঁয়াড় স্বভাবটা বাকি সকল দেশের বিরক্তির কারণ হবে এবং ভারতের স্বার্থকে ক্রমেই অন্য দেশগুলি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখতে শুরু করবে। ভারতকে তারা দেখবে উন্নয়নে বাধাদানকারী শক্তি হিসেবে, যা কিনা ভারতকে অযথা শক্তি প্রয়োগে বাধ্য করবে এবং এই এলাকার সকল দেশকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার দিকে ছোটাবে। চীন এই তিন দেশের সাথে থাকবে; ফলে ভারতের প্রভাব কমতেই থাকবে।

৯। পশ্চিমা সহায়তা ছাড়া ভারতের জন্যে কঠিন সময় হাজির হবে –

বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের প্রভাব দিন দিন কমছে। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপ এখন আর একমত থাকতেও পারছে না। এমতাবস্থায় ভারত তার পক্ষে পশ্চিমাদের কাছ থেকে খুব বড় কোন সহায়তা পাবে না। ভারতের একা (যদিও অস্ট্রেলিয়া সাথে থাকবে) চীনকে ব্যালান্স করতে গিয়ে যে গলদঘর্ম হবে, তাতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার উপরে ওঠা সহজ হয়ে যাবে।





[১] ‘মিয়ানমারে মুসলিমদের ত্রাণ সাহায্যের নেপথ্যে’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
[২] ‘ফিলিপাইনের পথে মালয়েশিয়া’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৫ জানুয়ারি ২০১৭
[৩] ‘ইন্দোনেশিয়া-আস্ট্রেলিয়া সামরিক সম্পর্ক স্থগিতের গুরুত্ব’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১২ জানুয়ারি ২০১৭
[৪] ‘ভারতের নতুন শঙ্কা শ্রীলঙ্কা’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৬

Tuesday, 7 March 2017

শক্তিশালী রাষ্ট্রের শক্তিশালী পাট চাই

০৭ মার্চ ২০১৭

https://s3-eu-central-1.amazonaws.com/centaur-wp/theengineer/prod/content/uploads/2012/06/25093400/24-26-Merc-fibre.gif
মার্সিডিস গাড়িতে ব্যবহার করা ন্যাচারাল ফাইবারের কম্পোনেন্টগুলি। ন্যাচারাল ফাইবার হিসেবে পাটের নামকে উপরে তুলে ধরতে জুট-কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি এবং ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের পাটের উপরে অন্য দেশ উন্নত হবে - এই চিন্তার দিন শেষ।


জাতীয় পাট দিবস পালিত হয়ে গেল মাত্র। অনেক কথা হলো পাট নিয়ে, কিন্তু পাটকে বিশ্বের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ফাইবারে পরিণত করার কোন প্রয়াস দেখা গেলো না, যদিও এটা পাটের প্রাপ্য সন্মান এবং একুশ শতকের অদম্য বাংলাদেশের জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ। পাটের গুরুত্ব বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে ফাইবারের (বা আঁশের বা তন্তুর) আধুনিক ব্যবহার কোন ক্ষেত্রে। ফাইবার হলো বিল্ডিং তৈরির রডের মতো; কংক্রীটকে একত্রে ধরে রাখে এবং শক্তিশালী করে। অনেকটা কংকালের মতো। এভাবে রড যেমত বিল্ডিং এবং অনান্য অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ফাইবার ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন আকৃতির বস্তু তৈরিতে। কংক্রীট যেমন ভেজা অবস্থায় নরম থাকে এবং শুকিয়ে গেলেই শক্ত হয়ে যায়, তেমনি রেজিন ব্যবহার করা হয় ফাইবারের সাথে, যা শুকিয়ে গেলেই যেকোন মোল্ডের আকৃতি নিয়ে নেয়। এক্ষেত্রে এই আকৃতিকে শক্তিশালী করে ফাইবার। সবচাইতে বেশি ব্যবহৃত ফাইবার গ্লাস-ফাইবার হলেও এটা কৃত্রিম ফাইবার, যা তৈরি করতে হলে বিশেষ কিছু কাঁচামাল লাগে, যা আহরণ করতে হয়। তবে প্রাকৃতিক ফাইবার ফসলের খেতে উৎপাদন করা যায়, যা একটি বিরাট সুবিধা। ন্যাচারাল ফাইবারের আরও একটি ব্যাপার হলো, এটি বিশেষ কিছু এলাকায় ভালো জন্মে। তাই ন্যাচারাল ফাইবার সাধারণতঃ বিশ্বের কিছু দেশের কাছে সম্পদ হিসেবে থাকে। পাট হলো এমনই এক ন্যাচারাল ফাইবার। পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে পাট উৎপাদন হলেও বাংলাদেশের পাট বিশ্বের সবচাইতে উন্নতমানের পাট। একারণেই “গোল্ডেন ফাইবার” কথাটি শুধু এই দেশেই প্রচলিত।


https://tibotaratari.files.wordpress.com/2010/10/ambulance.jpg
পাটের কম্পোজিট থেকে কি কি তৈরি হয়, সেটা অনেকেই জানেন না। বাংলাদেশেই পাট থেকে নৌযান তৈরি হচ্ছে।


পাটের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম হয়নি। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিশ্বশক্তিরা সর্বদাই খেয়াল রেখেছে যেন এই ফসলটি ব্যবহার করে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোন পণ্য তৈরি করা না হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থ দিয়েছে জুটমিল বন্ধ করার জন্যে। একইসাথে ভারতকে অর্থ দিয়েছে নতুন করে জুটমিল খোলার জন্যে, যাতে বাংলাদেশে উৎপন্ন কাঁচাপাট ভারতের কারখানায় ব্যবহৃত হয়। এতে বাংলাদেশে যেমন কৌশলগত কোন পণ্য তৈরি হতে পারবে না, তেমনি ভারতের উপরে বাংলাদেশ নির্ভরশীল থাকবে রপ্তানি আয়ের জন্যে। শুধু তা-ই নয়, যেখানে বিশ্বের সবচাইতে ভালো মানের পাট উৎপাদন হয় বাংলাদেশে, সেখানে বর্তমানে প্রায় সকল পাটের বীজ আসে ভারত থেকে!! এই বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে ভালো মানের পাটের উৎপাদন বন্ধ করার জন্যে। ভারতের পাটের আঁশ হয় মোটা; আর বাংলাদেশের পাটের আঁশ হয় সরু। সরু আঁশ থেকে তৈরি পণ্যের বৈচিত্র্য এবং মান অনেক বেশি ভালো হবে। উন্নত প্রযুক্তির পণ্য উৎপাদন ভারতের মাঝে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য থেকেই এটা করা হয়েছে। পশ্চিমারা জানে যে ভারত পাটের সর্বাধিক ব্যবহার কোনদিনই করতে সক্ষম হবে না, কারণ কাঁচা পাটের জন্যে ভারত বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ যখন নিজ দেশে পাটের বস্তার বাধ্যতামূলক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল, তখন ভারতীয়রা বাধা দিয়েছিল। তারা বলছিল যে এটা বাস্তসম্মত সিদ্ধান্ত হবে না। অথত ভারতে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রায় তিন দশক ধরে!! এরপরেও বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবি এবং তথাকথিত গবেষণা সংস্থা পাটের উন্নয়নে ভারতের সাথে একত্রিত হয়ে কাজ করার কথা বলে থাকে!!


http://www.jagonews24.com/media/PhotoGallery/2015September/Green-line120150923041846.jpg
বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছে গ্লাস-ফাইবারের জাহাজ। তবে এক্ষেত্রে পাটের মতো ন্যাচারাল ফাইবারের ব্যবহার যেতো কিনা, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। অন্ততঃ পশ্চিমারা যদি গাড়ির ভেতএর কম্পোনেন্ট পাট দিয়ে তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে জাহাজের অভ্যন্তরে পাটের ব্যবহার হতেই পারে।


একুশ শতকের অদম্য বাংলাদেশ গড়তে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের ষড়যন্ত্রের জাল থেকে বের হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। একুশ শতকের পণ্য উৎপাদনই হবে পাট চাষের উদ্দেশ্য। মোটরগাড়ি, জাহাজ, বিমান, উইন্ডমিল, ঘর-বাড়ি, ফার্নিচার, ইত্যাদি তৈরিতে ন্যাচারাল ফাইবার ব্যবহৃত হচ্ছে। জার্মানিতে ভারতের সহায়তায় পাটের প্রযুক্তিগত ব্যবহারে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা জার্মানিতে গিয়ে তাদের জন্যে উন্নত প্রযুক্তিকে উন্নততর করেছেন, যাতে বাংলাদেশ থেকে শুধুই কাঁচা পাট রপ্তানি হয় এবং কৌশলগত পণ্যের ইন্ডাস্ট্রি কখনোই গড়ে না ওঠে। তবে এই কৌশলগত পণ্য বলতে কিন্তু উন্নত ধরনের কাপড়, ব্যাগ, জুতা, বস্তা এগুলি বোঝায় না। এগুলি তৈরি হবে অবশ্যই। কিন্তু একুশ শতকের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র এগুলির উপরে নির্ভর করে তৈরি হবে না। পাটের কাপড় গুরুত্বপূর্ণ হবে যদি এটা দিয়ে প্যারাশুট তৈরি করা যায়, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা যায়, জাহাজ-গাড়ি-বিমান তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের পাটের উপরে পশ্চিমারা এসব উন্নত জিনিসপত্র তৈরি করে সেগুলি আবার বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতেই ব্যবহার করবে, আর এদেশের মানুষ সেটা নিয়ে “গর্ববোধ” করবো, সেই দিন আর নেই! তাদের দেশে গিয়ে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের দিনও শেষ। এখন প্রযুক্তি দরকার এখানে, এবং দ্রুত। এখানে দরকার মেধা। মেধা হলো শক্তিশালী হবার জন্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান; এটা রপ্তানিযোগ্য নয়।

পাট তার সন্মান ফিরে পাবে, যখন পাটের তৈরি পণ্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরিতে সাহায্য করবে। রাষ্ট্র সন্মান পেলে পাটও পাবে। রাষ্ট্রের লক্ষ্যের সাথে পাটের লক্ষ্যের সমন্বয় ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রের চিন্তাকে পাট প্রতিষ্ঠা করবে; রক্ষা করবে এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দেবে। এটাই হবে পাটের উদ্দেশ্য। পাটের পণ্য দেখলে মানুষ যেন বোঝে যে এই পণ্য এসেছে এমন এক রাষ্ট্র থেকে, যার সামর্থ্য নিয়ে কারো মাঝে দ্বিমত নেই। পণ্যই যেন রাষ্ট্রের শক্তিকে তুলে ধরে। একুশ শতকে “শক্তিশালী পাট” চাই।

“Jute is Power!”

Saturday, 4 March 2017

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশে কি চাচ্ছে?

০৫ মার্চ ২০১৭

http://www.newsnarayanganj24.net/media/imgAll/2016February/sromik-big20160623150458.jpg
আপাততঃ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর রেডিনেস এবং লজিস্টিক্যাল কন্ডিশন যে পর্যায়ে আছে, তাতে নতুন কোন ফ্রন্টলাইন খোলাটা তাদের জন্যে কতোটা বাস্তবসম্পন্ন হবে, তা নিয়ে বিতর্ক করাই যায়। তথাপি তারা ভারতকে “কিছু করা”র জন্যে অনুপ্রাণিত করতে পারে। রাষ্ট্রকে দুর্বল করার Subversion-এর পদ্ধতিগুলি ভারত (যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে) কাজে লাগাতে চাইবে। যেসব অস্ত্রগুলি তারা কাজে লাগাতে চাইবে, সেগুলি স্টেট ডিপার্টমেন্টের ঐ প্রতিবেদনে পরোক্ষভাবে উল্লেখ রয়েছে- তথাকথিত জঙ্গী কর্মকান্ড, বিদেশী-‘মুক্তমনা’-মানবাধিকার কর্মী-সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, শ্রমিক অসন্তোষ, গণতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের নামে অরাজকতা, ইত্যাদি।


যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০১৬ সালের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে পরোক্ষ হুমকি দেবার পর এ নিয়ে কিছু আলোচনা বাঞ্ছনীয় হয়ে উঠেছে। হুমকি হিসেবে এবার আইসিস-এর স্থলে এসেছে আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট বা একিউআইএস-এর নাম। নতুন নতুন যা কিছুই উদ্ভাবন করা হোক না কেন, মূল লক্ষ্য একটাই থাকবে – ইসলামকে অসহিষ্ণু জঙ্গী বিশ্বাস হিসেবে প্রমাণ করা। ইসলামের নামে যতো সব খারাপ কাজের সূচনা করে ইসলাম থেকে মানুষকে দূরে সরাবার এই ঘৃণ্য চেষ্টা এখন এতোটাই নগ্নভাবে সামনে চলে আসছে যে তা এখন একজন রিক্সাওয়ালা, চায়ের দোকানদার বা সিএনজি চালকও জানে। ভারতের সাথে করা LEMOA চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মাটিতে সামরিক বিমান মোতায়েন করতে পারে। [১] তবে আপাততঃ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর রেডিনেস এবং লজিস্টিক্যাল কন্ডিশন যে পর্যায়ে আছে, তাতে নতুন কোন ফ্রন্টলাইন খোলাটা তাদের জন্যে কতোটা বাস্তবসম্পন্ন হবে, তা নিয়ে বিতর্ক করাই যায়। [২] তথাপি তারা ভারতকে “কিছু করা”র জন্যে অনুপ্রাণিত করতে পারে। রাষ্ট্রকে দুর্বল করার Subversion-এর পদ্ধতিগুলি ভারত (যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে) কাজে লাগাতে চাইবে। যেসব অস্ত্রগুলি তারা কাজে লাগাতে চাইবে, সেগুলি স্টেট ডিপার্টমেন্টের ঐ প্রতিবেদনে পরোক্ষভাবে উল্লেখ রয়েছে- তথাকথিত জঙ্গী কর্মকান্ড, বিদেশী-‘মুক্তমনা’-মানবাধিকার কর্মী-সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, শ্রমিক অসন্তোষ, গণতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের নামে অরাজকতা, ইত্যাদি। এই কাজগুলি তারা সাম্প্রতিক সময়ে করেই আসছে, যার কিছু রেশ পাওয়া যাবে –

১। ধর্ষণ-হত্যার পর সমাজের অধঃপতনকে দায়ী না করে ক্যান্টনমেন্ট (সামরিক বাহিনীকে) টার্গেট করা
২। তুচ্ছ দাবীকে উপজীব্য করে দফায় দফায় নৌ ও সড়ক পরিবহণ ধর্মঘট করে দেশকে অচল করে ফেলা এবং সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা, যদিও শ্রমিকদের অবস্থার কোনদিনও উন্নতি হয় না
৩। গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের রাস্তায় নামিয়ে আনা, যখন শ্রমিকরা নিজেরাই জানে না যে কেন তারা কাজ বন্ধ করেছে
৪। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের রাস্তায় নামিয়ে আনা, অথচ আসল সামাজিক ইস্যুগুলি নিয়ে চুপ থাকা
৫। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে তুচ্ছ করে বিভিন্ন হেতুতে (যেমন- পরিবেশ, কৃষকের অধিকার, শ্রমিকের অধিকার, ভোক্তা অধিকার, নারীর অধিকার, ইত্যাদি) হাতে গোনা বিশেষ কিছু ইস্যুতে ধর্মঘটের ডাক এবং বাকি সময়ে চুপ করে থাকা
৬। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মেডিকেল কলেজ-হাসপাতালগুলিতে কর্মবিরতি পালন করে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা
৭। সংখ্যালঘুদের উপরে হামলা করে সেখানে বিশেষ কিছু লোককে পাঠানো, যাতে তারা মানুষকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারে
৮। উপরের সবগুলি ব্যাপারে মিডিয়াতে এমনভাবে রিপোর্ট করা, যাতে জনগণ ভয়ে থাকে

এই হুমকি দেবার কারণ আসলে কি? (প্রতিবেদনে উল্লেখ করা) বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড? অবৈধ আটক? রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সংযোগে গুম? জঙ্গি মতবাদে উদ্বুদ্ধ গ্রুপের হত্যাকাণ্ড? নারী ও শিশু নির্যাতন? শ্রমিক নির্যাতন? নাকি সবগুলি? এর উত্তর পাওয়া সম্ভব বাকি বিশ্বের দিকে তাকালে। মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলির মানবাধিকার কোন পর্যায়ে রয়েছে আজ, তা খুব একটা কষ্ট করে বোঝাতে হবে না। ঐ দেশগুলির সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক খাতির রয়েছে; তথাকথিত সন্ত্রাস দমনের জন্যে সামরিক-বেসামরিক চুক্তিও রয়েছে। অর্থাৎ এই হত্যাকান্ড, আটক, নির্যাতন –এগুলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ইরাকের আবু ঘরাইব কারাগার এবং গুয়ান্তানামো বে-তে যা করেছে, তাতে তথাকথিত মানবাধিকার নিয়ে তাদের আদৌ কোন মাথাব্যাথা থাকাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তানে বিমান হামলা করে তারা কতো মানুষকে নির্দয়ভাবে হত্যা করে Collateral Damage বলে ঘোষণা দিয়েছে, তার হিসাব করে বলা সম্ভব নয়। তাহলে কি কারণে এই হুমকি? কারণটা উপরে উল্লিখিত তথাকথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রগুলির তালিকার মাঝ থেকে বাদ রাখা হয়েছে, যা কিছু পাঠক হয়তো ধরতে পারবেন। এই কারণটা সেটাই যেটা উপরে উল্লিখিত সকল মানবাধিকার ভঙ্গকারী দেশও মেনে চলেছে, কিন্তু এখানে মানা হয়নি। এই কারণটা সেই চিন্তার গোড়ায় আঘাত হেনেছে, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা ধর্মবিশ্বাসের মতো অনুসরণ করে। সারা বিশ্বে মানুষের বাস্তবতা একদিকে প্রবাহিত হলেও সেই চিন্তাকে ধরে রাখতে তারা বদ্ধ পরিকর। এই চিন্তাটি হচ্ছে “নারীর অধিকার” নামের মরীচিকা। এই চিন্তার একটি মূল স্তম্ভ হলো “১৮ বছরের আগে কোন নারীকে বিয়ে করতে দেয়া যাবে না, তা সে যত প্রতিকূলতার মাঝেই পড়ুক না কেন”। ব্যাভিচারের মাধ্যমে জন্মলাভ করা পিতৃপরিচয়হীন সন্তানে দেশের সকল ডাস্টবিন ভরে যাওয়াটা এই রাষ্ট্রের সংস্কৃতি হতে পারে না। একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস্তবতার সাথে না গেলেও এই অসুস্থ্য চিন্তাকে লালন করতে তারা ছিল বদ্ধ পরিকর। আর তাই কয়েকটি প্রভাবশালী পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল বেশ কিছুদিন তাদের পত্রিকায়, টিভি চ্যানেলের গাড়িতে এবং দেয়ালে দেয়ালে “১৮” অঙ্কটি লিখে সারাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছে। এদের সেই বিফলতা প্রকৃতপক্ষে ছিল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিফলতা, যা কিনা এই কুরুচিপূর্ণ প্রতিবেদনের জন্ম দিয়েছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের তালিকায় থাকা বাকি “মানবাধিকার লঙ্ঘন”এর যে ক্ষেত্রটি নিয়ে এতো কথা, তা হলো তথাকথিত “বাল্য বিবাহ”।

যুক্তরাষ্ট্রের অমানবিক মানবাধিকারের হাত ধরে বঙ্গোপসাগরে ডোবার মতো অবস্থায় আজ নেই সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ (আসলে দুনিয়ার কেউই নেই)। দুনিয়ার আজকের বাস্তবতা হলো যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের সাথেই যুদ্ধরত। তার আদর্শকে সে জলাঞ্জলি দিয়েছে নিজেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। [৩] আর সেই আদর্শকেই এখনও সে সারা দুনিয়াতে বাজারজাত করতে চাচ্ছে তার এজেন্টদের মাধ্যমে। মার্কিন আদর্শ বাকি দুনিয়ার কাছে তার আকর্ষণ হারিয়েছে আরও আগেই; এখন শুধু এর বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যাচ্ছে তার আদর্শিক চিন্তাগুলিকে নর্দমায় ছুঁড়ে ফেলে দেবার মাধ্যমে। তার হুমকিও এখন মানুষের কাছে মূল্য হারিয়েছে। তার এজেন্টরা এখন ভীত। তাদের মনিবই তো চিন্তাকে বিসর্জন দিয়েছে; তাহলে তারা এখন কি করবে? মোটকথা চালকের আসনে পরিবর্তন যে আসছে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছে। আদর্শিক দ্বন্দ্বে পরাজয়ের মুখে যুক্তরাষ্ট্র এখন যে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটাই স্বাভাবিক।



[১] ‘অতঃপর যুক্তরাষ্ট্রের ভারত জয়?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

[২] ‘প্রশ্নের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৬

‘ওবামার যুদ্ধগুলো লড়বে কে?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৯ জানুয়ারী ২০১৭

[৩] ‘যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের যঙ্গেই যুদ্ধরত?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭