Saturday, 24 June 2017

জার্মানি এবং বাংলায় বিভাজনের ভূরাজনীতি

২৪শে জুন ২০১৭



ভারত জন্মের পর থেকেই একটি দুর্বল রাষ্ট্র, কারণ ব্রিটিশরা সেভাবেই ভারতকে তৈরি করেছে। আর ভারত টিকে আছে যে “মিরাক্কেল”-এর জন্যে, সেটিই হচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে অনেকের মাঝেই প্রচলিত আছে যে আসলে ভারত একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র। এই কথাটাকে ভিত্তি দেয়া হয়েছে একটা মিথ্যা কথাকে বারংবার প্রচার করার মাধ্যমে। যারা এই মিথ্যাটিকে প্রচার করেছে, তারা কিন্তু ঠিকই জানেন যে ভারত কতটা দুর্বল একটা রাষ্ট্র। আর তারা এই দুর্বলতার ভিত্তি সম্পর্কেও যথেষ্টই ওয়াকিবহাল। তবে একটা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে তখনই তৈরি করা হবে যখন দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর জন্যে একটা গভীর ভীতিকে ব্যবহার করা যাবে; নাহলে এই দুর্বলতাটা যারা তৈরি করেছে (পরাশক্তিরা), তাদের কোন কাজে আসবে না। তথাপি এখানে পরাশক্তিদের দুশ্চিন্তার একটা কারণ রয়ে যায় – যদি সেই দুর্বলতাকে সত্যিকার অর্থেই কেউ কাজে লাগিয়ে ফেলে? সেটা কিন্তু হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্বলের দুর্বলতার “গোপন” কাহিনী কেউ না জানে। এই কাহিনী গোপন করার নিমিত্তেই ভারতকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এই “গোপন” কাহিনীর গোড়ার কিছু কথা আলোচনায় আসলে অবশ্য “শক্তিশালী” বলার ভিত্তিটাই থাকবে না। এই আলোচনাতে কয়েক হাজার মাইল দূরে ইউরোপের এক উদাহরণ টেনে আনাটা প্রসঙ্গতঃ – জার্মানির বিভাজনের কাহিনী। এর আগের একটি পোস্টে ঊনিশ শতকে জার্মানির একত্রীকরণের কাহিনী পাওয়া যাবে। আর আজকের আলোচনাটি হলো এর পরের বিভাজনের কাহিনী নিয়ে। এই কাহিনীর মাধ্যমে দুর্বল করার ফর্মূলাটা পাঠক পেয়ে যাবেন বলে আশা করা যায়।

জার্মান রাষ্ট্র একত্রীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছিল জার্মানদের মাঝে সবচাইতে বড় রাজ্য প্রুশিয়া। বাকি ইউরোপ এই প্রুশিয়াকেই ‘জার্মান প্রবলেম’-এর মূল বলে ধরে নিয়েছিল। তাই প্রুশিয়ার বিরুদ্ধেই পরাশক্তিদের ছিল যতো ক্ষোভ।


জার্মানি আর পোল্যান্ড…



একটা জাতিকে রাজনৈতিকভাবে কি করে ভাঙ্গা যায়, তার সবচাইতে বড় উদাহরণ হচ্ছে জার্মানির বিভক্তি। এই বিভক্তি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই মূল বিভক্তি হয়েছিল। আজকের যে পোল্যান্ডকে সকলে চেনে, সেটা কতটুকু আসলে পোল্যান্ড আর কতটুকু জার্মানি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কিছুটা ইতিহাসচর্চা করতে হবে। জার্মান রাষ্ট্র একত্রীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছিল জার্মানদের মাঝে সবচাইতে বড় রাজ্য প্রুশিয়া। বাকি ইউরোপ এই প্রুশিয়াকেই ‘জার্মান প্রবলেম’-এর মূল বলে ধরে নিয়েছিল। তাই প্রুশিয়ার বিরুদ্ধেই পরাশক্তিদের ছিল যতো ক্ষোভ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পরে জার্মানি থেকে কিছু অংশ কেটে নিয়ে পোল্যান্ডকে দিয়ে দেয়া হয়। এই অংশটুকু ছিল প্রুশিয়ার কিছু অংশ। এভাবে পূর্ব প্রুশিয়া নামে একটা ছিটমহলের জন্ম দেয়া হয়, যা মূল জার্মানি থেকে আলাদা করে রাখা হয় ‘ডানজিগ করিডোর’ নামে একটা ভূখন্ড দ্বারা। এই ভূখন্ড দেয়া হয় পোল্যান্ডের কাছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আগে হিটলার পোল্যান্ডের কাছ থেকে ওই করিডোরখানা দাবি করে বসেন। তার দাবি না মানায় তিনি পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে প্রায় পুরো পোল্যান্ডই দখল করে নেন। যখন জার্মানরা পোল্যান্ড দখল করছিল, তখন সোভিয়েতরা ওই সুযোগে পোল্যান্ডের পুর্বের কিছু অংশ দখল করে নেয়। এই দখলীকৃত অংশের বিনিময়ে দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ শেষের পরে জার্মানি থেকে ভূখন্ড কেটে পোল্যান্ডকে দেয়া হয়। এতে একে জার্মান জাতিকে কয়েক টুকরা করা হয়, আবার পোল্যান্ডের পূর্বংশ পাওয়ার কারণে রাশিয়ার strategic depth বৃদ্ধি পায়।

১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডন প্রোটোকলের আওতায় ঠিক করা হয় যে জার্মানিকে ভেঙ্গে কোন কোন অংশে ভাগ করা হবে। তাই ১৯৪৫ সালে জার্মানির আত্মসমর্পনের সময়ে যদিও দেখা যায় যে আমেরিকানরা পূর্ব-সম্মতিক্রমে আঁকা বাউন্ডারি অতিক্রম করে ফেলেছে, তবু সমস্যা হয়নি। মার্কিনীরা চুক্তি মোতাবেক তাদের কিছু জায়গা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ছেড়ে দেয়। উপরের মানচিত্রের নীল অংশটুকু মার্কিনীরা সোভিয়েতদের কাছে ছেড়ে দিয়েছিল।


প্রুশিয়ার ব্যাপারে পরাশক্তিরা একমত…..



১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে লন্ডন প্রোটোকলের আওতায় ঠিক করা হয় যে জার্মানিকে ভেঙ্গে কোন কোন অংশে ভাগ করা হবে। তাই ১৯৪৫ সালে জার্মানির আত্মসমর্পনের সময়ে যদিও দেখা যায় যে আমেরিকানরা পূর্ব-সম্মতিক্রমে আঁকা বাউন্ডারি অতিক্রম করে ফেলেছে, তবু সমস্যা হয়নি। মার্কিনীরা চুক্তি মোতাবেক তাদের কিছু জায়গা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে ছেড়ে দেয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে কোন ভিত্তির উপরে লন্ডন প্রোটোকলের মানচিত্র তৈরি করা হয়েছিল? জার্মানির বর্তমান মানচিত্রের উপরে প্রুশিয়ার মানচিত্র superimpose করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। প্রুশিয়ার মূল অংশের পশ্চিম বাউন্ডারিকেই পূর্ব জার্মানির পশ্চিম বাউন্ডারি করে বাকি জার্মানি থেকে আলাদা করা হয়। এই বাউন্ডারিটা মানতেই মার্কিনীরা ১৯৪৫ সালে বেশ কিছু অঞ্চল থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নেয়। সাবেক প্রুশিয়ার মূল অংশ আলাদা করার ফলে এর পশ্চিমাংশ পড়লো পশ্চিম জার্মানিতে। আর বাকি অংশ? সেটা আরও জটিলভাবে ভাগ করা হলো।



জার্মানির পূর্বাংশ, যা একসময় প্রুশিয়ার অন্তর্গত ছিল, তার বেশিভাগই পোল্যান্ডকে দিয়ে দেয়া হয়। এর মাঝে ছিল সাইলেসিয়া, পমেরানিয়া, পোজেন, পশ্চিম প্রুশিয়া, পূর্ব প্রুশিয়া এবং ব্র্যান্ডেনবার্গের বেশ কিছুটা। শুধু অল্প কিছু অংশ (পূর্ব প্রুশিয়ার উত্তর অংশ) রাশিয়া কেটে নেয়, যা এখনও Kaliningrad exclave নামে রাশিয়ার অন্তর্গত রয়েছে। এসবকিছুর বিনিময়ে পোল্যান্ডের পূর্ব থেকে কিছু অংশ কেটে নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও পোল্যান্ডের সীমানা ওটাই আছে; অর্থাৎ status quo বজায় রাখা হয়েছে। পোল্যান্ড হচ্ছে রাশিয়ার সাথে বাকি ইউরোপের বাফার জোন; তাই পোল্যান্ডকে সবসময়েই কাটাছেঁড়ার মাঝে পড়তে হয়েছে। প্রুশিয়ার জন্মের পর (আঠারো শতকের শুরুতে) থেকে পোল্যান্ডের সমুদ্রের সাথে সরাসরি কোন যোগাযোগ ছিল না। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পরে ডানজিগ করিডোর জার্মানি থেকে কেটে পোল্যান্ডকে দিয়ে দেয়া হলে পোল্যান্ডের সাথে সমুদ্রের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিকে কমপক্ষে তিন ভাগে ভাগ করা হয়; আসলে প্রাক্তন প্রুশিয়াকে ভাগ করা হয় তিন ভাগে। এর পশ্চিমাংশ পড়ে পশ্চিম জার্মানিতে; মধ্যাঞ্চল পড়ে পূর্ব জার্মানিতে; আর পূর্বাংশ পরে পোল্যান্ডে। এভাবে জার্মানির একত্রীকরণে মূল ভূমিকা রাখা প্রুশিয়ানদেরকে তিন ভাগে ভাগ করা হয় যাতে ভবিষ্যতে প্রুশিয়ানরা একত্রিত হয়ে আবার নতুন করে শক্তিশালী জার্মান জাতি গঠন করতে না পারে। ১৯৮৯ সালে জার্মান পূণ-একত্রীকরণের পরে যদিও অনেকেই মনে করতে পারেন যে জার্মানরা আবারও একত্রিত হয়ে গিয়েছে, আসলে ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। কারণ বর্তমান পোল্যান্ডের প্রায় অর্ধেকই আসলে একসময় জার্মানি তথা প্রুশিয়ার অধীনে ছিল।

১৯৮৯ সাল। ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে বার্লিন ওয়াল। জার্মান জাতীয়তায় ঠিকমতো উস্কানি যে-ই দিতে পেরেছে, সে-ই জার্মানদের একত্রিত করে ফেলতে পেরেছে। তবে এটা হয়েছে জার্মানির আশেপাশে আগ্রাসী শক্তিগুলির কারণেই। প্রুশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সত্ত্বেও জার্মানরা আবারও একত্রিত হয়ে শক্তিশালী হতে পারে কিনা, সেটা দেখার বিষয়।


গোঁয়াড় জাতির উত্থান ঠেকানো….



এখানে নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে প্রুশিয়ার কথা বার বার এলেও সবচাইতে অদ্ভূত ব্যাপার হলো, হিটলারের জন্ম ছিল অস্ট্রিয়াতে। একজন অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত জার্মানও পেরেছিল জার্মানদের একত্রিত করে ফেলতে। অর্থাৎ জার্মান জাতীয়তায় ঠিকমতো উস্কানি যে-ই দিতে পেরেছে, সে-ই জার্মানদের একত্রিত করে ফেলতে পেরেছে। তবে এটা হয়েছে জার্মানির আশেপাশে আগ্রাসী শক্তিগুলির কারণেই। তারা যদি নিজেদের দ্বন্দ্বে জার্মানদেরকে বলির পাঠা হিসেবে ব্যবহার না করতো, তাহলে হয়তো কেউ জার্মান জাতীয়তাকে উস্কে দিতে পারতো না অতো সহজে। ইউরোপীয় শক্তিরা বহু বছর জার্মানদের বিভক্ত করে রেখে তাদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছিল। তাই দাসত্বের কুফল তাদেরকে বোঝাতে খুব একটা কষ্ট হয়নি। তবে যা-ই হোক, কোন একটা উদ্ভট কারণে জার্মানরা একত্রিত অবস্থায় অন্য যেকোন জাতির থেকে বেশি মনযোগ দিয়ে কাজ করে। প্রুশিয়াকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সত্ত্বেও জার্মানরা আবারও একত্রিত হয়ে শক্তিশালী হতে পারে কিনা, সেটা দেখার বিষয়।



ঊনিশ শতকে উত্থান এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করার কারণে জার্মানিকে তথা প্রুশিয়াকে ভেঙ্গে ফেলা হয়। ইউরোপের শক্তিশালী দেশগুলি মধ্য ইউরোপে শক্তিশালী কোন জাতির উত্থান পছন্দ করেনি। এই জার্মানরাই ইউরোপের শক্তির সমতা পুরোপুরি পালটে দেয়। এখন জার্মানদেরকে হিসেবের বাইরে রেখে কিছুই করা যায় না। বাকি ইউরোপ একভাবে চিন্তা করলে জার্মানরা আবার সেটা নিজেরদের ‘জার্মান পাল্লা’য় মেপে দেখে। যদি সেটা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে সেটা তারা মেনে নেয়না একেবারেই। এসব কারণে একুশ শতকে এসেও জার্মানি পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে একটা সমস্যা। মার্কিনীরা পুরো ইউরোপকে তাদের দিকে নিয়ে আসতে পারলেও জার্মানিকে পারে না অনেকক্ষেত্রেই, যদিও আজও জার্মানিতে মার্কিন সামরিক ঘঁটি রয়েছে। মার্কিনীরা পশ্চিমের আদর্শিক শক্তি সেটা মেনে নিয়েই পশ্চিমারা আমেরিকার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু জার্মানরা ঠিকই ‘জার্মান পাল্লা’য় মেপে নেয় সেটা। অর্থাৎ আদর্শিক কারণও তাদের জাতীয় স্বার্থের নিচে স্থান নেয়। অবশ্য সেটা জার্মানির জন্যেই তো শুধু প্রযোজ্য নয়; যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র কেন মিশরের হোসনী মোবারক, ইয়েমেনের আলী আব্দুল্লাহ সালেহ, সৌদি বাদশাহ, জর্দানের বাদশা আবদুল্লাহ, ওমানের সুলতান কাবুস, এবং আরও অনেক অগণতান্ত্রিক নেতাদের সমর্থন করে যাচ্ছে, তা বেশ সুন্দরভাবেই প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব হিলারি ক্লিনটন ব্যাখ্যা করেছেন তার “Hard Choices” বইতে। কিন্তু নিজেদের জন্যে আলাদা নিয়ম তৈরি করে নেয়া তো পরাশক্তির চিন্তা। জার্মানি কেন এমন আচরণ করবে? তারা কেন মার্কিন স্বার্থকে নিজেদের স্বার্থের নিচে স্থান দেবে? সেখানেই অন্তর্নিহিত সেই গোঁয়াড়, যাকে দুইটা বিশ্বযুদ্ধের পরে তিন ভাগে ভাগ করেও পুরোপুরি ঠিক করা যায়নি। গোঁয়াড় জাতিকে বশে আনাটা কঠিন, কিন্তু জরুরী। এদের সমস্যা হলো ঠিক নেতৃত্ব দেখতে পেলে এদের গোঁয়াড়তমি কমে না, বরং বাড়ে। এই গোঁয়াড়ের উদাহরণ বাকি বিশ্বেও রয়েছে।

১৮৫৭ সালের ভারতের মানচিত্রে দেখা যায় যে বোম্বে এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে শুধু অল্প কিছু ভূখন্ড তারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল, কারণ সেখানে উপকূলীয় সমুদ্রবন্দরগুলির নিয়ন্ত্রণই তাদের কাছে মূল বিষয় ছিল। অন্যদিকে বাংলা প্রেসিডেন্সিতেই ছিল তাদের পুরো ভূখন্ড। এই এলাকাটাই ছিল সবচাইতে সম্পদশালী, আর সেকারণেই ব্রিটিশরা সকল শক্তি নিয়োজিত করেছিল বাংলাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে। বাকি ভারত নিয়ন্ত্রণে নেয়াটা তাদের কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ, আর সেকারণেই পশ্চিম ভারত এবং বর্তমাদের পাকিস্তানের ভূখন্ডের অধীন ভারতের অংশগুলি ব্রিটিশরা বহু পরে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।


ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ - বাংলাতেই কেন হতে হবে?




ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ব্রিটিশরা এখানে কি দেখেছিল? ব্রিটিশরা ভারতে যে স্থানগুলিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিল, সেখানেই বড় ভূখন্ড নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। এই নীতির ফলাফল দেখা যায় ১৮৫৭ সালের ভারতের মানচিত্রে। বোম্বে এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে শুধু অল্প কিছু ভূখন্ড তারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল, কারণ সেখানে উপকূলীয় সমুদ্রবন্দরগুলির নিয়ন্ত্রণই তাদের কাছে মূল বিষয় ছিল। অন্যদিকে বাংলা প্রেসিডেন্সিতেই ছিল তাদের পুরো ভূখন্ড। এই এলাকাটাই ছিল সবচাইতে সম্পদশালী, আর সেকারণেই ব্রিটিশরা সকল শক্তি নিয়োজিত করেছিল বাংলাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে। বাকি ভারত নিয়ন্ত্রণে নেয়াটা তাদের কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ, আর সেকারণেই পশ্চিম ভারত এবং বর্তমাদের পাকিস্তানের ভূখন্ডের অধীন ভারতের অংশগুলি ব্রিটিশরা বহু পরে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। কিছু জায়গা তারা আবার পুরোপুরি দখলে নেয়ার দরকারই মনে করেনি; যেমন – হায়দ্রাবাদ, যা কিনা ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা আলাদা রাজ্য হিসেবেই রেখে গিয়েছিল। অর্থাৎ ভারত নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই এলাকাগুলির নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের কাছে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাহলে বাংলা কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ ছিল?



ব্রিটিশরা বাংলায় অবতরণ করেই এখানকার তিনটি বিশাল নদীর অববাহিকায় অবস্থিত বাংলার শক্তি অনুধাবন করতে পেরেছিল। আদর্শিক চিন্তার মাঝে থাকার কারণে তারা এক স্থানে সকল বৃষ্টি এবং এক স্থানে সকল নদনদীর জমাট পাকানোটার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিল; বাংলাকে তারা ধরে নিয়েছিল শক্তির কেন্দ্র। তারা ভারতের ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিয়েছিল এবং বুঝেছিল যে বাংলাতে একবার কেউ জেঁকে বসলে তাকে এখান থেকে উতখাত করা খুবই কঠিন হয়ে যায়। এই এলাকার কৃষিজ সম্পদের প্রাচুর্য্য, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ব্যাপক বৃষ্টিপাত, তিনটি বিশাল নদীর সঙ্গমস্থল, সমুদ্রবন্দরের আধিক্য, পানি-কেন্দ্রিক সংস্কৃতি ছাড়াও এখানকার ভূ-কৌশলগত অবস্থান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে ব্রিটিশরা বুঝেছিল যে যারা বাংলার নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই ভারতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলবে। তাদের প্রথম কাজটাই পরবর্তীতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল – কোলকাতায় একটি বন্দর প্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে পরবর্তীতে তারা বাংলার শক্তিকে দুই ভাগ করে ফেলতে পেরেছিল। তারা নিজেরা হতে চেয়েছিল এই ভূখন্ডের নিয়ন্ত্রণকারী; অন্য কাউকে সেটা দেবার ইচ্ছে তাদের ছিল না। তারা হিসেব কষে বুঝেছিল যে, যেহেতু এই এলাকার মুসলিমদের হাতে ব্রিটিশরা আগমণের আগ পর্যন্ত একনাগারে ৫৫১ বছর ক্ষমতা ছিল, তাই তারাই ছিল তাদের মূল ভীতি। আর ভূ-কৌশলগতভাবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বাংলাতেই মুসলিমদের সবচাইতে বড় অংশটুকু বাস করতো। এই অঞ্চলের মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশরা হিমসিম খেয়েছিল। প্রায় নিয়মিতভাবেই ব্রিটিশদের এই অঞ্চলে বিদ্রোহ দমন করতে হয়েছিল, যার সবচাইতে বড়টি ছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব, যখন ৫৭ হাজার সৈন্যের পুরো বেঙ্গল আর্মি বিদ্রোহ করে বসেছিল। বাকি ভারত থেকে সৈন্য এনে এই বিদ্রোহ দমন করতে হয়েছিল তাদের। তবে তারা যে ভয় পেয়েছিল এই বিদ্রোহের মাধ্যমে, সেই ভয় থেকে তারা বের হতে পারেনি কখনোই। তারা বুঝে গেছিল যে আজ হোক, কাল হোক, এই উপমহাদেশ তাদের ছাড়তেই হবে; আর সেটা হবে এই বাংলার সমস্যার কারণেই। বাংলার মানুষ বহু আগ থেকেই রাজনৈতিকভাবে বাকি ভারত থেকে বেশি সচেতন ছিল; তাই এরা যেমন নেতৃত্ব দিয়েছিল, তেমনি দখলের সময়ে এরাই ছিল সকলের দুশ্চিন্তা।

বাংলার অবশিষ্টাংশকে দুই ভাগ করে দুইটি দেশের কাছে দিয়ে দেয়া হয়। এমন এক পদ্ধতি করা হয়, যাতে ভারত-পাকিস্তানের মাঝে শত বৈরিতা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে যেন একাত্বতা থাকে – বাংলাকে কখনোই এক হতে দেয়া যাবে না। এখানকার মানুষ বাংলায় কথা বলতো সেকারণে নয় (আসলে বাংলা ছাড়াও এখানে আরও ভাষা ছিল), বরং ভূ-কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় আদর্শিকভাবে শক্তি ধরে রাখার এবং সেই শক্তিকে ব্যবহার করার উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে – সেই কারণে।


বাংলার বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের ঐক্য



বাংলাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিভাইড-এন্ড-রুল পদ্ধতির অনুসরণ করেছিল ব্রিটিশরা। অমুসলিমদেরকে শক্তিশালী করে মুসলিমদেরকে দুর্বল করার চেষ্টায় ছিল তারা। যার ফলশ্রুতিতে উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মতো ঘটনার জন্মও তারা দিতে সক্ষম হয়েছিল। এই দাঙ্গার জন্ম তারা দিতে পেরেছিল ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ চেষ্টার মাধ্যমে। (এর আগেই বিহার ও উড়িষ্যাকে বাংলা থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। আসামকে পুরোপুরি আলাদা করা হয় ১৯৪৭ সালে) যদিও বঙ্গভঙ্গ এরপরে রদ করা হয়েছিল, আসল ব্যাপারে ব্রিটিশরা হয়েছিল সফল। তারা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার এমন একটা বীজ বপন করে দিয়েছিল, যা কিনা শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালের মানচিন্ত্র তৈরিতে ব্যাপক সাহায্য করেছিল। ভূ-কৌশলগত দিক থেকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং রাজনৈতিকভাবে সবচাইতে শক্তিশালী বাংলার অবশিষ্টাংশকে (বিহার ও উড়িষ্যাকে আগেই আলাদা করা হয়েছিল) তারা দুই ভাগ করে দুইটি দেশের কাছে দিয়ে দেয়। শুধু তা-ই নয়, এমন এক পদ্ধতি তারা করে দিয়ে যায়, যাতে দু’টি দেশের মাঝে শত বৈরিতা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে যেন একাত্বতা থাকে – বাংলাকে কখনোই এক হতে দেয়া যাবে না। পরাশক্তিদের নীতি অনুসরণ করে ১৯৪৭ পরবর্তী উভয় দেশই বাংলার মানুষের শক্তিকে খর্ব করেছিল, যদিও ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ভারতের প্রায় পুরো রাজনৈতিক কর্মকান্ডই ছিল বাংলা-কেন্দ্রিক। ১৯০৯ সাল পর্যন্ত কোলকাতাই ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিকদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছিল কোলকাতায়। কোলকাতা ভারতকে দিয়ে দেয়া দেবার কারণে বঙ্গবন্ধুর কতটা কষ্ট হয়েছিল, সেটা তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই থেকে জানা যায়। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত পাকিস্তানের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বাঙ্গালী – এগুলি কোন দুর্ঘটনা নয়; সেটাই স্বাভাবিক ছিল। অর্থনৈতিক দিক থেকেও বাংলার থাকার কথা উপরে; কিন্তু বিভাজনের মাধ্যমে সেটাকে করা হয়েছে দুর্বল। কারখানা করা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, অথচ কারখানার কাঁচামাল আসতো পূর্ববাংলা থেকে। এদেরকে আলাদা করে ফেললে কেউই তো শক্তিশালী থাকে না। (এক্ষেত্রে তিন প্রধান নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহের উল্টোদিকে কোলকাতাকে পশ্চিমবঙ্গে মূল শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কারণে বিভাগ অনেক সহজ হয়েছে।) জার্মানির বিভাগের কাহিনীর সাথে প্রচুর মিল রয়েছে বাংলার কাহিনীর। যেভাবে প্রুশিয়াকে কয়েক টুকরো করে বিলিয়ে দেয়া হয়েছিল কয়েকটি দেশের মাঝে, ঠিক সেভাবেই বাংলাকে কয়েক টুকরো করে ভাগ-বাটোয়ারা করে ফেলা হয়েছিল। এরা বাংলায় কথা বলতো সেকারণে নয় (আসলে বাংলা ছাড়াও এখানে আরও ভাষা ছিল), বরং ভূ-কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় আদর্শিকভাবে শক্তি ধরে রাখার এবং সেই শক্তিকে ব্যবহার করার উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে – সেই কারণে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবুর রহমানের মতো রাজনীতিকদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছিল কোলকাতায়। যেহেতু বরাবরই বাংলা রাজনৈতিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে ছিল, তাই এখানকার মানুষের মাঝেও রাজনৈতিক চিন্তা বেশি দেখা যেত। এই রাজনৈতিক সচেতনতাকে আদর্শিক শক্তিরা কাজে লাগাতে পারে। যেখানে কোন ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা নেই, সেখানে আদর্শিক রাজনীতিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাটা কঠিন, কারণ এই রাজনীতির ধরণটা বেশ কিছুটা sophisticated, যেখানে চিন্তা করার ক্ষমতার অগ্রাধিকার থাকে। বাংলার মানুষ চিন্তার দিক থেকে এগিয়ে ছিল; তাই বাংলার বিভাজনটা পরাশক্তিদের কাছে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


শরীর থেকে মাথা আলাদা করা হলে আত্মা পালিয়ে যায়…




প্রুশিয়ার তথা জার্মান বিভাগ ইউরোপে একটা শক্তিশালী জাতির উত্থান প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। বাংলার বিভাগও বঙ্গোপসাগরে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। এই দুই বিভাজনে ব্যাপক মিল থাকলেও একটি জায়গায় দু’টি বিভাগের মাঝে অমিল রয়েছে। জার্মানি পশ্চিমা আদর্শকে তাদের জাতীয়তার নিচে স্থান দেয়ায় ইউরোপের আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক হয়েছে; যে কারণে জার্মান জাতীয়তাবাদকে দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলায় পশ্চিমা আদর্শের বিপরীত কোন আদর্শ যাতে গেঁড়ে বসতে না পারে, সেজন্য সেখানে জাতীয়তাবাদের প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে এমনভাবে, যাতে তা শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিতে না পারে। একটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৭১ সালে ভারত পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ) থেকে কোটিখানেক শরণার্থী নিয়ে মহাবিপদে পড়ে। হ্যাঁ, সেটা অর্থনৈতিক দিক থেকে বিরাট সমস্যা তৈরি করেছিল; ভারতের অভ্যন্তরীণ হিন্দু-মুসলিম সমস্যাকে জাগিয়ে দেবার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল; ভারতের বাঙ্গালীদের ‘বাঙ্গালীত্ব’কে জাগিয়ে দিয়েছিল ‘ভারতীয় জাতীয়তাবোধ’ উপেক্ষা করে; ভারতের পূর্বাংশের আদর্শিক আন্দোলনকে (তখনকার আদর্শিক আন্দোলন ছিল কমিউনিজম) পূর্ব বাংলার আদর্শিক আন্দোলনের সাথে মিলিয়ে ফেলার উপক্রম করেছিল। [1] কিন্তু আসল সমস্যা কি ছিল? আসল সমস্যা ছিল এই যে শরণার্থী প্রবাহের সাথে সৃষ্ট উপরোল্লিখিত সমস্যাগুলি এখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলে থাকা মানচিত্রকেই ভূলুন্ঠিত করেছিল! এটা ছিল পরাশক্তিদের বেঁধে দেয়া নিয়মের প্রচন্ড বরখেলাপ! ব্রিটিশরা যে নিয়ম ১৯৪৭ সালে রেখে গিয়েছিল, মার্কিনীরা সেটা বজায় রেখেছিল ১৯৭১ সালে। বাংলায় একটা আদর্শিক উত্থানই কেবল এই নিয়মকে ভেঙ্গে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারতো। আর বাংলার শক্তিশালী ভূ-কৌশলগত অবস্থান তাদের হস্তগত হতো ঐ মুহুর্তেই; তখন এই প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শিক শক্তিকে মোকাবিলা করা পরাশক্তিদের জন্যে অত্যন্ত কঠিন হয়ে যেত। তাই পরাশক্তিরা এই এলাকায় আবারও একটি আদর্শিক শক্তির উত্থান চায় না।



যেহেতু বরাবরই এই এলাকা রাজনৈতিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে ছিল, তাই এখানকার মানুষের মাঝেও রাজনৈতিক চিন্তা বেশি দেখা যেত। এই রাজনৈতিক সচেতনতাকে আদর্শিক শক্তিরা কাজে লাগাতে পারে। যেখানে কোন ধরনের রাজনৈতিক সচেতনতা নেই, সেখানে আদর্শিক রাজনীতিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাটা কঠিন, কারণ এই রাজনীতির ধরণটা বেশ কিছুটা sophisticated, যেখানে চিন্তা করার ক্ষমতার অগ্রাধিকার থাকে। বাংলার মানুষ চিন্তার দিক থেকে এগিয়ে ছিল; তাই বিভাজনটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা মানুষের দেহ থেকে হাত-পা এমনকি যৌনঙ্গ আলাদা করে ফেললেও তার বেঁচে থাকার ক্ষমতা রয়ে যায়। কিন্তু মাথা যদি দেহ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়, তাহলে তার দেহ থেকে আত্মা চলে যায়। বাংলা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মাথা। এটা ছাড়া অন্য যেসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকবে, সেগুলিকে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে খুব সহজেই – কারণ চিন্তা করার মাথাখানা তো কয়েক ভাগ করে ফেলা হয়েছে।



দুই পরমাণু হাইড্রোজেনকে ধরে রাখে এক পরমাণু অক্সিজেন



বাংলার ব্যাপারটাকে রসায়নে পানির অণুকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। পানির এক অণুতে অক্সিজেনের একটি পরমাণুর সাথে দু’টি হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে। অক্সিজেন পরমাণুটি ছাড়া হাইড্রোজেন পরমাণুদু’টি কিছুই করতে পারে না। অক্সিজেন পরমাণুটিই হলো হাইড্রোজেনগুলির যোগসূত্র। এই হাইড্রোজেনের একটি পরমাণু হলো বাংলার ভূ-কৌশলগত অবস্থান আর আরেকটি হলো এর বিশাল জনগোষ্ঠী – এদেরকে আগলে রেখে একত্রিত করে অক্সিজেনের পরমাণু, অর্থাৎ আদর্শিক শক্তি। এরা আলাদা থাকলে পানি কখনোই তৈরি হয় না; আর পানি তৈরি হবার আগে হাইড্রোজেন পরমাণুদু’টি কখনোই বোঝে না যে এরা একত্রিত হলে পানি তৈরি হয়। বরং অক্সিজেনের অভাবে হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলিকে অন্য যৌগরা তাদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করে; তারা শুধু ব্যবহৃতই হয়ে যেতে থাকে।



বাংলায় পশ্চিমাদের (ব্রিটিশদের পরে মার্কিনীরা এই দায়িত্ব নিয়েছে) এই ব্যবস্থার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে হিন্দু-মুসলিম বিভেদ। ব্রিটিশরা আসলে এখানে কি করেছিল? তারা শুধু বাংলার মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল যে “সমাজব্যবস্থা” মূল আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত নয়; মূল আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত “আমার গোষ্ঠী”র স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কি-না। এভাবে ব্রিটিশরা বাংলার মানুষের জন্যে খেলার মাঠ তৈরি করে দিয়ে গেছে। এখানকার মানুষ সেই মাঠের নিয়মের ভেতরে চলে; আর মাঠে নেমে নিজেদের জাতি-গোত্র নিয়ে মারামারি করে। জার্মানির জন্যে প্রুশিয়া আর ভারতীয় উপমহাদেশের জন্যে বাংলা – উভয়টিই ডিভাইড এন্ড রুল-এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। তবে যেটা একেবারে শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে – এই খেলাটা চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্বলের দুর্বলতা প্রকাশ না পায়, আর শক্তিশালী তার শক্তির উতসকে খুঁজে না পায়।



[1] পড়ুন – ‘Myths and Facts: Bangladesh Liberation War’ by B.Z. Khasru (2010)

এবং ‘Blood Telegram: India’s Secret War in East Pakistan’ by Gary J Bass (2013)

Friday, 23 June 2017

হলিউডের ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

২৪শে জুন ২০১৭



হলিউড হলো মার্কিন রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মার্কিন জনগণকে পথ দেখিয়ে যাবার কাজটা অনেক ক্ষেত্রেই হলিউড করেছে। ১৯৮০-এর দশকে ঠান্ডা যুদ্ধের শেষাংশের চাইতে অন্য কোন সময় সম্ভবত এই কাজ অতটা গুরুত্ব বহন করেনি। ১৯৯০-এও সেব্যাপারটা কিছুটা চলেছিল। সেসময়ের মার্কিন মুভি এবং টিভি সিরিয়ালগুলির দিকে তাকালে দেখা যায় যে হলিউড তখন সকলের কথাই চিন্তা করেছে। টম ক্রুজ এগিয়ে থাকা মার্কিন তরুণদের রক্তে আগুন দিয়েছিলেন তার Top Gun মুভির মধ্য দিয়ে। আরনল্ড শোয়ার্জনেগার ছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল হিরো; সিলভেস্টার স্ট্যালোন, কার্ট রাসেল এবং ভ্যান ড্যামরাও ছিলেন ঐ ধাঁচেরই। ব্রুস উইলিস, মেল গিবসন আকর্ষণ করেছিলেন সমাজের ঐ লোকগুলিকে, যারা কিনা নিজেকে সমাজের জন্যে সপে দিচ্ছেন নিজে কিছু না পেয়েও, যেমন পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সিকিউরিটি গার্ড – এধরনের লোকজন। এডি মার্ফি আকর্ষণ করেছিলেন কালোদের ঐ অংশটাকে, যারা কিনা কালোদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে ছিলেন সন্দিহান। আবার ডেনজেল ওয়াশিংটন এবং ওয়েসলি স্নাইপস কালো-সাদা দন্দ্ব কমাতে চেষ্টা করেছেন; তবে এরা আকর্ষণ করেছিলেন শহুরে sophisticated মানুষগুলিকে। পুলিশ নিয়ে অনেকগুলি মুভি তৈরি হয়েছিল; সামরিক বাহিনী নিয়ে মুভিগুলি ছিল কিছুটা নেগেটিভ – ভিয়েতনাম যুদ্ধের কালো ছায়াটা সমাজকে ঘিরে রেখেছিল তখন। সামরিক সার্ভিস নিয়ে ঐ নেগেটিভ মাইন্ডসেট থেকে উতড়ানোর চেষ্টা তারা করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে তৈরি মুভিগুলি দিয়ে; এর মাঝে Saving Private Ryan-এর নাম হয়তো সর্বপ্রথমে আসবে। Forrest Gump-এর মাধ্যমে গ্রামাঞ্চল এবং ছোট শহরের পিছিয়ে থাকা মানুষদেরকে রাষ্ট্রের সাথে একত্রিত করার চেষ্টা করা হয়; আশা দেয়া হয় তাদেরকে। কেভিন কস্টনারের মুভিগুলিও ছিল সেরকমই। Hawaii Five-O তৈরি করা হয়েছিল হাওয়াই-এর জন্যে; Miami Vice তৈরি করা হয়েছিল মায়ামির জন্যে। ডেট্রয়েট এবং শিকাগোর জন্যেও তৈরি হয়েছিল মুভি এবং টিভি সিরিজ। মোট কথা, রাষ্ট্র সকলের কথাই চিন্তা করতো তখন। সেসময় মার্কিন চিন্তাচেতনা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছে একাই। রাষ্ট্রের চিন্তার সাথে জনগণের চিন্তা যাতে সাংঘর্ষিক না হয়, তার চেষ্টা তারা করতেন মোটামুটিভাবে। কারণ এক্ষেত্রে অমিল রাষ্ট্রকে দুর্বল করবে।

   

যেটা দেখার ব্যাপার হবে তা হলো, ২১ শতকে এসে হলিউড কি তৈরি করছে? হলিউডের মুভিগুলি এখন যতটা না আমেরিকান, তাই চাইতে বেশি গ্লোবাল। ব্রুস উইলিসের মুভি দেখলে বোঝা যায় যে মার্কিন রাষ্ট্রের জন্যে নিজেকে সঁপে দেবার মানুষদেরও বয়স বেড়ে গেছে। টম ক্রুজ এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন শহুরে এগিয়ে থাকা মানুষগুলিকে সাথে রাখতে; তবে তাদেরও বয়স বাড়ছে। এখন এডভেঞ্চার-সুপার হিরো-টেকনো ফ্লিকগুলি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে নিয়ে ভাবে না। একসময় মার্কিন জীবনযাত্রাকে দুনিয়ার কাছে নিয়ে গিয়েছিল হলিউড। তখন তাদের চিন্তাধারার ধার ছিল বলেই দুনিয়ার মানুষের অন্তরে মার্কিন মুল্লুকের জন্যে একটা আকর্ষণ তৈরি করতে পেরেছিল তারা। কিন্তু এখন মার্কিন যুদ্ধবাজিকে দুনিয়ার সামনে নিয়ে যায় হলিউড, যখন মার্কিন বোমার আঘাতে সারা দুনিয়া ক্ষতবিক্ষত। বাকি দুনিয়ার কাছেও হলিউডের এই অফারগুলি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে নিজ দেশে, অর্থাৎ খোদ যুক্তরাষ্ট্রে Forrest Gump-এর মতো মানুষগুলি এখন কি করবে? সে কি সুপার হিরো হতে পারবে কখনো? নাকি টম ক্রুজের মুভির মতো sophisticated চিন্তার অধিকারী?



মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে বারংবার চেষ্টা করেও হলিউড বোঝাতে পারছে না যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন যুদ্ধের মাঝে রয়েছে, যার জন্যে মার্কিন জনগণকে রাষ্ট্রের সাথে থাকতে হবে। যখন জনগণের বিরাট অংশের মাঝে চিন্তা ঢুকে গেছে যে তারা রাষ্ট্র দ্বারা অবহেলিত, তখন সেখানে কোন বার্তাই যে কানে যাবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। উইল স্মিথ তার The Pursuit of Happiness মুভির মাধ্যমে দেশের পিছিয়ে থাকা জনগণকে আশা দেবার যে চেষ্টাটা করেছেন, তা এখন প্রতারণা হিসেবেই দেখবে বেশিরভাগ মানুষ। Rush Hour মুভিতে ক্রিস টাকারকে জ্যাকি চ্যানের সাথে ব্যবহার করা হয়েছে চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নকে মাথায় রেখে; কালোদের জন্যে আলাদাভাবে কিছু করার জন্যে নয়। বরং এই মুভিতে কালোদেরকে মাথামোটা দেখিয়ে ছোটই করা হয়েছে।


মার্কিন চিন্তার চাকা এখন আর নিজে নিজে ঘুরছে না; ঠেলে নিতে হচ্ছে। হলিউডের অবস্থাও তা-ই। হলিউডে এখন টেকনলজি আছে; চিন্তা নেই। হলিউডে গ্লোব আছে; আমেরিকা নেই। বাকি বিশ্বের মানুষ এখন হলিউডের মাঝে যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছে; মার্কিন জনগণ কোথাও যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছে না। “We are 99”-এর কোন প্রত্যুত্তর হলিউডের কাছে নেই। বাকি বিশ্বকে জোর করে সন্ত্রাসী বানিয়ে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরার চেষ্টাটা এখন হাস্যকরই বটে। নিজেদের দ্বন্দ্বকে [১] ধামাচাপা দেয়াটাই যে এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। হলিউড এখন কি দেখাবে সেটা এখন প্রশ্নবোধক চিহ্ন। কারণ মার্কিনীরা এখন আর জানে না যে আগামীকাল কি হবে। বোঝা যাচ্ছে যে চাবির গোছার মালিক পরিবর্তন হতে চলেছে। 



[১] ‘প্রশ্নের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১লা সেপ্টেম্বর ২০১৬

‘ওবামার যুদ্ধগুলো লড়বে কে?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৯ জানুয়ারী ২০১৭

‘যুক্তরাষ্ট্র কি নিজের যঙ্গেই যুদ্ধরত?’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৭

Thursday, 27 April 2017

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড গড়ার সময় এসেছে

২৭শে এপ্রিল ২০১৭

বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সৈন্যদের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণের মাঝে দিয়ে বেশকিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে বটে, তবে সেই অপারেশনগুলি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সীমিত অবদানই রাখবে। কারণ শান্তিরক্ষী মিশনের লক্ষ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রাখবে না। সত্যিকার অর্থে, এধরনের প্রভাব বৃদ্ধি যাতে না হয়, জাতিসংঘ সেটা লক্ষ্য রাখে। কাজেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শান্তিরক্ষী মিশনের বাইরেও অপশন খুঁজতে হবে।


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বের কাছে বাড়ছে বাংলাদেশের সন্মান, প্রতিপত্তি, প্রভাব। এর মাঝে যে ব্যাপারটি বড় একটি ভূমিকা রাখে তা হলো সামরিক সক্ষমতা। এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের বর্তমান প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রয়ের সাথে সাথে সক্ষমতা তৈরির নীতির জানান দেয়া হয়েছে মাত্র। তবে সাবমেরিনের এই উপাখ্যান দরকার ছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের নামকে জাহির করার। যদিও এই জাহির করার মাঝে একটি কালো দাগ পড়েছে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করার মাঝ দিয়ে। তথাপি সক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের চিন্তাশীল মহল অব্যাহতই রাখতে চান, এবং একইসাথে ভারতের প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় দেখার ইচ্ছাই এক্ষেত্রে প্রবল। ভারতের প্রভাবকে নিষ্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে একটি প্রধান চিন্তা হবে বাংলাদেশের প্রভাবকে বৃদ্ধি করা। এই প্রভাব বৃদ্ধি ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে জাকার্তায় আইওআরএ শীর্ষ বৈঠকে, ঢাকায় আইপিইউ সন্মেলনে, কসোভোকে স্বীকৃতির মাঝ দিয়ে, এবং এশিয়া-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকায় কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক কর্মকান্ডকে ভিন্ন উচ্চতায় নেবার মাধ্যমে। এখান এই প্রভাবের মাঝে সামরিক সক্ষমতাকে ‘ফিট’ করার পালা।

বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের সৈন্যদের শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণের মাঝে দিয়ে বেশকিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছে বটে, তবে সেই অপারেশনগুলি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সীমিত অবদানই রাখবে। কারণ শান্তিরক্ষী মিশনের লক্ষ্য বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রভাব বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মিশনে অংশগ্রহণ বড় ভূমিকা রাখবে না। সত্যিকার অর্থে, এধরনের প্রভাব বৃদ্ধি যাতে না হয়, জাতিসংঘ সেটা লক্ষ্য রাখে। কাজেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শান্তিরক্ষী মিশনের বাইরেও অপশন খুঁজতে হবে।
   
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল নাইজেরিয়া সফরের ছবি। বাংলাদেশ পৃথিবীতে বন্ধু খোঁজে। আর সেকারণেই আফ্রিকার বহু দেশে বাংলাদেশের বন্ধু তৈরি হয়েছে, যেখানে অনান্য অনেক দেশ নির্যাতকের তকমা নিয়ে আফ্রিকা ছাড়ছে। বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতা গড়াটা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ার সাথে সম্পর্কিত। আর এখানেই আবারও আসছে সামরিক প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার কথা। বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নীতির সাথে এর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বন্ধুর সাথে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার বিনিময় – এটাই হতে পারে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূলমন্ত্র।


বন্ধুর সাথে প্রশিক্ষণ – নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহযোগিতার উত্তম ক্ষেত্র


বাংলাদেশ পৃথিবীতে বন্ধু খোঁজে। আর সেকারণেই আফ্রিকার বহু দেশে বাংলাদেশের বন্ধু তৈরি হয়েছে, যেখানে অনান্য অনেক দেশ নির্যাতকের তকমা নিয়ে আফ্রিকা ছাড়ছে। বন্ধু বন্ধুর বাড়িতে ঢোকে দরজা দিয়ে; কারণ বন্ধু বন্ধুর জন্যেই দরজা খুলে দেয়। চোর বা ডাকাত বাড়িতে ঢোকে সিঁদ কেটে। চোরের তাই দরকার হয় সিঁদ কাটা যন্ত্রপাতির। বাংলাদেশের সেধরণের যন্ত্রপাতির দরকার নেই। বরং বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়, এমন জিনিসই বাংলাদেশ সাথে নেবে। বন্ধুর কাছ থেকে বন্ধু কিছু পায়; চোরের কাছ থেকে নয়। বরং চোর মানুষের কাছ থেকে জিনিস কেড়ে নেয়। বাংলাদেশের বন্ধুরাও বাংলাদেশের কাছ থেকে কিছু পাবে; তাই তারাও বাংলাদেশের বন্ধু হতে চাইবে। বাংলাদেশ সামরিক দিক থেকে প্রশিক্ষণকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা সারা বিশ্বের কাছে একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর প্রফেশনালিজম বাকি দুনিয়ার মানুষ দেখেছে বিভিন্ন সময়ে। আর সেকারণেই পৃথিবীর বহু দেশের সামরিক অফিসাররা এখানে আসে প্রশিক্ষণের জন্যে। এই একই ইমেজটা বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ধরে রেখেছে বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষী মিশনে। তবে এখন এই শান্তিরক্ষী মিশনের মাঝে আটকে না থেকে অভিজ্ঞতা এবং প্রফেশনালিজমকে পুঁজি করে বাকি বিশ্বের কাছে বন্ধুত্বের বাণী পৌঁছে দিতে হবে। আর এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ হবে উত্তম একটি সহযোগিতার ক্ষেত্র। বিশ্ব পরিসরে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার প্রভাবকে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে গেলে যে বিষয়গুলি বেশি গুরুত্ব পাবে, তার মাঝে থাকবে প্রশিক্ষণ।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী নিজ দেশে অন্য দেশের সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দেশের মাটিতে নিজেকে আটকে রাখাটা দূরদর্শিতার পরিচায়ক নয়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা এখন শুধু ১৯৪৭-এ ব্রিটিশদের নির্ধারণ করে দেয়া ১ লক্ষ ৪৪ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মাঝে নয়। যখন প্রায় কোটিখানেক বাংলাদেশী দুনিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে, তখন এদেশের সশস্ত্র বাহিনীর দেশে বসে বসে ভাববার সময় নেই। বাংলাদেশের হাজারো সৈন্য এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে; বিশেষ করে আফ্রিকায়। সুতরাং নিরাপত্তার সংজ্ঞা নিয়ে ভাববার সময় এখন এসেছে; নিরাপত্তা-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা নিয়েও ভাববার সময় এসেছে। বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের নিরাপত্তা দেবার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর থাকতে হবে। নাহলে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বুলি ফাঁপা ঠেকবে। ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরুর পর সেই দেশ থেকে বাংলাদেশীদের সরিয়ে আনার জন্যে ভারতের (যাকে কিনা শত্রু রাষ্ট্র জ্ঞান করে দেশের বেশিরভাগ জনগণ) দ্বারে ধর্ণা দিতে হয়েছে, যা কিনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উন্নত করেনি, বরং আরেকটি রাষ্ট্রের কাছে ঋণগ্রস্ত করে কূটনৈতিকভাবে দেশকে দুর্বল করেছে। কাজেই বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক এবং সামরিক সক্ষমতা গড়াটা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ার সাথে সম্পর্কিত। আর এখানেই আবারও আসছে প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার কথা। বাংলাদেশের বন্ধুত্বের নীতির সাথে এর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বন্ধুর সাথে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার বিনিময় – এটাই হতে পারে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূলমন্ত্র।

বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাইরে প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পদ্ধতি নিয়ে সক্ষমতা-বিষয়ক কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। যেমন বাংলাদেশের বাইরে এই প্রশিক্ষণ কর্মকান্ড পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা কি বাংলাদেশের আছে? উত্তরে বলতে হবে যে অবশ্যই আছে। তবে একইসাথে এটাও বলতে হবে যে এই সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এই সক্ষমতাকে পরবর্তী উচ্চতায় নিতে কিছু সাংগঠনিক পরিবর্তন দরকার। যেমন, বাংলাদেশের বাইরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে কিছু ইউনিট গঠন করে সেগুলিতে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পোস্টিং দেয়া যেতে পারে। এধরণের একটি ইউনিট সব বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে। একটি ‘ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড’এর অধীনে নিম্নোক্ত কিছু ইউনিট গঠন করা যেতে পারে –
  
সেনাবাহিনীর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একত্রে বাংলাদেশের বাইরে মোতায়েন করা যাবে। আর বেশ কিছুদিনের জন্যে মোতায়েনও থাকতে পারবে। এর মূল ইউনিটটি একটি ব্যাটালিয়ন হলেও এর সাথে বেশকিছু অনান্য ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একে কমপক্ষে ব্রিগেড পর্যায়ের মর্যাদা দেবে। আর ইউনিটটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে এর মোবিলিটি। এর সকল কিছুই হবে হাইলি মোবাইল। তবে মোতায়েনের এলাকার উপর ভিত্তি করে এর কম্পোজিশন পরিবর্তিত করা যেতে পারে।

সেনা ইউনিটঃ

সেনাবাহিনীর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একত্রে বাংলাদেশের বাইরে মোতায়েন করা যাবে। আর বেশ কিছুদিনের জন্যে মোতায়েনও থাকতে পারবে। এর মূল ইউনিটটি একটি ব্যাটালিয়ন হলেও এর সাথে বেশকিছু অনান্য ইউনিট থাকা উচিত, যা কিনা একে কমপক্ষে ব্রিগেড পর্যায়ের মর্যাদা দেবে। আর ইউনিটটির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে এর মোবিলিটি। এর সকল কিছুই হবে হাইলি মোবাইল। তবে মোতায়েনের এলাকার উপর ভিত্তি করে এর কম্পোজিশন পরিবর্তিত করা যেতে পারে। এখানে ইউনিটের সংখ্যা সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই ইউনিটে থাকতে পারে -

১। একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন

২। মেকানাইজড ইউনিট (বিটিআর-৮০ এপিসি – ২০টি এবং অতোকার কোবরা এপিসি – ১২টি)

৩। আর্টিলারি ইউনিট (ডব্লিউএস-২২ রকেট লঞ্চার – ৪টি, নোরা বি-৫২ হাউইটজার – ৬টি এবং এসএলসি-২ রাডার – ১টি)

৪। এয়ার ডিফেন্স ইউনিট (একটি এফএম-৯০ ইউনিট)

৫। ট্রান্সপোর্ট ইউনিট (২০টি ট্রাক, ২০টি টেকনিক্যাল। সাথে এটিজিম থাকা উচিত।)

৬। ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট (সাথে মাইন ক্লিয়ারেন্স এবং রিভার ক্রসিং ইকুইপমেন্ট থাকতে পারে)

৭। সিগনালস ইউনিট (স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন সহ)

৮। মেডিক্যাল ইউনিট

৯। মেইনটেন্যান্স ইউনিট

১০। প্যারাকমান্ডোদের একটি ডিটাচমেন্ট

১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ের ছবিতে ব্রিটিশ রয়েল নেভির কনটেইনার জাহাজ 'এটলান্টিক কনভেয়র'এর ডেকের উপরে বিমানের সারি দেখা যাচ্ছে। এরকম জাহাজ ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম অনেক দূরে পরিবহণ করা সম্ভব।

  নৌ ইউনিটঃ

এর প্রধান কাজ হবে সেনা এবং বিমান ইউনিটসমূহকে পরিবহণ করা এবং পরিবহণ করার ও বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানের সময় সমুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইসাথে বন্ধুদেশের নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের সাথে প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া। এখানে সাতটি জাহাজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ইউনিট এর চাইতে ছোট বা বড় হতে পারে। যে জাহাজগুলি এখনও বাংলাদেশের নেই, সেগুলি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেয়া হয়েছে কিছু উদাহরণের মাধ্যমে। এখানে এই নৌ ইউনিটটি বন্ধু দেশের বন্দরের উপরে নির্ভর করবে; অর্থাৎ বন্ধুর বাড়িতে ঢোকার পথ হলো বন্ধুই দরজা খুলবে। এখানে এমন কোন ইউনিট থাকবে না, যা কিনা বন্ধুর বাড়ির জানালার সিঁদ কেটে ঢোকার মতো মনে হয়।

এই ইউনিটে থাকতে পারে -

১। একটি ফ্রিগেট (সাথে একটি হেলিকপ্টার থাকলে সবচাইতে ভালো; না থাকলে অন্য কোন ইউনিটে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করতে হবে)

২। একটি এলপিসি (দুর্জয়-ক্লাস)

৩। একটি ওপিভি (কোস্ট গার্ডের সাদা রঙের একটি জাহাজ এখানে বেশি মূল্যবান হবে)

৪। একটি ট্রুপ শিপ (১,০০০ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন একটি জাহাজ, যা বাণিজ্যিকভাবে কিনে নিজেদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নেয়া যেতে পারে। এতে অবশ্যই ১,০০০ মানুষের কমপক্ষে তিন সপ্তাহ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। হেলিপ্যাড এবং স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন অতি দরকারী ব্যাপার হবে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রাক্তন জাহাজ বিএনএস শহীদ সালাহউদ্দিন-এর নাম বলা যেতে পারে, যদিও এখন এর চাইতে আরও আপডেটেড জাহাজ দরকার হবে।)

৫। একটি কনটেইনার শিপ (১৬০ থেকে ১৮০ মিটারের মাঝে, যা কিনা চট্টগ্রাম বন্দরে ঢুকতে পারে এবং আফ্রিকার বেশিরভাগ বন্দরে ঢুকতে পারবে। এটিকে বিমান এবং অনান্য সরঞ্জামাদি পরিবহণে ব্যবহার করা হবে। বাণিজ্যিকভাবে কিনে এটাকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে হবে যাতে ডেকের উপরে বিমান বহণ করা যায়। মোটামুটি ১৪-১৫টা বিমান বহণ করার মতো সক্ষমতা থাকলে এটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। কিছু অংশ হেলিপ্যাডের জন্যে খোলা রাখতে হবে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হবে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ রয়াল নেভির ব্যবহৃত ২১২ মিটার লম্বা এবং ১৫,০০০ টনের ‘আটলান্টিক কনভেয়র’ এবং ‘আটলান্টিক কজওয়ে’, যেগুলির ডেকের উপরে করে ২৪ থেকে ২৮টি বিমান নেয়া হয়েছিল ফকল্যান্ডে।)

ব্রিটিশ রয়েল নেভির 'পয়েন্ট-ক্লাস'-এর রো-রো ফেরি, যা কিনা বেশ কয়েক'শ গাড়ি বহনে সক্ষম। এরকম জাহাজে একটি সামরিক ইউনিটের প্রায় সকল গাড়িই বহুদূর পর্যন্ত বহন করা সম্ভব।

 ৬। একটি রো-রো ফেরি (বাণিজ্যিকভাবে কিনে এটাকে নিজেদের প্রয়োজনে পরিবর্তন করে নেয়া যাবে। সামরিক গাড়ি এবং সরঞ্জাম এই ফেরি বহণ করবে। এটার আকারও ১৬০ থেকে ১৮০ মিটারের মতো হওয়া উচিত বন্দর সুবিধা নেবার জন্যে। উদাহরণস্বরূপ রয়াল নেভির ‘পয়েন্ট-ক্লাস’এর কথা বলা যেতে পারে। ১৯৩ মিটার এবং ২৩,০০০ টনের এই জাহাজগুলি ১৩০টি সাঁজোয়া যান এবং ৬০টি ট্রাক বহণ করতে পারে।)

৭। একটি সাপ্লাই জাহাজ (পথে জ্বালানি বা অন্য কোনকিছুর সরবরাহের ঘাটতি পূরণ করতে পারার মতো। তবে পুরো পথের সরবরাহ নিশ্চিতের দরকার নেই। বাংলাদেশের জাহাজ পৃথিবীর বেশিরভাগ বন্দরেই “ওয়েলকাম”)

৮। স্পেশাল ফোর্স সোয়াডস-এর একটি ডিটাচমেন্ট (সাথে হাই-স্পিড বোট থাকা উচিত।)


আফ্রিকার কঙ্গোতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সি-১৩০ পরিবহণ বিমান। বাংলাদেশের বাইরে প্রশিক্ষণ মিশনে বিমান থাকাটা অবশ্য দরকারি।


বিমান ইউনিটঃ

বিমান ইউনিটের মাঝে সব ধরনের বিমানই রাখা হয়েছে। প্রশিক্ষণ সকল ক্ষেত্রেই দরকার; তাই বিমানের ধরনের ক্ষেত্রেও তা-ই হওয়া উচিৎ। সংখ্যার দিক থেকে একটা ধারণা এখানে দেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে এখানে যে সংখ্যা বলা হবে, তা কিন্তু পরিবহণও করতে হবে।

এই ইউনিটে থাকতে পারে -

১। একটি ফাইটার ইউনিট (এফ-৭বিজি – ৪টি এবং এফ-৭বিজিআই ৪টি)

২। একটি ট্রান্সপোর্ট ইউনিট (এলইটি-৪১০ – একটি। এটি নিজ শক্তিতে উড়ে গন্তব্যে যাবে, যদিও বাকিরা যাবে জাহাজে।)

৩। হেলিকপ্টার ইউনিট (এমআই-১৭১ – ৪টি এবং আগুস্টা এ-১০৯ – ২টি)

৪। ড্রোন ইউনিট (অবজারভেশন মিশনের জন্যে একটি ড্রোন ইউনিট অবশ্যই থাকা উচিত)

৫। রাডার ইউনিট (একটি এয়ার সার্চ রাডার গ্রাউন্ডে বসানোর জন্যে এই কমান্ডে থাকা উচিত)

৬। মেইনটেন্যান্স ইউনিট

৭। এয়ারবেইস ইউনিট (এরকম ইউনিট বাংলাদেশ আফ্রিকার একাধিক দেশে মোতায়েন করেছে। এরকমই আরেকটি ইউনিট এই কমান্ডে থাকতে পারে।)


কোস্ট গার্ডের সাদা রঙের একটি জাহাজ ওভারসীজ ট্রেনিং-এ খুবই মূল্যবান হবে। ‘ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড’এর মাধ্যমে এরকম মিশনে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এবং প্রফেশনালিজম যেমন আরও উন্নত হবে, তেমনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা বাড়বে। একইসাথে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন হবে এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাবও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। শক্তিশালী বাংলাদেশ শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, বাস্তব জীবনে দেখাতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।


উদাহরণ হিসেবে কয়েকটি রাষ্ট্রের কথা বলা যেতে পারে, যাদের সাথে বন্ধুপ্রতীম প্রশিক্ষণ এবং অভিজ্ঞতা আদান-প্রদান হতে পারে; যেমন – শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, তাঞ্জানিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়া, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওন, ইত্যাদি। দূরত্ব হিসেবে এধরনের প্রশিক্ষণ মিশনের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হতে পারে। ‘ওভারসীজ ট্রেনিং কমান্ড’এর মাধ্যমে এরকম মিশনে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা এবং প্রফেশনালিজম যেমন আরও উন্নত হবে, তেমনি বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা বাড়বে। একইসাথে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির উন্নয়ন হবে এবং বিশ্বব্যাপী প্রভাবও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। শক্তিশালী বাংলাদেশ শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, বাস্তব জীবনে দেখাতে হবে। আর সেক্ষেত্রে সামরিক সক্ষমতা একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।


Tuesday, 25 April 2017

তুলা ও গমের মনোপলি বাংলাদেশ যেভাবে ভাঙতে পারে

পৃথিবীর মানুষকে কাপড় পড়তেই হবে। জন্তু-জানোয়ারের সাথে মানুষের একটি প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, মানুষ চিন্তা করতে পারে এবং একারণে তার লজ্জাবোধ রয়েছে – সেখানেই কাপড়ের প্রয়োজন। কিন্তু এই কাপড়ের বাজারকে দুনিয়ার অল্প কিছু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে দেয়াটা অনুচিত (যা অবশ্য অনেককাল ধরেই চলে আসছে)। ২০০৯-১০ সাল থেকেই তুলার বাজার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের খেলার ক্রীড়নক হওয়া থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ তুলার বিকল্প উৎস খুঁজতে থাকে। এর একটি পাওয়া যায় মধ্য এশিয়ায়। মোট ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেখানে তুলা চাষ হয়, যা এলাকার আকৃতির তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ! ৮ লক্ষ ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি সারা দুনিয়ার তুলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে বোঝাই যায় যে মধ্য এশিয়ার ৫-৬ লক্ষ হেক্টর এলাকা তুলা চাষের অধীনে আনা গেলে তুলার বাজারের মনোপলি থাকবে না। কাপড় পড়ার অধিকার সকলেরই আছে; শুধু যাদের হাতে ক্ষমতা রয়েছে, তাদের নয়।
২৫শে এপ্রিল ২০১৭



তুলার বাজারের নিয়ন্ত্রণ তিনজনের হাতে!

‘ইউএস ডিপার্টমেন্ত অব এগ্রিকালচার’ (ইউএসডিএ) তুলার বাজার নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট প্রকাশ করে। ২০১৭-এর এপ্রিলের রিপোর্টে তারা দেখাচ্ছে যে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচাইতে বড় তুলা আমদানিকারক রাষ্ট্র। সারা বিশ্বের সব রাষ্ট্র মিলে যে পরিমাণ তুলা ২০১৬-১৭তে আমদানি করেছে, তার মাঝে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ১৮% বা প্রায় প্রায় ১৪ লক্ষ টন। বাংলাদেশের পরে ভিয়েতনাম প্রায় ১২ লক্ষ টন, চীন ১০ লক্ষ টন, তুরস্ক ৭ লক্ষ টন, ইন্দোনেশিয়াও প্রায় ৭ লক্ষ টন, পাকিস্তান প্রায় ৬ লক্ষ টন এবং ভারত প্রায় ৫ লক্ষ টন তুলা আমদানি করে। ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আমদানিকারক রাষ্ট্র ছিল চীন। তবে তারা ক্রমান্বয়ে আমদানি কমিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশ সবচাইতে বড় আমদানিকারক হয়ে উঠেছে। সবচাইতে বেশি রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২৯ লক্ষ টন, ভারত প্রায় ১০ লক্ষ টন, অস্ট্রেলিয়া প্রায় ৯ লক্ষ টন, ব্রাজিল ৬ লক্ষ টন, উজবেকিস্তান প্রায় ৪ লক্ষ টন, বুরকিনা ফাসো প্রায় আড়াই লক্ষ টন এবং মালি দুই লক্ষ টনের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র একাই আন্তর্জাতিক বাজারের প্রায় ৩৭% তুলা সরবরাহ করে। অর্থাৎ পৃথিবীর তুলার বাজার যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তুলার বাজারে উত্থান পতনের কারণও যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা রপ্তানির পরিমাণ দেখলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা – প্রায় ২৯ লক্ষ টন (২০১৬-১৭), প্রায় ২০ লক্ষ টন (২০১৫-১৬), সাড়ে ২৪ লক্ষ টন (২০১৪-১৫), প্রায় ২৩ লক্ষ টন (২০১৩-১৪) এবং ২৮ লক্ষ টনেরও বেশি (২০১২-১৩)। ভারতের অবস্থান হচ্ছে সবচাইতে অবাক করা। ভারত একইসাথে রপ্তানি করে এবং আমদানি করে। ভারত ২০১৬-১৭ সালে প্রায় ৫ লক্ষ টন তুলা আমদানি করলেও রপ্তানি করেছে প্রায় ১০ লক্ষ টন! এর আগের বছর ভারতের রপ্তানি ছিল সাড়ে ১২ লক্ষ টন, আর রপ্তানি দুই লক্ষ টনের উপরে। ২০১৪-১৫ সালে রপ্তানি করেছে ৯ লক্ষ টনের বেশি; ২০১৩-১৪ সালে ২০ লক্ষ টন; ২০১২-১৩ সালে প্রায় ১৭ লক্ষ টন! এক বছরের সাথে আরেক বছরের কোন মিলই নেই! তুলা উৎপাদনে আবহাওয়া যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ঠিক। তবে তুলা যে দুনিয়ার বেশিরভাগ স্থানে যথেষ্ট পরিমাণে হয় না, এটাও ঠিক। এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং অস্ট্রেলিয়া এই বাজারের কর্তৃত্ব নিয়ে খেলা খেলছে, এবং সেটা আবার রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহার করছে।

পৃথিবীর মানুষকে কাপড় পড়তেই হবে। জন্তু-জানোয়ারের সাথে মানুষের একটি প্রধান পার্থক্য হচ্ছে, মানুষ চিন্তা করতে পারে এবং একারণে তার লজ্জাবোধ রয়েছে – সেখানেই কাপড়ের প্রয়োজন। কিন্তু এই কাপড়ের বাজারকে দুনিয়ার অল্প কিছু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে দেয়াটা অনুচিত (যা অবশ্য অনেককাল ধরেই চলে আসছে)। ২০০৯-১০ সাল থেকেই তুলার বাজার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের খেলার ক্রীড়নক হওয়া থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ তুলার বিকল্প উৎস খুঁজতে থাকে। এর একটি পাওয়া যায় মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানে। উজবেকিস্তান তাদের প্রায় ৮ লক্ষ টন উৎপাদনের অর্ধেকটা রপ্তানি করে। উজবেকিস্তানের পার্শ্ববর্তী তুর্কমেনিস্তানে তুলা উৎপাদন হয় প্রায় ৩ লক্ষ টন। তবে ঐ এলাকার বাদবাকি দেশগুলি তেমন একটা তুলা উৎপাদন করে না; যেমন বিশাল জমি থাকা সত্ত্বেও কাজাকস্তান উৎপাদন করে মাত্র ৬২ হাজার টন, তাজিকিস্তান ৮৫ হাজার টন এবং কিরগিজস্তান ৯ হাজার টন। মোট ৪ লক্ষ ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে সেখানে তুলা চাষ হয়, যা এলাকার আকৃতির তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ! ৮ লক্ষ ৩৯ হাজার হেক্টর জমিতে তুলা চাষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি সারা দুনিয়ার তুলার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে বোঝাই যায় যে মধ্য এশিয়ার ৫-৬ লক্ষ হেক্টর এলাকা তুলা চাষের অধীনে আনা গেলে তুলার বাজারের মনোপলি থাকবে না। কাপড় পড়ার অধিকার সকলেরই আছে; শুধু যাদের হাতে ক্ষমতা রয়েছে, তাদের নয়।
    
বিশাল কাজাকস্তানের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৮০ লক্ষ। আর তাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ৯০ লক্ষ। এর মাঝে ২৫ লক্ষেরও কম কৃষিতে নিযুক্ত। তাদের প্রধান ফসল গম। ১ কোটি ২৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে দেড় কোটি টন গম উৎপাদন করে প্রায় ৭৫ লক্ষ টন তারা রপ্তানি করেছে ২০১৬-১৭ সালে। আর বাংলাদেশ আমদানি করেছে মোট ৫৮ লক্ষ টন গম। মার্কিন-ভারতীয় খাদ্যশস্য-রাজনীতির শিকার হয়েছে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাবের জানান দিয়েছে। বাংলাদেশের আহ্বানে অনেকেই এখন সাড়া দেবে। মধ্য এশিয়ার বিশাল চারণ-ভুমিতে গম এবং তুলার আবাদ ছাড়াও সেখানে পশুপালনের মাধ্যমে পৃথিবীর খাদ্য সমস্যা সমাধানের একটি পথ খোঁজা যেতে পারে। সেখানে কৃষিকাজে জনশক্তির যে অভাব রয়েছে, তা বাংলাদেশ পূরণ করতে সহায়তা করতে পারে।

গমের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছয়জনের হাতে!


গম একটি খাদ্যশস্য এবং পৃথিবীর অনেক মানুষের কাছেই গম প্রধান খাদ্যশস্য। অথচ পৃথিবীতে মাত্র ১১টি দেশ (ইইউ একত্রে ধরে) মোট ১৮ কোটি টন গমের বাণিজ্যের প্রায় ৯৪% নিয়ন্ত্রণ করে। আরও বিশেষভাবে বিবেচনা করলে মাত্র ৬টি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউক্রেন এবং আর্জেন্টিনা) সারা বিশ্বের মোট গমের বাণিজ্যের ৭০% নিয়ন্ত্রণ করে! । এখানে আর্জেন্টিনা অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে বড় রপ্তানিকারক হয়েছে। আর এই ছয় দেশের মাঝে রাশিয়া রয়েছে বলেই যুক্তরাষ্ট্রের মনোপলিকে ব্যালান্স করার কিছুটা চেষ্টা রয়েছে। সবচাইতে বড় গম আমদানিকারক রাষ্ট্র হলো মিশর (প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ টন)। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (৯০ লক্ষ টন), আলজেরিয়া (৮২ লক্ষ টন), ব্রাজিল (৭৩ লক্ষ টন), বাংলাদেশ (৫৮ লক্ষ টন), জাপান (৫৮ লক্ষ টন), মরক্কো (৫৫ লক্ষ টন), ফিলিপাইন (৫৫ লক্ষ টন), ভিয়েতনাম (৫০ লক্ষ টন), মেক্সিকো (৪৯ লক্ষ টন), তুরস্ক (৪৮ লক্ষ টন), নাইজেরিয়া (৪৫ লক্ষ টন), দক্ষিণ কোরিয়া (৪৫ লক্ষ টন), চীন (৪০ লক্ষ টন) এবং ভারত (শুধু এক বছরের জন্যে ৫৫ লক্ষ টন)। বাংলাদেশ গত ৫-৬ বছরের মাঝে একটি প্রধান গম আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তবে প্রায় সবাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে ঐ ৬টি দেশের রাজনীতি দ্বারা। উদাহরণস্বরূপ, ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হবার পর বাংলাদেশ যখন রাশিয়া থেকে গম কিনতে যাচ্ছিল, তখন একটি বিশেষ দেশের দূতাবাস বাংলাদেশ সরকারের উপরে চাপ সৃষ্টি করে রাশিয়ার বদলে ইউক্রেন থেকে গম আমদানি করতে বাধ্য করতে চাইলো। অথচ মানব-সৃষ্ট কারণে এখন পৃথিবীর ৪টি দেশের ২ কোটিরও বেশি মানুষ খাদ্যের অভাবে দুর্ভিক্ষের শিকার! [১] এখন সেই রাজনীতি মানবতার পক্ষে অবস্থান নেয়নি, কারণ সেই রাজনীতি হচ্ছে মুনাফা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি; মানুষের কল্যাণের রাজনীতি নয়। এই অনিষ্টের রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসার একটি পথ রয়েছে – খাদ্যশস্য উৎপাদনকে ছড়িয়ে দিয়ে গুটিকয়েক মুনাফাখোরের হাত থেকে বের করে নিয়ে আসা। এই লক্ষ্যে গম চাষের জন্যে নতুন ভূমি খুঁজতে হবে।
  
মধ্য এশিয়ার বেশিরভাগ মানুষই মুসলিম। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মুসলিমদের কাছে তাসখন্দ, বুখারা এবং সমরখন্দের নাম অতি পরিচিতই শুধু নয়, সেই শহরগুলি তাদেরকে টানে। উপমহাদেশে ইসলাম যাদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদেরও অনেকেই এসেছিলেন মধ্য এশিয়া থেকেই। সেখানকার বিশাল ভূমি সারা বিশ্বের কোটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণের এবং লজ্জা ঢাকার সমাধান হতে পারে। সেই সমাধান খোঁজায় বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে পারে

মধ্য এশিয়ায় সমাধান...

কাজাকস্তানের রাষ্ট্রদূত (অনাবাসিক) কয়েকবার ঢাকায় আসেন এবং রাষ্ট্রপতি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বাংলাদেশকে কাজাকস্তানে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির অনুরোধ করেন। বিশাল কাজাকস্তানের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৮০ লক্ষ। আর তাদের কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ৯০ লক্ষ। এর মাঝে ২৫ লক্ষেরও কম কৃষিতে নিযুক্ত। তাদের প্রধান ফসল গম। ১ কোটি ২৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে দেড় কোটি টন গম উৎপাদন করে প্রায় ৭৫ লক্ষ টন তারা রপ্তানি করেছে ২০১৬-১৭ সালে। উজবেকিস্তান ১৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ৭২ লক্ষ টন গম উৎপাদন করলেও চাহিদা বেশি থাকায় ২৭ লক্ষ টন আমদানি করতে হয়েছে তাদের। কাজাকস্তানে জনশক্তি রপ্তানির অফারের মাঝেই লুকিয়ে আছে খাদ্যশস্য-ভিত্তিক এই ব্যাপক শোষণ থেকে মুক্তির পথ। আন্তর্জাতিক বাজারে জুয়ার মতো গম বিক্রি না করে সরাসরি ক্রয়ের মাঝে গেলে মূল্য নিয়ে মনোপলি খেলা কমতে পারে। এর জন্যে প্রয়োজন শক্ত আন্তর্জাতিক কৃষি-জোট। বিশ্বের প্রধান কৃষি-ভিত্তিক রাষ্ট্রগুলির একটি হওয়ায় বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করতে পারে। মার্কিন-ভারতীয় খাদ্যশস্য-রাজনীতির শিকার হয়েছে বাংলাদেশ বিভিন্ন সময়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাবের জানান দিয়েছে। বাংলাদেশের আহ্বানে অনেকেই এখন সাড়া দেবে। মধ্য এশিয়ার বিশাল চারণ-ভুমিতে গম এবং তুলার আবাদ ছাড়াও সেখানে পশুপালনের মাধ্যমে পৃথিবীর খাদ্য সমস্যা সমাধানের একটি পথ খোঁজা যেতে পারে। সেখানে কৃষিকাজে জনশক্তির যে অভাব রয়েছে, তা বাংলাদেশ পূরণ করতে সহায়তা করতে পারে। এ লক্ষ্যে কিছু বাস্তসম্মত কার্যকলাপকে তালিকাভুক্ত করা যেতে পারে –

১। মধ্য এশিয়ার কাজাকস্তান, উজবেকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের সাথে আলোচনা করে কৃষিতে ব্যাপক-ভিত্তিক বিনিয়োগের ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছানো। জমির দীর্ঘমেয়াদি লীজ এক্ষেত্রে একটি সমাধান হতে পারে।

২। বাংলাদেশের টেক্সটাইল এবং ফুড-প্রসেসিং শিল্পে বিনিয়োগ করা কোম্পানিগুলিকে মধ্য এশিয়ায় কৃষিতে বিনিয়োগ করতে অনুপ্রেরণা যোগানো। এই বিনিয়োগ জমিতে, কৃষি যন্ত্রপাতিতে, সেচে, বীজ-সার-কীটনাশকে, শস্য প্রসেসিং-এ, শস্য স্টোরেজে, পরিবহণে এবং ডিস্ট্রিবিউশনে হতে পারে।

৩। বাংলাদেশ থেকে কৃষিতে অভিজ্ঞতা-সম্পন্ন জনশক্তি মধ্য এশিয়ায় রপ্তানির ব্যবস্থা করা।

মধ্য এশিয়ার বেশিরভাগ মানুষই মুসলিম। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মুসলিমদের কাছে তাসখন্দ, বুখারা এবং সমরখন্দের নাম অতি পরিচিতই শুধু নয়, সেই শহরগুলি তাদেরকে টানে। উপমহাদেশে ইসলাম যাদের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদেরও অনেকেই এসেছিলেন মধ্য এশিয়া থেকেই। সেখানকার বিশাল ভূমি সারা বিশ্বের কোটি মানুষের ক্ষুধা নিবারণের এবং লজ্জা ঢাকার সমাধান হতে পারে। সেই সমাধান খোঁজায় বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে পারে।



[১] ‘অস্তিত্ব-সংকটে জাতিসংঘ’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১৬ই মার্চ ২০১৭

Sunday, 23 April 2017

ব্যর্থ সফর এবং নিম্নমানের কূটনীতি

২৪শে এপ্রিল ২০১৭

ভারত যেসব দেশের সাথে সামরিক সমঝোতা করতে পারে, যেমন নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান – এরাও যখন ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে, তখন বাংলাদেশের নেতৃত্বের ভারতের পক্ষ থেকে আসা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় সামরিক সমঝোতার প্রস্তাব এড়িয়ে যেতে না পারাটা রাজনৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ। অন্তত তিস্তা চুক্তি না হবার কারণেও বাংলাদেশের পক্ষে সহজেই ভারতের উপরে চাপ সৃষ্টি করে সামরিক সমঝোতা এড়ানো যেত।


একটি সম্পূর্ণ অদরকারি সমঝোতা......

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করলেন এবং বাংলাদেশের জনগণের অতি আকাংক্ষিত পানির সমস্যা সমাধান না করেই দেশে ফেরত আসলেন। কাজেই এই সফরকে আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ সফর বলা ছাড়া গতি থাকে না। ভারত তাঁকে ডেকে নিয়ে গেছে এমন সময়, যখন তিস্তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত বাংলাদেশের মানুষ শুধু পানির ব্যাপারেই একটি মিমাংসা চাইছিল। মূল আলোচ্য বিষয় পানিকে পাশে ঠেলে দিয়ে যখন নিরাপত্তা এবং সামরিক বিষয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব করা হলো, তখন সেই সফরের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। ভারত খুব ভালো করেই জানে যে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের সাথে যে কোন ধরণের সামরিক সমঝোতার বিরুদ্ধতা করবে; কারণ একে তো মুসলিম বিশ্বাসের বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ভারতের বিজেপি সরকারের মাঝে হিন্দুত্ববাদিতা দেখে, তার উপরে ভৌগোলিক এবং রাজনৈতিক কারণেও ভারতকে একমাত্র শত্রুদেশ হিসেবে চিন্তা করে। এমন একটি রাষ্ট্রের সাথে সামরিক সমঝোতা বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে ছোট করা হবে জেনেই ভারত এই সমঝোতায় বাংলাদেশকে চাপ দেয়।

তবে শুধু ভারতকে দোষারোপ করলেই তো হবে না। বাংলাদেশের তরফ থেকেই বা এই সমঝোতায় সই করা হলো কেন? বাংলাদেশ যখন সাবমেরিন ক্রয় করেছিল, তখন দিল্লীর নীতিনির্ধারকদের ঘর্মাক্ত শরীর জানান দিয়েছিল এমন এক বাংলাদেশের আবির্ভাবের, যা কিনা কারও দাসত্ব স্বীকার করবে না। কিন্তু এর পরবর্তীতে কি এমন ঘটে গেল যে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চীন থেকে সমরাস্ত্র ক্রয়কে ব্যালান্স করতে গিয়ে আবার ভারতের সাথেই সামরিক সমঝোতায় বসতে হবে? চীন থেকে সমরাস্ত্র ক্রয়কে যদি ব্যালান্স করতেই হয়, তাহলে ভারতকে দিয়ে সেই ব্যালান্স নয়, করতে হবে অন্য কাউকে দিয়ে; যাতে ভারতও ব্যালান্সে থাকে। ভারত যেসব দেশের সাথে সামরিক সমঝোতা করতে পারে, যেমন নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, ভুটান – এরাও যখন ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে, তখন বাংলাদেশের নেতৃত্বের ভারতের পক্ষ থেকে আসা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় সামরিক সমঝোতার প্রস্তাব এড়িয়ে যেতে না পারাটা রাজনৈতিক দুর্বলতার লক্ষণ। অন্তত তিস্তা চুক্তি না হবার কারণেও বাংলাদেশের পক্ষে সহজেই ভারতের উপরে চাপ সৃষ্টি করে সামরিক সমঝোতা এড়ানো যেত।


বঙ্গবন্ধু যে মুহুর্তে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে করমর্দন করলেন এবং অনান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিলেন, তখন ভারতের পায়ের তলা থেকে মাটি সড়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এরূপ উদাহরণ থাকতে বাংলাদেশের চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করাটা অত্যন্ত নিম্নমানের কূটনীতির পর্যায়ে পড়ে।

ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকে ইমব্যালান্স করবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও পাকিস্তানের কাছ থেকে যুদ্ধাপরাধের জন্যে একটি ক্ষমা প্রার্থনাও আসেনি; বরং সম্পর্ক আগের মতোই ঠান্ডা রয়ে গেছে। এই বিরোধ মিটমাট করাটাই কি সবচাইতে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল না, যা করতে পারলে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ব্যালান্সটাই পরিবর্তিত হয়ে যেত। এরকম সমস্যা মিটমাট না করাটি কি ভারতের স্বার্থকেই সমুন্নত করেনি? ভারত কি নিশ্চিন্ত থাকছে না, যে বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানের সাথে সে আলাদাভাবে সামরিক সংঘাতে যেতে পারবে, কারণ একজনকে আক্রমণ করলে অন্যজন ‘নিরপেক্ষ’ থাকবে? বাংলাদেশের ইতিহাসেই ভারত-পাকিস্তানকে ব্যালান্স করার চমৎকার উদাহরণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু যে মুহুর্তে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে করমর্দন করলেন এবং অনান্য মুসলিম দেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নিলেন, তখন ভারতের পায়ের তলা থেকে মাটি সড়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক কূটনীতির এরূপ উদাহরণ থাকতে বাংলাদেশের চীনকে ব্যালান্স করার জন্যে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করাটা অত্যন্ত নিম্নমানের কূটনীতির পর্যায়ে পড়ে।



   
হিন্দুত্ববাদী ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কি মুচলেকা নেবে, যে ভারত তার মার্কিন-নির্মিত এপাচি হেলিকপ্টার বাংলাদেশের ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না? কোন গ্যারান্টিতে বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে যে ভারত তার পি-৮ বিমানকে বাংলাদেশের সদ্য ক্রয় করা সাবমেরিনকে খুঁজে বের করতে ব্যবহার করবে না? ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করে বাংলাদেশ কি জানান দিলো না, যে ভারতের সাথে চীন বা পাকিস্তানের সংঘর্ষে বাংলাদেশ ভারতের সাথেই থাকবে? আর এরকম সমঝোতার ফলাফল যদি হয় যে বাংলাদেশ তেমন কোন সংঘাতে ভারতের পাশেই থাকবে, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি ভারতের দ্বারা ঠিক করা হলো না? বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তখন কোথায় গেলো?

ভারত একটি শত্রু রাষ্ট্র

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী থাকার একমাত্র কারণ ভারত। বাংলাদেশের নেতৃবর্গকেও ভুলে গেলে চলবে না যে ভারতীয় সমরাস্ত্র ব্যবহৃত হবার স্থান শুধু পাকিস্তান বা চীনের সীমানা নয়; এখানে বাংলাদেশও অন্তর্ভুক্ত। হিন্দুত্ববাদী ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কি মুচলেকা নেবে, যে ভারত তার মার্কিন-নির্মিত এপাচি হেলিকপ্টার বাংলাদেশের ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে না? কোন গ্যারান্টিতে বাংলাদেশের জনগণ মেনে নেবে যে ভারত তার পি-৮ বিমানকে বাংলাদেশের সদ্য ক্রয় করা সাবমেরিনকে খুঁজে বের করতে ব্যবহার করবে না? তাহলে বাংলাদেশই বা কেন ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করবে, যখন এটি একটি জানা ব্যাপার যে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে চীনের সাথে এবং কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সংঘর্ষ বাধার সম্ভাবনা সর্বদাই রয়েছে? ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করে বাংলাদেশ কি জানান দিলো না, যে এধরণের যেকোন আন্তর্জাতিক সংঘর্ষে বাংলাদেশ ভারতের সাথেই থাকবে? আর এরকম সমঝোতার ফলাফল যদি হয় যে বাংলাদেশ তেমন কোন সংঘাতে ভারতের পাশেই থাকবে, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কি ভারতের দ্বারা ঠিক করা হলো না? বাংলাদেশের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা তখন কোথায় গেলো?

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’এর কার্যকলাপ নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই যখন কথা বলেছেন, তখন কাউকে বলে দিতে হয় না যে ভারত বাংলাদেশের জন্যে একটি নিরাপত্তা সমস্যা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করা একটি দেশের সাথে কোন ধরনের নিরাপত্তা সমঝোতা সম্ভব হতে পারে, সেটার বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যাখ্যা দেয়া কষ্টকর। সেই সমস্যা সৃষ্টিকারী দেশকেই আবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা দিতে হবে – সেটাই বা কোন ধরনের হীন চিন্তার ফসল? প্রধানমন্ত্রী যখন বলেছিলেন যে, ‘আক্রান্ত হলে সমুচিত জবাব দেবার সক্ষমতা আমাদের আছে’, তখন তো তিনি নিশ্চয়ই ভারতকে বাদ দিয়ে বলেননি! তাহলে যার থেকে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে (সবচাইতে বেশিই রয়েছে), তার সাথেই আবার নিরাপত্তা সমঝোতায় যাওয়াটা কোন যুক্তিতে যুক্তিযুক্ত? যাতে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচা যায় – এই যুক্তিতে? এটা কি মাথা নোয়াবার পর্যায়ে পড়ে যায় না? মুসলিম হিসেবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে মাথা নত করাটা এদেশের মানুষের বাস্তবতা হতে পারে না।
ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তির তোষণের মাঝেই ভারত তার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। কোন বুদ্ধিতে পানি চুক্তি না করে বরং একটি সম্পূর্ণ অদরকারি সামরিক সমঝোতায় স্বাক্ষর করার জন্যে বাংলাদেশের উপরে চাপ দিয়ে তারা যেভাবে পুরো বাংলাদেশকে নিজেদের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করলেন, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিত্বের প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ ছিল ভারতের এই কর্মকান্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ব্যর্থতার দায়ভার অনেকাংশেই ভারতের।

নিম্নমানের কূটনীতি এবং রাজনৈতিক চিন্তার দেউলিয়াত্ব

পৃথিবীর সবচাইতে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের কাছে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব আনতে ভারতের নেতৃবর্গের লজ্জাবোধ হওয়া উচিত ছিল। জাতিসংঘের মিশনে ভারতের সৈন্য প্রেরণের পরে জাতিসংঘ বাজে মানের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে ভারতকে জরিমানা করে! আর সেই ভারত কোনরূপ লজ্জাবোধ তো দূরে থাকুক, বরং ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তির তোষণের মাঝেই তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। [১] কোন বুদ্ধিতে পানি চুক্তি না করে বরং একটি সম্পূর্ণ অদরকারি সামরিক সমঝোতায় স্বাক্ষর করার জন্যে বাংলাদেশের উপরে চাপ দিয়ে তারা যেভাবে পুরো বাংলাদেশকে নিজেদের বিরুদ্ধে উজ্জীবিত করলেন, সেটা তারাই ভালো বলতে পারবেন। বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিত্বের প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ ছিল ভারতের এই কর্মকান্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ব্যর্থতার দায়ভার অনেকাংশেই ভারতের।

বাংলাদেশ শক্তিশালী হবেই। কিন্তু তাই বলে চীনকে ব্যালান্স করার নামে ভারতের সাথে সামরিক সমঝোতা করার মতো নিম্নমানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা? এধরণের সমঝোতা শক্তিশালী বাংলাদেশের পরিপন্থী, তাই এর বাস্তবায়নও বর্জনীয়। বিশেষ করে যে সমঝোতা রাষ্ট্রের নাগরিকদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করে এবং বিভাজনের রাজনীতিকে উস্কে দেয়, তা কোনদিনও জনকল্যানকর হতে পারে না। এই রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সৃষ্টি হয়েছে যাদের হাত থেকে রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে তাদের সাথেই নিরাপত্তা চুক্তি করাটা রাজনৈতিক চিন্তার দেউলিয়াত্বের লক্ষণ। 



[১] 'যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভারতের নির্ভরশীলতা বাড়ছে', সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৬
'অতঃপর যুক্তরাষ্ট্রের ভারত জয়?', সাম্প্রতিক দেশকাল, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

Wednesday, 12 April 2017

বাংলাদেশ- জাপান সম্পর্ক কোনদিকে যাবে?

১৩ই এপ্রিল ২০১৭

জাপানের কোস্ট গার্ড খুবই সমৃদ্ধ। ১২ হাজার সদস্যের এই বাহিনী আকারে আরেকটি নৌবাহিনীর মতো। পূর্ব চীন সাগরে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় কোস্ট গার্ডের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে আরও বেশি। কোস্ট গার্ড সেদেশের নেতৃত্বকে আরও একটি অপশন দেয়। যেখানে নৌবাহিনী পাঠানোটা কূটনৈতিক দিক থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হতে পারে। সাদা রঙের জাহাজের বিরুদ্ধে সাদাই মোতায়েন করতে হবে – এরমকম একটা অলিখিত নিয়মই যেন সবাই মেনে চলছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, নিজের শক্তিকে উপরে তুলে ধরতে কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে।



জাপানের নৌশক্তির নানাবিধ ব্যবহার

জাপানের নৌবাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আগ্রাসী কোন কর্মকান্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখার পরেও পৃথিবীর সবচাইতে বড় নৌবাহিনীগুলির একটি। এর সদস্যসংখ্যা প্রায় ৫১ হাজার; রয়েছে ১৫০টির মতো জাহাজ এবং ৩৫০টির মতো বিমান। জাপানের কোস্ট গার্ডও খুবই সমৃদ্ধ। ১২ হাজার সদস্যের এই বাহিনী আকারে আরেকটি নৌবাহিনীর মতো। পূর্ব চীন সাগরে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় কোস্ট গার্ডের গুরুত্ব বেড়ে গিয়েছে আরও বেশি। কোস্ট গার্ড সেদেশের নেতৃত্বকে আরও একটি অপশন দেয়। যেখানে নৌবাহিনী পাঠানোটা কূটনৈতিক দিক থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে কোস্ট গার্ডের জাহাজ পাঠানোকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ মনে হতে পারে। সাদা রঙের জাহাজের বিরুদ্ধে সাদাই মোতায়েন করতে হবে – এরমকম একটা অলিখিত নিয়মই যেন সবাই মেনে চলছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, নিজের শক্তিকে উপরে তুলে ধরতে কোস্ট গার্ডের জাহাজগুলি ক্রমেই বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে। জাপানের কোস্ট গার্ডের সবচাইতে বড় জাহাজ হলো শিকিশিমা-ক্লাসের দু’টি জাহাজ, যেগুলি একেকটি ৯,৩০০ টনের এবং ১৫০ মিটার পর্যন্ত লম্বা। এগুলির গতি ২৫ নটিক্যাল মাইল এবং রেঞ্জ ২০ হাজার নটিক্যাল মাইল। অস্ত্র হিসেবে আপাতত ৩৫মিঃমিঃ-এর দু’টি কামান এবং ২০মিঃমিঃ দু’টি কামান খুব বেশি কিছু নয়। তবে এটা বলাই যায় যে দরকারের সময়ে এই জাহাজে আরও অস্ত্র বহণ করা হবে, কারণ জাহাজগুলি বড় আকারের ডেস্ট্রয়ারের আকৃতির! দুই-দুইটি সুপার পুমা হেলিকপ্টার বহণ করে এই জাহাজগুলি। এই জাহাজ ছাড়াও জাপানের কোস্ট গার্ডে আরও অনেক জাহাজ রয়েছে। নৌবাহিনী থেকে ডিকমিশন করে হাটসুয়ুকি-ক্লাসের (৪,০০০ টন) চারটি ডেস্ট্রয়ার আনা হয়েছে কোস্ট গার্ডে। ঠিক যেমনটি করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। ইতালির নৌবাহিনী থেকে ডিকমিশন করে ৪টা মিনার্ভা-ক্লাসের কর্ভেট যেমন মিসাইল সরিয়ে ওপিভি-তে রূপান্তর করা হয়েছে বাংলাদেশের জন্যে। ১,০০০ টন থেকে ৩,৫০০ টনের বেশকিছু জাহাজ রয়েছে তাদের। ১৩০ টন থেকে ৫০০ টনের প্যাট্রোল ভেসেলও রয়েছে অনেকগুলি। এছাড়াও রয়েছে ১৫ মিটার থেকে ৩৫ মিটারের অনেক প্যাট্রোল বোট। ট্রেনিং, ফায়ার-ফাইটিং, সার্ভে, লাইট-হাউস টেন্ডার, ইত্যাদি জাহাজও রয়েছে বেশকিছু। মোটকথা এ আরেক নৌবাহিনী।
গত নভেম্বরে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নজিব রাজাকের টোকিও ভ্রমণের সময় শিনজো আবে মালয়েশিয়াকে জাপানের কোস্ট গার্ড থেকে দু’টি প্যাট্রোল বোট দেবার ঘোষণা দেন। ‘ওযিকা-ক্লাস’এর একটি জাহাজ গত জানুয়ারীতে মালয়েশিয়াতে এসে পৌঁছেছে। গত অক্টোবরে মালয়েশিয়া প্রথমবারের মতো চীন থেকে ৪টি যুদ্ধজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়, যেখানে মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রায় সকল জিনিসই পশ্চিমা ডিজাইনের। এই ঘটনাতেও নজিব রাজাকের চীনের দিকে ঝোঁকার আভাস পাওয়া গেলেও তিনিও কিন্তু জাপান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেননি; ব্যালান্স করে চলেছেন। মোটকথা, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। চীনকে সকলেই বন্ধু হিসেবে পাশে চাইছে; বৈরিতা চাইছে না। আবার একইসাথে কোন একটি রাষ্ট্রের কোলের উপরেও কেউ বসে পড়তে চাইছেন না, যা কিনা রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির লক্ষণ। এক্ষেত্রে জাপানের নৌসক্ষমতা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।



জাপানের সামরিক বাণিজ্যের শুরু

২০১৬-এর অগাস্টে ফিলিপাইনের জন্যে জাপানে তৈরি করা প্রথম কোস্ট গার্ড জাহাজটি ফিলিপাইনে এসে পৌঁছায়। ৪৪ মিটার লম্বা মোট ১০টি জাহাজ জাপান বিক্রি করছে ফিলিপাইনের কাছে। এর জন্যে সহজ শর্তে ১৫৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে জাপান। এর উপরে গত সেপ্টেম্বরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সাথে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতার্তের সাক্ষাতে জাপান ফিলিপাইনকে ৯০ মিটার লম্বা দু’টি বড় জাহাজ দেবার অঙ্গীকার করে। দুতার্তে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং-এর দিকে ঝুঁকলেও জাপানের সাথে সম্পর্ক উষ্ণ রেখে চলেছেন। গত নভেম্বরে মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট নজিব রাজাকের টোকিও ভ্রমণের সময় শিনজো আবে মালয়েশিয়াকে জাপানের কোস্ট গার্ড থেকে দু’টি প্যাট্রোল বোট দেবার ঘোষণা দেন। ‘ওযিকা-ক্লাস’এর একটি জাহাজ গত জানুয়ারীতে মালয়েশিয়াতে এসে পৌঁছেছে। গত অক্টোবরে মালয়েশিয়া প্রথমবারের মতো চীন থেকে ৪টি যুদ্ধজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয়, যেখানে মালয়েশিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রায় সকল জিনিসই পশ্চিমা ডিজাইনের। এই ঘটনাতেও নজিব রাজাকের চীনের দিকে ঝোঁকার আভাস পাওয়া গেলেও তিনিও কিন্তু জাপান থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেননি; ব্যালান্স করে চলেছেন। মোটকথা, চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। চীনকে সকলেই বন্ধু হিসেবে পাশে চাইছে; বৈরিতা চাইছে না। আবার একইসাথে কোন একটি রাষ্ট্রের কোলের উপরেও কেউ বসে পড়তে চাইছেন না, যা কিনা রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির লক্ষণ। এক্ষেত্রে জাপানের নৌসক্ষমতা একটি বড় ভূমিকা রাখছে।

জাপানের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পরিবর্তন


কিছুদিন আগ পর্যন্ত জাপানকে সবাই শুধুমাত্র অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেই দেখতো; রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়। রাজনীতির কথা বলতে গেলেই সামরিক শক্তির বিষয়টি এসে যায়। শিনজো আবের সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জাপানের প্রভাবশালী মহল চাইছেন সামরিক দিক থেকে জাপানের যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভরশীলতা কমাতে। উত্তর কোরিয়ার ছুতো ধরে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ান উপদ্বীপ এবং জাপানে তার সামরিক শক্তি মোতায়েন রাখছে এবং তা দিয়ে চীনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এভাবে চীন-জাপান ব্যালান্সে থাকছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে। তবে ভারত মহাসাগরে জাপানি ম্যারিটাইম রুটগুলির নিরাপত্তায় জাপানি যুদ্ধজাহাজ নিয়মিতই যাতায়াত করছে; সেখানে ব্যালান্স করছে চীনকে। সোমালিয়ার উপকূলের কাছাকাছি জাপানের যুদ্ধজাহাজ জলদস্যুতা-বিরোধী টহল দিচ্ছে কয়েক বছর ধরে। কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাব-এল-মান্ডেব প্রণালীতে অবস্থিত জিবুতিতে জাপান ছোটখাটো একটি সামরিক ঘাঁটিও তৈরি করেছে, যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্রথম। দু’টি পি-৩ ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান ভারত মহাসাগরে টহল দেয় সেখান থেকে। জাপানের সামরিক শক্তি অনেক সাগরেই দেখা যাচ্ছে, কারণ জাপান তার প্যাসিফিস্ট সংবিধান থেকে বের হবার বার্তা দিয়েছে। জাপান তার অর্থনৈতিক কার্ডের সাথে সামরিক কার্ডটিও খেলতে চাইছে ধীরে ধীরে। চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে যে লাভ নেই, সেটা জাপানের ওয়াকিবহাল মহল বুঝতে পারছেন। মালয়েশিয়া-ফিলিপাইনকে সামরিক সহায়তা প্রদান এই নীতিরই অংশ।
ভারত মহাসাগর পাহাড়া দিতে ভারতের কাছে জাপান ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারে ১২টি ‘ইউএস-২’ উভচর ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান বিক্রি করছে। জাপান বুঝতে পারছে যে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূরাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের উপরেই নির্ভর করে থাকতে হবে। তাই নিজেদের সামরিক সক্ষমতা তৈরিতে মনোনিবেশ করেছে জাপান। এরই অংশ হিসেবে সামরিক বাণিজ্যের অবতারণা।


সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক শক্তিকে ব্যালান্স করাটা জাপানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে কাজ করেছে; কারণ এই সমুদ্রপথেই জাপানের বেশিরভাগ বাণিজ্য হয়ে থাকে। ২০১৫ সালে ভিয়েতনামকে দু’টি প্যাট্রোল বোট দেবার পরে এবছরের জানুয়ারী মাসে জাপান ৩৩৮ মিলিয়ন ডলারের সহজ শর্তের ঋণে আরও ৬টি প্যাট্রোল বোট সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত বছর জাপান শ্রীলংকাকেও ১৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে দু’টি ৩০ মিটার লম্বা প্যাট্রোল বোট কেনার জন্যে। শুধু প্যাট্রোল বোট নয়, জাপান তার এয়ার ইন্ডেপেন্ডেন্ট প্রোপালশন (এআইপি) প্রযুক্তির সাবমেরিন অস্ট্রেলিয়ার কাছে অফার করেছিল (যদিও অস্ট্রেলিয়া ফ্রেঞ্চ সাবমেরিনের দিকে গিয়েছে)। ভারত মহাসাগর পাহাড়া দিতে ভারতের কাছে জাপান ১.৩৫ বিলিয়ন ডলারে ১২টি ‘ইউএস-২’ উভচর ম্যারিটাইম প্যাট্রোল বিমান বিক্রি করছে।

বাংলাদেশে জাপান

জাপান বাংলাদেশের স্বীকৃত উন্নয়ন সহযোগী। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জাপানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মার্কিনীদের “বাস্কেট কেইস”-তকমা মুছে ফেলে বাংলাদেশ যখন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হোলি আর্টিসানের ঘটনাটি ঘটলো – জাপানিদের টার্গেট করে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশ থেকে জাপানকে সরানো। কিছুদিনের জন্যে তারা সেক্ষেত্রে সফলও হয়েছিল, যখন জাপানি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রজেক্ট থেমে গিয়েছিল। তবে জাপানিরা এই ষড়যন্ত্রের মর্ম বুঝতে পেরেছে বলেই তারা বাংলাদেশের সাথে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপানের জানার কথা যে ভারত মহাসাগরে জাপানি স্বার্থকে রক্ষা করতে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশের বিকল্প নেই। একটি দুর্বল বাংলাদেশই কেবল নড়বড়ে হয়ে সকলকে বিচলিত করতে পারে। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশ তার উন্নয়নের পথে জাপানকে সাথে চাইবে। জাপানের রাজনৈতিক নীতির পরিবর্তন এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে সহযোগিতার আরেকটি দুয়ার উন্মোচন করবে। এশিয়ার অনান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও জাপানের নৌশক্তি তৈরির অভিজ্ঞতা থেকে সুবিধা নিতে পারে। জাপান তার বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এশিয়ার দেশগুলির ম্যারিটাইম সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জাপান থেকে ২৪টি ছোট বোট সংগ্রহের পথে রয়েছে। তবে এই সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেয়া যায়। এয়ার-ডিফেন্স রাডার, মিসাইল-সহ জাপানের বেশকিছু সামরিক প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের উপরে নির্ভরশীল, যেগুলি হয়তো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তবে কোস্ট গার্ডের জন্যে বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাটফর্ম জাপান সরবরাহ করলে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির উপরে নির্ভরশীল হবার সম্ভাবনা অনেকটাই কম।

বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে জাকার্তায় আইওআরএ শীর্ষ বৈঠক, ঢাকায় ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের কনফারেন্স, কসোভোকে স্বীকৃতি, চীনা প্রেসিডেন্ট এবং জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, ইত্যাদি কর্মকান্ডের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে যে বঙ্গোপসাগরে একটি নতুন শক্তির আবির্ভাব হতে চলেছে। আর দেশের অভ্যন্তরে সকল ধরনের Subversion নস্যাৎ করে দিয়ে বাংলাদেশ জানান দিয়েছে যে এই রাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে নতি স্বীকার করবে না। আর একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বিশ্বে অনেক বন্ধু পাবে; সেটাই স্বাভাবিক। শক্তিশালীদের জন্যে অনেক বন্ধু থাকে; দুর্বলের জন্যে থাকে প্রভু। বাংলাদেশ এখন নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে দুনিয়ার যেকারুর সাথেই বন্ধুত্ব করতে সক্ষম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফরের মাধ্যমে এটাই পরিষ্কার হয়েছে। বাংলাদেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী চীনও এই বার্তাটাই পাবে। সাথেসাথে জাপানের কাছেও বার্তা যাবে যে বাংলাদেশের দুয়ার যে কারুর জন্যেই উন্মুক্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকে।

Friday, 7 April 2017

বাংলাদেশের পূর্ব ইউরোপে প্রবেশ!

০৮ এপ্রিল ২০১৭
বাংলাদেশ কেন প্রায় ৯ বছর পর তার নীতিতে পরিবর্তন আনলো, যখন কসোভো অন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী হস্তক্ষপের একটি উদাহরণ? যখন বাংলাদেশ জানে যে রাশিয়া, চীন এবং ভারত এই দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়নি, তখন কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ কি এই দেশগুলির সাথে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলেনি?

২০১৭ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে সরাসরি প্রবেশ করে। এই স্বীকৃতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে কসোভোর সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে দেখতে হবে।

কসোভোর স্বীকৃতির ইতিহাস
কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করে ২০০৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী। পরের দিন ১৮ই ফেব্রুয়ারী যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, তুরস্ক, আলবেনিয়া-সহ ৮টি দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়। ২০০৮ সালের মাঝে মোট ৫৩টি দেশ স্বীকৃতি দেয়, যার মাঝে ৩১টি ইউরোপিয়ান দেশ ছাড়াও ছিল যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা ও তুরস্ক। এর বাইরে সকল দেশই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারগুলির মাঝে থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের মাঝ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং পূর্ব এশিয়া থেকে মালয়েশিয়া স্বীকৃতি দেয়। ২০০৯ সালে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয় আরও ১১টি দেশ, যার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ছিল সৌদি আরব, বাহরাইন এবং জর্দান। ২০১০ সালে আরও ৮টি দেশ স্বীকৃতি দিলেও এর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কোন দেশ ছিল না। ২০১১ সালে স্বীকৃতি দেয়া ১২টি দেশের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাতার, ওমান এবং কুয়েত। ততদিনে কসোভোর স্বাধীনতা ঘোষণার প্রায় তিনটি বছর পেরিয়ে গেছে। এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, এই দেশগুলি এতো সময় নিয়ে স্বীকৃতি দিলেও এরা সকলেই কিন্তু মার্কিন সরকারের প্রভাব বলয়ে থাকা দেশ। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রই চেয়েছিল যে স্বীকৃতিগুলি আস্তে আস্তে আসুক। তবে যতোই দিন যাচ্ছিল, মার্কিন প্রভাব বলয়ের একেবারে বাইরের দিকে থাকা দেশগুলি এগুচ্ছিল স্বীকৃতি নিয়ে। তারা এগুচ্ছিল কূটনৈতিক সুযোগের সদ্যবহার করার জন্যে। এর কেউ কেউ শুধু মার্কিন না, অন্য দেশ দ্বারাও প্রভাবিত ছিল। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের শেষে আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় পাকিস্তান। সেবছরে মোট ১১টি দেশ স্বীকৃতি দেয়। স্বীকৃতি দেয়া মোট দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫। ২০১৩ সালে স্বীকৃতি দেয়া ৮টি দেশের মাঝে ছিল মিশর ও থাইল্যান্ড। ২০১৪ সালে স্বীকৃতি দেয়া ৪টি দেশের মাঝে একটিও গুরুত্বপূর্ণ দেশ ছিল না। ২০১৫ সালে একটি মাত্র দেশ এবং ২০১৬ সালে মাত্র দুইটি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে, যার মাঝে সিঙ্গাপুর কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর ছিল জাতিসংঘের ১১০তম সদস্য দেশ; বাংলাদেশ ১১১তম। এর বাইরে চারটি দেশ এমন কিছু নেতৃত্বের কাছ থেকে আসে, যাদের নিজেদের স্বীকৃতি নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, যেমন তাইওয়ান। এগুলি যোগ করলে বাংলাদেশ ১১৫তম দেশ হিসেবে কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ সময় নিয়েছে প্রায় ৯ বছর!


 
ফেব্রুয়ারী মাসে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়া এবং মার্চ-এপ্রিলে আইপিইউ সন্মেলনে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার মাধ্যমে সেটাকে ব্যালান্স করে বাংলাদেশ জানান দিলো যে রাশিয়া-চীন-ভারত কারুরই প্রভাব বলয়ে নেই এই রাষ্ট্র। বরং রাশিয়া-চীন-ভারতের মতো বিরাট দেশগুলিকেও ব্যালান্সে ধরে রাখার সক্ষমতা এই রাষ্ট্রের রয়েছে। রাশিয়া-চীন-ভারতকে ব্যালান্সে রেখেই বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে প্রবেশ করলো। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বাংলাদেশের এই ‘কসোভো কার্ড’ একটি নতুন মাথাব্যাথার কারণ হবে।

বাংলাদেশ কেন ৯ বছর অপেক্ষা করে কসোভোকে স্বীকৃতি দিলো?
প্রায় চার বছর ধরে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশ এব্যাপারে ‘নিয়ম’ ভঙ্গ করেছে। নতুন করে স্বীকৃতি দেয়ার ইস্যুটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে দেখতে হবে যে, কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে এরকম কচ্ছপের গতি কেন সকলের? উত্তর রয়েছে কসোভোর জন্মকে কে কিভাবে দেখছে, সেটার উপরে। রাশিয়া, চীন, ভারত,ইরান-সহ বেশকিছু দেশ কসোভোকে পশ্চিমা দেশগুলির অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের উদাহরণ হিসেবে দেখে। যেসব দেশে বিচ্ছন্নতাবাদী সমস্যা রয়েছে, সেসব দেশ কসোভোকে একটি বাজে উদাহরণ হিসেবে দেখে। একইসাথে রাশিয়ার প্রভাব বলয়ে থাকা বেশকিছু দেশ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র অনেক রাষ্ট্রের উপরেই স্বীকৃতি দেবার জন্যে চাপ সৃষ্টি করেছিল। এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, বাংলাদেশ কেন প্রায় ৯ বছর পর তার নীতিতে পরিবর্তন আনলো, যখন কসোভো অন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী হস্তক্ষপের একটি উদাহরণ? যখন বাংলাদেশ জানে যে রাশিয়া, চীন এবং ভারত এই দেশটিকে স্বীকৃতি দেয়নি, তখন কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ কি এই দেশগুলির সাথে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলেনি?

প্রথমতঃ মার্কিন প্রভাব বলয়ে থাকা দেশ/সরকারগুলি প্রথম চার-পাঁচ বছরের মাঝেই কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়েছে বা দিতে বাধ্য হয়েছে। ৯ বছর অপেক্ষা করার ফলে বাংলাদেশের মার্কিন প্রভাব বলয়ে থাকার ব্যাপারটি একেবারেই নাকচ হয়ে গিয়েছে। বরং সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কঠিন অবস্থান দেখিয়ে দেয় যে মার্কিন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে এই স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।

দ্বিতীয়তঃ কসোভোকে অন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী হস্তক্ষপের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখে রাশিয়া-চীন-ভারত। স্বীকৃতি দেয়ার মাত্র এক মাসের মাঝেই ঢাকায় ১৩৬তম ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, এবং সেখানে এক দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাশ হয়। এই প্রস্তাবে বাংলাদেশের সাথে ছিল রাশিয়া, চীন এবং ভারত। অর্থাৎ কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়ার পরেও এই তিন দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অটুট রয়েছেই নয়, বরং আরও শক্ত হয়েছে।

তৃতীয়তঃ ফেব্রুয়ারী মাসে কসোভোকে স্বীকৃতি দেয়া এবং মার্চ-এপ্রিলে আইপিইউ সন্মেলনে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার মাধ্যমে সেটাকে ব্যালান্স করে বাংলাদেশ জানান দিলো যে রাশিয়া-চীন-ভারত কারুরই প্রভাব বলয়ে নেই এই রাষ্ট্র। বরং রাশিয়া-চীন-ভারতের মতো বিরাট দেশগুলিকেও ব্যালান্সে ধরে রাখার সক্ষমতা এই রাষ্ট্রের রয়েছে। রাশিয়া-চীন-ভারতকে ব্যালান্সে রেখেই বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের রাজনীতিতে প্রবেশ করলো। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে বাংলাদেশের এই ‘কসোভো কার্ড’ একটি নতুন মাথাব্যাথার কারণ হবে।

এখন দেখতে হবে যে, ২০১৭ সালে ‘কসোভো কার্ড’ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো কেন?

সিআইএ-এর হিসেবে কসোভোর জনসংখ্যা ১৮ লক্ষের মতো। তবে কেউ কেউ ১৯ থেকে ২২ লক্ষের মতো বলছেন। এর মাঝে বিভিন্ন মতভেদে ৮৮% থেকে ৯৫% মুসলিম; যাদের আবার বেশিরভাগই জাতিগতভাবে আলবেনিয়ান। আর ৪% থেকে ৮% সার্ব। সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গৃহযুদ্ধের মাঝেই ১৯৯৬ সাল নাগাদ কসোভোর প্রতিবেশী দেশ আলবেনিয়ার সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলি কসোভোকে স্বাধীন করার চেষ্টা শুরু করে দেয়। এই প্রচেষ্টায় বাইরের ইন্ধন ছিল বলে সার্বিয়ানরা এবং রাশিয়ানরা অভিযোগ করে। এর মাঝে সার্বরা কসোভারদের উপরে নির্যাতন শুরু করলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে যায়। এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাকি বিশ্বের সমর্থন না পেয়ে জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে ন্যাটোকে সাথে নিয়ে ১৯৯৯ সালে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। মার্কিন সরকার সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট মিলোসেভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করে, যখন রাশিয়া-চীন এর বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নেয়। রাশিয়া-চীন এক্ষেত্রে মানবাধিকারের নামে অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করছিলো। যুদ্ধের ফলে প্রায় ১০ লক্ষ মুসলিম কসোভো ছেড়ে যায়; মৃত্যু হয় কমপক্ষে ১১ হাজার মানুষের, যাদের বেশিরভাগই ছিল মুসলিম। যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সার্বিয়ান সৈন্যদের কসোভো ছেড়ে যেতে বাধ্য করে এবং এর স্থলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী মোতায়েন করে। মার্কিন হস্তক্ষেপে প্রায় দুই লক্ষের মতো সার্ব কসোভো ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। কসোভোকে ‘রক্ষা করা’র লক্ষ্যে পশ্চিমা বাহিনী কসোভোতে ৫০ হাজার সৈন্য পাঠায়। তবে পশ্চিমাদের ব্যালান্স করতে ‘কসোভো ফোর্স’ নামের এই বাহিনীতে রাশিয়াও ৪ হাজার সৈন্য পাঠায়। ভারত কসোভোকে স্বীকৃতি না দিলেও সেসময় ৮০০ সৈন্য পাঠায় কসোভোতে।

কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাসিম থাচি ২০১৭ সালে এসে কসোভোর সেনাবাহিনী গড়ার পেছনে জোর দেয়া শুরু করেন। ১০ই মার্চ তিনি বলেন যে তিনি এমন দেশের রাষ্ট্রপতি থাকতে চাননা, যেদেশের পার্লামেন্ট নিজ দেশের কোন সামরিক বাহিনী থাকুক, সেটা চায় না। এখানেই হয়ে যায় বিপত্তি। ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্র এর কঠোর বিরোধিতা করে; সার্বরাও বিরোধিতা করে। এদের কেউই চাচ্ছে না যে কসোভোর সেনাবাহিনী তৈরি হোক। অর্থাৎ মার্কিনীরা, ইউরোপিয়ানরা এবং সার্বরা সকলেই এক্ষেত্রে এক পক্ষে!

কসোভোর পার্লামেন্ট কসোভোর সেনাবাহিনী রাখার বিরোধী?

কসোভোর নিরাপত্তার ভার বেশ কিছুটা কসোভো পুলিশ এবং ‘কসোভো সিকিউরিটি ফোর্স’-এর (কেএসএফ) হাতে দিলেও ২০১৬ সালেও সেখানে ৪,৬০০ বিদেশী সৈন্য মোতায়েন ছিল। ৯ হাজার পুলিশের সাথে রয়েছে কেএসএফ-এর প্রায় সাড়ে চার হাজার সদস্য, যাদেরকে কসোভো সরকার চাইছে সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত করতে। তবে এখানে বাধা হলো পশ্চিমাদের তৈরি করে দেয়া সংবিধান। সংবিধান অনুযায়ী সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে আলাদাভাবে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট না পেলে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। আর সংবিধান সংশোধন না করতে পারলে কসোভোর সেনাবাহিনীও তৈরি করা সম্ভব নয়। ১০০ জন এমপি রয়েছেন আলবেনিয়ান মুসলিম, যাদের বেশিরভাগই হয়তো সেনাবাহিনীর পক্ষে ভোট দেবেন। কিন্তু ২০ জন সংখ্যালঘু এমপির মাঝে ১০ জন রয়েছেন সার্ব, যারা কসোভোর যেকোন সামরিক বাহিনীর পুরোপুরি বিরোধী। সার্বরা চায় কসোভোর নিরাপত্তা সার্বিয়ার হাতে থাকুক, নাহলে কসোভোতে সার্বদের স্বার্থ রক্ষা হবে না। ২০ জনের মাঝে এই ১০ জন কখনোই কসোভোর সেনাবাহিনীর পক্ষে ভোট দেবেন না, অর্থাৎ কসোভোর সেনাবাহিনীর থাকার সম্ভাবনা কখনোই থাকছে না। আর এর অর্থ হলো, কসোভোররা সর্বদাই তাদের নিরাপত্তার জন্যে পশ্চিমাদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কসোভোর প্রেসিডেন্ট হাসিম থাচি ২০১৭ সালে এসে কসোভোর সেনাবাহিনী গড়ার পেছনে জোর দেয়া শুরু করেন। ১০ই মার্চ তিনি বলেন যে তিনি এমন দেশের রাষ্ট্রপতি থাকতে চাননা, যেদেশের পার্লামেন্ট নিজ দেশের কোন সামরিক বাহিনী থাকুক, সেটা চায় না। এখানেই হয়ে যায় বিপত্তি। ন্যাটো এবং যুক্তরাষ্ট্র এর কঠোর বিরোধিতা করে; সার্বরাও বিরোধিতা করে। এদের কেউই চাচ্ছে না যে কসোভোর সেনাবাহিনী তৈরি হোক। অর্থাৎ মার্কিনীরা, ইউরোপিয়ানরা এবং সার্বরা সকলেই এক্ষেত্রে এক পক্ষে!

কসোভোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থান

কসোভোর সেনাবাহিনীর রাজনীতিকে বুঝতে হলে কসোভোর ভূকৌশলগত অবস্থান বুঝতে হবে। কসোভোর ভূকৌশলগত অবস্থান পূর্ব ইউরোপে বলকানের নিয়ন্ত্রকের অবস্থানে। ১০ হাজার ৯০০ বর্গ কিঃমিঃ আয়তনের ছোট্ট কসোভো (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের প্রায় সমান) পুরোপুরি স্থলবেষ্টিত। তবে আলবেনিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে আলবেনিয়ার মাধ্যমে কসোভো সমুদ্রের দেখা পায়। এই ছোট্ট দেশটি ইউরোপের সবচাইতে গরীব দেশ। দেশটির অর্থনীতির আকার মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার। সাড়ে তিন’শো মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করলেও আমদানি করে প্রায় ২,৭০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ দেশটি বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে পুরোপুরি নির্ভরশীল। সবচাইতে বেশি রপ্তানি হয় ইতালি, আলবেনিয়া, মেসিডোনিয়াতে এবং আমদানি হয় জার্মানি, মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া, তুরস্ক, ইতালি, আলবেনিয়া থেকে। গরীব হলেও দেশটি খণিজ সম্পদে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। জাতিসংঘের মতে দেশটিতে মজুদ খণিজ সম্পদের মূল্য সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ইউরোর বেশি। খণিজের মাঝে রয়েছে প্রায় ১৫ বিলিয়ন টন লিগনাইট কয়লা (পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম মজুদ)। কসোভোর ৯৭% বিদ্যুৎ তৈরি হয় এই কয়লা থেকে। এছাড়াও রয়েছে সীসা-জিঙ্ক-সিলভারের খণি। রয়েছে নিকেল এবং ক্রোমিয়ামের খণি। বক্সাইট এবং ম্যাগনেসিয়ামের খণিও রয়েছে এখানে। এসব খণিজ পদার্থ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরির জন্য যথেষ্ট। এর বাইরেও রয়েছে গ্রানাইট, চুনাপাথর, মার্বেল, ইত্যাদি বিভিন্ন কন্সট্রাকশন মিনারেলের খণি। এসব খণির নিয়ন্ত্রণ কার কাছে থাকবে, সেই প্রশ্ন এখন সবার কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
 
সার্বরা পালন করছে ১৩৮৯ সালের কসোভোর যুদ্ধের ৬২০তম বার্ষিকী। ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কাছে কসোভোর গুরুত্ব অনেক। ১৩৮৯ সালের যুদ্ধে সার্বরা হেরেছিল উসমানি সুলতান মুরাদের কাছে, তারপরেও সার্বরা মনে রাখতে চায় সেই যুদ্ধের ফলাফলের কথা। ঐ সময় থেকেই বলকানে ইসলামের আবির্ভাব হয় এবং সেখানকার ইতিহাস পালটে যায় সারাজীবনের জন্যে। বর্তমানে পূর্ব ইউরোপে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধির মাঝে ইউরোপিয়ানরা ইউরোপে ৫০০ বছরের উসমানিয়া খিলাফতের ছায়াকে দেখতে পাচ্ছে।

কসোভোর ঐতিহাসিক বাস্তবতা

এই অঞ্চলের ইতিহাস ভূরাজনৈতিক হিসেবের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলকান অঞ্চল পঞ্চদশ শতক থেকে শুরু করে বিংশ শতকের গোড়া অবধি ৫০০ বছরের মধ্যে বেশিরভাগ সময়ই তুর্কি উসমানিয়া খিলাফতের অধীনে ছিল। বলকানে ইসলামের আবির্ভাব হয় এসময়েই। বলকানের খ্রিস্টানরা হচ্ছে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টান, যা পশ্চিম ইউরোপের ক্যাথোলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টানদের থেকে আলাদা। মুসলিমদের সাথে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের সমস্যা হজরত মুহম্মদ (সঃ)-এর সময় থেকে, যখন ইস্তাম্বুল (তখনকার নাম কনস্টানটিনোপোল) ছিল ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের (বাইজ্যানটাইন এম্পায়ার) রাজধানী। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইস্তাম্বুল মুসলিমদের হাতে চলে গেলে ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় রাশিয়া, তথা মস্কো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝ দিয়ে তুর্কি খিলাফতের পতনের সাথে সাথে বলকানের কর্তৃত্ব নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। জার্মান এবং ইটালিয়ানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত সেখানে প্রভাবশালী ছিল। ব্রিটিশ এবং ফরাসীদের প্রভাবও ছিল। বিশ্বযুদ্ধের পর এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকেই পশ্চিমাদের ইন্ধনে এই এলাকায় সমস্যার শুরু। রাশিয়া বলকানে পশ্চিমাদের প্রভাবকে নিজের স্বার্থবিরুদ্ধ দেখতে শুরু করে বলেই বলকানের সমস্যার দুই প্রান্তে অবস্থান করে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রস্থানের সাথে সাথে এখানকার ভূরাজনীতি অন্যদিকে মোড় নিচ্ছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একমত যে বর্তমানে পূর্ব ইউরোপের বলকানে তুরস্কের প্রভাব প্রতিদিনই বাড়ছে। ইউরোপিয়ানরা তুরস্কের মাঝে সেই তুর্কি খিলাফতের ছায়া দেখতে পাচ্ছে, যা তাদেরকে ভীতিতে ফেলছে।

ঠিক এই সময়েই কসোভোকে স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশ। যখন যুক্তরাষ্ট্র কসোভোকে স্বীকৃতি দেবার জন্যে বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল, তখন বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত নেয়নি। এখন সেই স্বীকৃতিই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র এই স্বীকৃতিকে তার স্বার্থবিরুদ্ধ মনে করলেও তুরস্ক এই স্বীকৃতির বিরুদ্ধে না-ও থাকতে পারে। এই স্বীকৃতির মাঝ দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বরাজনীতিতে একটি নতুন উপাখ্যান খুললো, কিছুদিন আগেও যার অস্তিত্বই ছিল না। বাংলাদেশের হাতে এর মাধ্যমে ‘কসোভো কার্ড’ এলো, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপের উল্টোদিকে পারফেক্ট ব্যালান্সে রয়েছে রাশিয়া-চীন-ভারত। এতো বিশাল ওজনের দুই পক্ষ দুই পাশে থাকলেও ব্যালান্সে এতটুকু চাপও অনুভূত হয়নি! এতো শক্তিশালী অবস্থানকে বুঝতে পারাটা অতটা সহজ নয়, কারণ বেশিরভাগ লোকই বাংলাদেশের দৃশ্যমান আকৃতি নিয়েই ব্যস্ত থাকবে।