Friday, 30 December 2016

২০১৭ সাল হতে যাচ্ছে নিয়ম ভাঙ্গার বছর

৩১শে ডিসেম্বর ২০১৬
এম ভি সি-চ্যাম্পিয়ন নামের রঙচঙ্গা এই জাহাজটি মার্কিন নৌবাহিনীর Military Sealift Command (MSC) নামের সংস্থার অধীন একটি জাহাজ, যার কাজ হচ্ছে সাবমেরিন এবং স্পেশাল ওয়ারফেয়ার-এ সহায়তা প্রদান। জাহাজটা দেখলে কেউ চিন্তা করবে না যে এটি সামরিক জাহাজ। এই সংস্থার জাহাজগুলি মূলতঃ বেসামরিক নাবিকেরা চালায়, যদিও মিশন পুরোপুরি সামরিক।

যুক্তরাষ্ট্রের Military Sealift Command (MSC) নামের যে সংস্থাটি আছে, তার কাজ হলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর জন্যে বিশ্বব্যাপী পরিবহণের কাজ করা এবং আরও অনান্য সাপোর্ট দেয়া। এক’শ-এরও বেশি জাহাজ রয়েছে এই সংস্থার। এই জাহাজগুলির মাঝে রয়েছে সাপ্লাই জাহাজ, ওশানোগ্রাফিক সার্ভে জাহাজ, টাগবোট, স্যালভেজ ভেসেল, সাবমেরিন টেন্ডার, মিসাইল ট্র্যাকিং জাহাজ, উভচর অভিযানের জাহাজ, কেবল লেইং জাহাজ, স্পেশাল ওয়ারফেয়ার জাহাজ, পরিবহণ জাহাজ, ইত্যাদি। তবে এই সংস্থার সবচাইতে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, এর জাহাজগুলির চালনা করার জন্যে প্রায় ১০ হাজার লোকের যে জনবল রয়েছে, তার প্রায় ৮৮% হলো বেসামরিক। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের বহরে খাবার, অস্ত্র এবং গোলাবারুদ এবং ডেস্ট্রয়ার-ফ্রিগেট ইত্যাদি জাহাজগুলিতে জ্বালানি সরবরাহ করে এই জাহাজগুলি। তাদের সাবমেরিন ফ্লিটের চলাচলের সুবিধার জন্যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্র তলদেশের ম্যাপিং করে এই সংস্থার সার্ভে জাহাজগুলি। রঙচঙ্গা কিছু ভাড়া করা জাহাজ রয়েছে এই সংস্থার যেগুলি মার্কিন স্পেশাল ফোর্স ব্যবহার করে বিভিন্ন গোপন মিশনে; বোঝার উপায় নেই যে সেগুলি সামরিক জাহাজ! তবে এই সংস্থার বড় একটি অংশ হলো পরিবহণ জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্র যখন কোন দেশে যুদ্ধ করতে যায়, তখন সেখানে শুধু সৈন্যরা কিছু হাল্কা অস্ত্রসহ বিমানে গিয়ে অবতরণ করে। এরপর সেই দেশের যদি সমুদ্র বন্দর থাকে, সেখানে বাকি সকল ভারি অস্ত্র এবং গোলাবারুদ খুব দ্রুত পৌঁছে দেয় এই সংস্থার পরিবহণ জাহাজগুলি। এসব জাহাজে আর্টিলারি শেল, বিমান থেকে ফেলা বোমা, মিসাইল, এবং অনান্য গোলাবারুদসহ জ্বালানি, ট্যাঙ্ক, এপিসি, আর্টিলারি, গাড়ি, ট্রাক, ইত্যাদি সবসময় ভরে রাখা হয়। জাহাজগুলি পৃথিবীর বিভিন্ন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নোঙ্গর করে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত মহাসাগরে দিয়েগো গার্সিয়া নামের একটি ব্রিটিশ দ্বীপ রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এখানে ২০টি জাহাজ সবসময় নোঙ্গর করে রাখা হয়। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই জাহাজগুলি কোন সমুদ্রবন্দরে গিয়ে তাদের কার্গো নামিয়ে দেবে। এতে ভারত মহাসাগরীয় যেকোন দেশে খুব অল্প সময়ের মাঝেই তারা অপারেশনে যেতে সক্ষম। বুঝতে অপেক্ষা রাখে না যে মিশনগুলি পুরোপুরিভাবে সামরিক।
হুইলার নামের এই জাহাজটি নৌবাহিনীর জাহাজ, কিন্তু চালনা করে বেসামরিক লোকেরা। জাহাজটির কাজ হলো স্থলভাগ থেকে চার মেইল দূর থেকে পাইপের মাধ্যমে তেল সরবরাহ। বিশ্বের কোন স্থানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি করা হলে সেখানে যদি ভালো সমুদ্রবন্দর না থাকে, তাহলে এই জাহজের মাধ্যমে তেল সমুদ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাঙ্কার থেকে স্থলভাগে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সামরিক মিশনে বেসামরিক লোকদের ব্যবহার তারা করতে পারে, কারণ কোনটা সকল সংজ্ঞা তাদের তৈরি। তারা অন্যদের জন্যে সংজ্ঞা তৈরি করে, যা তারা নিজেরা মানতে বাধ্য নন।
 
তাহলে প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশ এরকম সামরিক মিশনে বেসামরিক লোকদের ব্যবহার করছে কেন? এর উত্তর পাওয়া যাবে সেই সংজ্ঞায় যে সংজ্ঞাটি আসলে শুধু অন্যদের জন্যে, তাদের জন্যে নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো আদর্শিক শক্তির দেশগুলি অন্যদের জন্যে সংজ্ঞা তৈরি করে বিশ্বে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে। বাকি বিশ্বের মানুষ ঐ সংজ্ঞার মাঝেই নিজেদের চিন্তাকে ধরে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের নৌবাহিনীতে জাহাজের যে ক্যাটাগরি ব্যবহার করা হয়, তা আটলান্টিকের ওপাড় থেকে সংজ্ঞায়িত হয়ে আসা। ডেস্ট্রয়ার-ফ্রিগেট-করভেট-ওপিভি ইত্যাদি জাহাজের সংজ্ঞা কোন দেশের নৌবাহিনীই বানাতে সক্ষম হয় না। অর্থাৎ এই সংজ্ঞায়িত করা কয়েকটি ক্যাটাগরির বাইরে কোন জাহাজ তৈরি করে না কেউ। যদি কেউ করে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের কেউ করে। অন্ততঃ এটাই হয়ে আসছিলো এতোকাল।
ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়াতে নোঙ্গর করে আছে পরিবহণ জাহাজ, যার পেটের মাঝে রয়েছে বিপুল পরিমাণ রসদ। নির্দেশ পেলেই এশিয়ার যেকোন উপকূলের দিকে রওয়ানা হবে এই জাহাজগুলি। সামরিক পণ্যবাহী এই জাহাজগুলি বেসামরিক লোকেরা চালায়। সারা দুনিয়ার জন্যে সামরিক-বেসামরিক নিয়ম তৈরি করলেও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বেলায় সেই নিয়ম মানে না।



ব্ল্যাক পাউডার নামের এই জাহাজটিও সামরিক জাহাজ; স্পেশাল ওয়ারফেয়ারে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেরা এতকাল নিয়ম তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কেউ কেউ তাদের তৈরি করা এসব নিয়ম ভঙ্গ করছে। গত ২৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র তার নিয়মের বাইরে যেতে দেখেনি কাউকেও। গত কয়েক বছর ধরে এর ব্যতিক্রম হচ্ছে। ২০১৬-তে অনেক নিয়ম ভঙ্গ করা হয়েছে। আর ২০১৭ হতে যাচ্ছে নিয়ম ভাঙ্গারই বছর!

  যে সমস্যায় যুক্তরাষ্ট্র আজ পড়েছে তা হলো তাদের সংজ্ঞার বাইরেও কেউ কেউ জাহাজ বানাচ্ছে। তাদের সংজ্ঞার ক্যাটাগরির মাঝে যে ব্যবধানগুলি রাখা হতো এতোকাল, সেই ব্যবধান মানা হচ্ছে না কোথাও কোথাও। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এখন যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে কোন দেশের নৌবাহিনী কতটা শক্তিশালী, তাহলে সবাই হিসেব করতে লেগে যায় যে কার কতটা ডেস্ট্রয়ার, কতটা ফ্রিগেট, কতটা করভেট, ইত্যাদি রয়েছে। কিন্তু এমন যদি জাহাজ থাকে যেটা এসব ক্যাটাগরিতে পড়ে না? সেই নৌবাহিনীকে মূল্যায়ন করা হবে কি করে? এরকম উদ্ভট সমস্যা তো যুক্তরাষ্ট্রের মতো আদর্শিক শক্তির মোকাবিলা করার কথা নয়; কারণ তারা তো সংজ্ঞা তৈরি করেন; অন্যের সংজ্ঞার পাঠোদ্ধারের চেষ্টায় থাকেন না কখনও। অন্ততঃ এটা তাদের গত ২৫ বছরে করতে হয়নি। এখন সেই সংজ্ঞা পরিবর্তন হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে; পরিবর্তিত হচ্ছে ‘নিয়ম’। চেনাজানা ক্যাটাগরি সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল থাকে। সেটার উপরে ভিত্তি করে শত্রুকে মোকাবিলার একটা পরিকল্পনাও থাকে। কিন্তু ক্যাটাগরি মানা না হলে তো পুরো পরিকল্পনাই সমস্যায় পড়ে যায়! এতকালের পরিকল্পনায় কেউ পানি ঢেলে নষ্ট করে দিলে অনুভূতিটা সুখকর হবার কথা নয়।

পশ্চিমাদের তৈরি করা ‘নিয়ম’ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত। ‘নিয়ম’কে এখন নিয়মিতভাবে ‘অনিয়ম’ করা হচ্ছে। কিছুতেই যেন এগুলি ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বের উপরে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী যুক্তরাষ্ট্রের যে নিয়ন্ত্রণ একসময় ছিল, তা এখন বিরাট প্রশ্নের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়াই নিয়ম ভাঙ্গা হচ্ছে; আবির্ভাব হচ্ছে নতুন নিয়মের। গত ক’বছরে এসব ‘নিয়ম-ভাঙ্গা’ নিয়ম বেড়েই চলেছে। ২০১৬ সালে এসব অনেক দেখা গেছে। আর ২০১৭ সাল হতে যাচ্ছে নিয়ম ভাঙ্গার বছর।

Friday, 23 December 2016

একুশ শতকে মেধা কোন ফ্লাইটে উঠবে?

২৩শে ডিসেম্বর ২০১৬

 
প্রযুক্তিগত দিক থেকে দক্ষ লোকদেরকে বেশি বেশি করে দরকার হচ্ছে; বেশি করে লাগছে পাইলটবিহীন ড্রোন অপারেটর; লাগছে রাডার, সোনার, ইলেকট্রনিক্স কাউন্টারমেজার, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন টেকনোলজি অপারেট করতে পারার মতো লোক; যুদ্ধবিমান-যুদ্ধজাহাজ-ট্যাঙ্কের অভ্যন্তরের মাল্টি-ফাংশন ডিসপ্লে বুঝে উঠতে পারার মতো লোক; স্মার্ট বোমা বোঝার মতো লোক, ইত্যাদি। তবে প্রযুক্তিগত এই সকল যন্ত্রপাতি ডিজাইন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং-এ লাগছে সবচাইতে মেধাবী লোকগুলি, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলিতে জনসংখ্যা স্থবিরতার কারণে চলছে এক বিশাল শূণ্যতা। ঠিক এই স্থানটিতেই, অর্থাৎ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিতেই বাংলাদেশের মেধাবী সন্তানেরা মোটা টাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ পেয়েছেন।

কয়েক যুগ ধরে পশ্চিমের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিরাট অবদান রেখেছে বাংলাদেশসহ তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি। এদেশের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে পাশ করা মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর দলে দলে পাড়ি জমিয়েছে পশ্চিমের দেশগুলিতে। তাদের প্রযুক্তিগত গবেষণায় যেসকল স্থানে মেধাবী লোকের অভাব ছিল, সেসব স্থান পূরণ করেছে বাংলাদেশের তরুণরা। পশ্চিমের জনসংখ্যা বহুদিন ধরেই স্থবির রয়েছে। এমতাবস্থায় সেই দেশগুলির পক্ষে মেধাবী কেন, যেকোন ধরনের মানবসম্পদ তৈরি করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবসম্পদ ছাড়া বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো অবস্থানও তারা হারাতে বসেছে। রোবোট মানুষের স্থলাভিষিক্ত হলেও সে তার সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেই পরিপালন করে। কাজেই সংখ্যা এবং মানের দিক থেকে মানবসম্পদের নিম্নমুখী অবস্থানের কারণে রোবোট সৃষ্টি করার সক্ষমতাতেও ঘাটতি আসতে বাধ্য। আর যেহেতু দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো সক্ষমতা অর্জনে সামরিক সক্ষমতার কোন বিকল্প নেই, কাজেই সেক্ষেত্রে মানবসম্পদ কমানো যথেষ্ট বিপজ্জনক। কিন্তু সামরিক বাহিনীতে মানবসম্পদ কমানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিই পশ্চিমা দেশগুলি আজ করতে বাধ্য হচ্ছে; রোবোটের উপরে ঝুঁকতে হচ্ছে প্রয়োজনের চাইতে বেশি। প্রযুক্তিগত দিক থেকে দক্ষ লোকদেরকে বেশি বেশি করে দরকার হচ্ছে; বেশি করে লাগছে পাইলটবিহীন ড্রোন অপারেটর; লাগছে রাডার, সোনার, ইলেকট্রনিক্স কাউন্টারমেজার, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন টেকনোলজি অপারেট করতে পারার মতো লোক; যুদ্ধবিমান-যুদ্ধজাহাজ-ট্যাঙ্কের অভ্যন্তরের মাল্টি-ফাংশন ডিসপ্লে বুঝে উঠতে পারার মতো লোক; স্মার্ট বোমা বোঝার মতো লোক, ইত্যাদি। তবে প্রযুক্তিগত এই সকল যন্ত্রপাতি ডিজাইন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং-এ লাগছে সবচাইতে মেধাবী লোকগুলি, যেখানে জনসংখ্যা স্থবিরতার কারণে চলছে এক বিশাল শূণ্যতা। ঠিক এই স্থানটিতেই, অর্থাৎ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানটিতেই বাংলাদেশের মেধাবী সন্তানেরা মোটা টাকায় শ্রমিক হিসেবে কাজ পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের প্রযুক্তিগত এবং সামরিক সক্ষমতার মূলটিই এখানে। এখানেই ‘লাল-সবুজ’ ম্লান হয়েছে, আর পতপত করে উড়েছে ‘স্টারস এন্ড স্ট্রাইপস’ – কারুর অন্তরে ব্যাথা লাগেনি; বরং এগুলিকে ‘দেশ’এর গর্ব বলেই প্রচার করা হয়েছে। অথচ পশ্চিমে অনেকদিন আগে থেকেই মুসলিম দেশগুলির সক্ষমতা কর্তন করার জন্যে কথা বলা হচ্ছিল, যা কিনা এদেশের মানুষ জানেই না!



শুধু অর্থনীতিতে পেটের খোরাকই মিলবে, অন্য কিছু নয়। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরির স্বপ্ন কোনদিনও বাস্তবায়ন হবে না। “পাওয়ারফুল আগামীর অদম্য বাংলাদেশ” তৈরি করতে হলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। সেমিকনডাকটর, স্যাটেলাইট টেকনলজি, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক্স, পেট্রোকেমিক্যালস, মেটালার্জি, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস, ইত্যাদি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সময় এখনই। রযুক্তিগত উতকর্ষ সাধনে শুধু প্রযুক্তি কেনার ব্যবস্থা করলেই চলবে না; প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেবার মতো জনশক্তি প্রয়োজন। মেধা এক্সপোর্ট অনেক হয়েছে; এবারে উলটো ফ্লাইট ধরার সময় হয়েছে।

অর্থনৈতিক দিক দিয়ে এখন এশিয়ার যুগ চলছে। কিন্তু শুধু অর্থনীতিতে পেটের খোরাকই মিলবে, অন্য কিছু নয়। একটা শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরির স্বপ্ন কোনদিনও বাস্তবায়ন হবে না। “পাওয়ারফুল আগামীর অদম্য বাংলাদেশ” তৈরি করতে হলে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। সেমিকনডাকটর, স্যাটেলাইট টেকনলজি, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক্স, পেট্রোকেমিক্যালস, মেটালার্জি, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস, ইত্যাদি প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সময় এখনই। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিযোগীর অভাব নেই, যারা চেয়ে চেয়ে দেখবে না। প্রযুক্তিগত উতকর্ষ সাধনে শুধু প্রযুক্তি কেনার ব্যবস্থা করলেই চলবে না; প্রযুক্তিকে এগিয়ে নেবার মতো জনশক্তি প্রয়োজন। ঠিক যে কাজটি এতোদিন পশ্চিমা দেশগুলি করেছে, সেটাই এখন করতে হবে এখানে – মেধাবী লোকগুলিকে ব্যবহার করতে হবে। টাকার বিনিময়ে মেধা বিক্রির মতো সস্তা চিন্তা থেকে বের হবার সময় এখন এসেছে। অর্থের বিনিময়ে স্থবির অর্থনীতির অংশীদার হওয়া নয়, বরং একুশ শতকের বাঘের গর্জনে গলা মেলানোর সুযোগ পাওয়াটাই হওয়া উচিত স্বপ্ন। অনেক মেধাবীরা এই সুযোগ হারাবেন; আবার সেরা মেধাবী না হয়েও অনেকে সময়মতো ট্রেনে চেপে বসার কারণে গন্তব্যে পৌঁছবেন।

২০৩০ সালের বাংলাদেশের সাথে আজকের বাংলাদেশের কোন মিল থাকবে না। যারা সেই দিনটিকে দেখতে পাচ্ছেন, তাদের কাছে এই মুহুর্তের প্রযুক্তির উতকর্ষতা সাধন দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। মেধা এক্সপোর্ট অনেক হয়েছে; এবারে উলটো ফ্লাইট ধরার সময় হয়েছে। ভারত মহাসাগর অনেক বিশাল এবং গভীর; হিমালয় পর্বত বহু উঁচু; এশিয়া এবং আফ্রিকার ভূমি অকল্পনীয় বিশাল এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ – এই সকলকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। এই আহ্বান যারা শুনতে পাবেন এবং অন্তরে অনুভব করবেন, তারাই একুশ শতকের সেই বাঘ।

Monday, 5 December 2016

দেশের আকাশ নিরাপত্তা আজ কোথায়?

০৬ ডিসেম্বর ২০১৬
১৯৯১ সালের ঘুর্নিঝড়ের সময় কিছু লোক বিমান বাহিনীকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়ে সৃষ্টিকর্তার উপরে 'দোষ' চাপানোর চেষ্টায় ছিল। ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর বিমানকে নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে কিছু লোক নাট-বল্টুর উপর দিয়ে চালিয়ে নেবার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্র-বিরোধী কর্মকান্ডে দায়িত্ব এড়িয়ে বেঁচে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘুর্ণিঝড়ের কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। যারা তখন জন্মেনি বা বয়সে খুব বেশি ছোট ছিল, তারা অগ্রজদের কাছ থেকে জেনেছেন সেই দুর্যোগের দিনটির কথা। সেদিনের বহু দুর্যোগের মাঝে একটি দুর্যোগের কথা অনেকেই মনে রাখেনি, বা মনে রাখার চেষ্টা করেনি। চট্টগ্রাম বিমান বন্দরে ওই মুহুর্তে অবস্থান করছিলো বিমান বাহিনীর বিরাট সংখ্যক ফাইটার জেট। ঝড়ের পরপর বিমান বন্দর থেকে তোলা আলোকচিত্রে গোটা চল্লিশেক যুদ্ধবিমানের তালগোল পাকানো চিত্র চোখে পড়ে। কয়েক লক্ষ মানুষের মৃতদেহের মাঝে সেই ছবিগুলি গৌণ হয়ে গেলেও এটা বোঝা প্রয়োজন যে ওই মুহুর্তে রাষ্ট্র ছিল ভয়ংকরভাবে দুর্বল। শুধু দুর্যোগের কারণেই নয়, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হবার কারণেও। আর এই ধ্বংসজজ্ঞকে শুধু সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে কিছু লোক পার পাবার চেষ্টা করেছিল সেদিন। এদের বিচার হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রের যে ক্ষতি তারা সেদিন করেছিল, সেটা এই লোকগুলিকে শতবার শিরচ্ছেদ করলেও পোষাবে না! দেশের প্রতিরক্ষাকে এক সুযোগে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যেই এতগুলি বিমানকে ঘুর্ণিঝরের পূর্বাভাষের পরেও চট্টগ্রাম থেকে সরাবার কোনরূপ চেষ্টাই করা হয়নি। এটাই হলো রাষ্ট্রদ্রোহিতার উতকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা সেই ঘটনা থেকে কিছু শিখেছিলাম কিনা। এদেশের মানুষের হাত দিয়েই বিদেশী শক্তি যে এই দেশকে দুর্বল করতে পারে, সেটা আমরা কি বুঝেছিলাম কিনা। খুব যে কিছু একটা এখনো বুঝতে পারিনি, সেটার উদাহরণ কিন্তু আমরা সেদিন পেয়েই গেলাম।
  
যেদিন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফাইটার বিমানগুলি উড়বে, সেদিন ওই ভবনের কেউ যে বিমানের দিকে বা ফুয়েল ডিসপেন্সারের দিকে একটা ঢিল ছুঁড়বে না, বা সিগারেটের লাইটখানা নেভাতে ভুলে যাবে না বা পকেট থেকে ভুল করে তার কুকুরের জন্যে জমিয়ে রাখা হাড্ডি রানওয়েতে পড়ে যাবে না, সেটার গ্যারান্টি আমাদের কে দিচ্ছে? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে রাষ্ট্রের জন্যে পুরোপুরি বিশ্বস্ত লোকদের ছাড়া আর কাউকে দায়িত্ব দেয়ার কোনরূপ সুযোগ নেই – তার যতবড় পশ্চিমা ডিগ্রীই থাকুক না কেন!

নাট-বল্টু নয়, নাট-বল্টু যার হাতে ছিল তার কথা বলছি…

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিমান তুর্কমেনিস্তানে জরুরী অবতরণ করার সাথে সাথে যেসকল প্রশ্ন সামনে আসতে শুরু করেছিল, তার মাঝে প্রথমটিই ছিল – নিরাপত্তায় কোনরকম ঘাটতি ছিল কি না। প্রধানমন্ত্রীর বিমানে নিরাপত্তার সমস্যা মানে যেকোন বিমানেই এই সমস্যা হতে পারে। আর যদি মনুষ্য-সৃষ্ট কারণে নাট-বল্টু হাল্কা হয়ে গিয়ে থাকে, তার মানে হলো নিরাপত্তার ঘাটতি খুঁজতে আমাদের বিমান বন্দরের নিরাপত্তার দিকে তাকাতে হবে। কিছুদিন আগেই পশ্চিমাদের প্রবল চাপে বিমান বন্দরের নিরাপত্তা তুলে দেয়া হলো বিদেশী কোম্পানির হাতে। এখন সেই সিদ্ধান্তের পর যদি নিরাপত্তার এই অবস্থা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসবে – ওই নিরাপত্তা কাদের জন্যে ছিল? রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের নিরাপত্তা যেই নিরাপত্তা-বিষয়ক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আসে না, সেই সিদ্ধান্ত যে ভুল, তা কি এখন প্রমাণ করার কিছু বাকি থাকে? বিমান বন্দরের বিশেষ কিছু এলাকার দখল নিয়েই পশ্চিমারা ক্ষান্ত ছিল – কারণ সেটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যাথা নেই। এই দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব অন্যের হাতে দিলে আমরা ‘হোলি আর্টিসান’ ছাড়া ভালো কিছু আশা করতে পারি না।

উপরেই উল্লেখ করেছি যে এই দেশের মানুষের হাত দিয়েই দেশের বিরুদ্ধে কাজ করানো হয়ে থাকে। নাট-বল্টু হাল্কা করার একটা লোকও যদি সেই ভবনের ভেতর রয়ে যায়, এটা যে জাতীয় নিরাপত্তার জন্যে একটা ভয়াবহ হুমকি, তা আজ দিনের মতো পরিষ্কার। আর আমাদের বিমান বন্দরের সাথে একই রানওয়ে ব্যবহার করছে আমাদের বিমান বাহিনী। একটা ঢিল মারলেও একটা ফাইটার প্লেনের উপরে গিয়ে পড়বে। এটা বুঝতে কি আমাদের কোয়ান্টাম ফিজিক্স পড়ে আসতে হবে? যেদিন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফাইটার বিমানগুলি উড়বে, সেদিন ওই ভবনের কেউ যে বিমানের দিকে বা ফুয়েল ডিসপেন্সারের দিকে একটা ঢিল ছুঁড়বে না, বা সিগারেটের লাইটখানা নেভাতে ভুলে যাবে না বা পকেট থেকে ভুল করে তার কুকুরের জন্যে জমিয়ে রাখা হাড্ডি রানওয়েতে পড়ে যাবে না, সেটার গ্যারান্টি আমাদের কে দিচ্ছে? রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে রাষ্ট্রের জন্যে পুরোপুরি বিশ্বস্ত লোকদের ছাড়া আর কাউকে দায়িত্ব দেয়ার কোনরূপ সুযোগ নেই – তার যতবড় পশ্চিমা ডিগ্রীই থাকুক না কেন! এই একই রানওয়ে দিয়ে ক’দিন আগেই চীনা প্রেসিডেন্টের বিমান নেমেছিল। সেই নেতার বিমানকে এসকর্ট করেছিল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফাইটার বিমান – এ তো বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোর মতো ব্যাপার হয়ে গেলো। মোটকথা যার উদ্দেশ্য ক্ষতি করা, সে যে কোন সময়েই সেটা করতে পারে; যে কোন উপায়েই করতে পারে। এখানে শুধু উপায় ঠেকিয়ে কাজ হবে না; মানুষ ঠিক করতে হবে। আর মানুষ ঠিক করতে গেলে কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে হবে।
বিমান বাহিনীর সবচাইতে বড় ঘাঁটি ‘বিএএফ বঙ্গবন্ধু’কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনই জাতীয় পতাকা প্রদান করে আসলেন। এর মাঝে মেইনটেন্যান্স, সিকিউরিটি, রাডার অপারেটর, সাপ্লাই চেইন, ইত্যাদি সবই অন্তর্ভুক্ত। এই পুরো চেইন-এর একটা স্থানে ফাটল মানে পুরো ঘাঁটির প্রতি হুমকি। সবচাইতে বড় এই ঘাঁটি যে সম্ভাব্য রাষ্ট্রদ্রোহীদের আড্ডাখানা থেকে আড়াই ফুট দূরে, সেটা আমরা কতটুকু চিন্তা করে দেখেছি? সিভিল এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি বিদেশী এজেন্সির ‘নিরাপদ’ হাতে তুলে দিলে দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিমান তখন রাষ্ট্রদ্রোহীদের আড্ডাখানা থেকেই তো উড়বে।


রাষ্ট্রীয় কাজ কি সামরিক না বেসামরিক?

বিমান বাহিনীর সবচাইতে বড় ঘাঁটি ‘বিএএফ বঙ্গবন্ধু’কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনই জাতীয় পতাকা প্রদান করে আসলেন। এখানে ঘাঁটি বলতে বোঝানো হয়েছে ঘাঁটিকে যারা সচল রাখে সেই বিমান-সেনারা; মানে গ্রাউন্ড-ক্রু। এর মাঝে মেইনটেন্যান্স, সিকিউরিটি, রাডার অপারেটর, সাপ্লাই চেইন, ইত্যাদি সবই অন্তর্ভুক্ত। এই পুরো চেইন-এর একটা স্থানে ফাটল মানে পুরো ঘাঁটির প্রতি হুমকি। ভারতের পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে জঙ্গী হামলার কথা আমরা এখনও ভুলে যাইনি। আর আমাদের সমস্যা তো আরও ব্যাপক। সবচাইতে বড় এই ঘাঁটি যে সম্ভাব্য রাষ্ট্রদ্রোহীদের আড্ডাখানা থেকে আড়াই ফুট দূরে, সেটা আমরা কতটুকু চিন্তা করে দেখেছি? সবচাইতে বড় সিভিল এবং সবচাইতে বড় মিলিটারি এয়ারপোর্ট তো এখানে একইসাথে। এখন কেউ কি বলবেন যে সিভিল আর মিলিটারি এয়ারপোর্ট আলাদা করে ফেলার জন্যেই এই লেখার অবতারণা? তাহলে সিভিল এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি কি বিদেশী এজেন্সির ‘নিরাপদ’ হাতে তুলে দেয়া হবে? দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বিমান তখন রাষ্ট্রদ্রোহীদের আড্ডাখানা থেকেই উড়বে, তাই তো? একটু খেয়াল করে দেখুন তো – এটাই আজ হচ্ছে কিনা? সামরিক-বেসামরিক বিভেদ তৈরি করে আমরা এমন একটা বাজে অবস্থার অবতারণা করেছি, যা থেকে বের হবার কোন তরিকা আমরা পাচ্ছি না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিমানের নাম হলো – ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’, অর্থাৎ সেটা বিমান বাহিনীর বিমান। রাষ্ট্রনায়ককে রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার একটা অংশ। তাই বিমান বাহিনীর হাতে তাদের দেশের প্রেসিডেন্টের বিমান। যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করা উদ্দেশ্য নয়; উদ্দেশ্য হচ্ছে মনে করিয়ে দেয়া যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার মাঝে কোন সামরিক-বেসামরিক ব্যাপার নেই; রাখা যাবে না। বিমান বন্দরের যেকোন কোণায় নিরাপত্তার চ্যুতি হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় চ্যুতি। আমরা আজ যদি প্রধানমন্ত্রীর বিমানের নাট-বল্টু খোলাকে মেনে নিই, তাহলে মিগ-২৯-এর দিকে ঢিল ছোঁড়াকে তো খেলা হিসেবেই দেখবো; তাই না? এই অবস্থা চলতে দেয়া যায় না।
ই একই রানওয়ে দিয়ে ক’দিন আগেই চীনা প্রেসিডেন্টের বিমান নেমেছিল। সেই নেতার বিমানকে এসকর্ট করেছিল বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফাইটার বিমান – এ তো বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোর মতো ব্যাপার হয়ে গেলো। মোটকথা যার উদ্দেশ্য ক্ষতি করা, সে যে কোন সময়েই সেটা করতে পারে; যে কোন উপায়েই করতে পারে। এখানে শুধু উপায় ঠেকিয়ে কাজ হবে না; মানুষ ঠিক করতে হবে। আর মানুষ ঠিক করতে গেলে কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে হবে।


প্রথমতঃ যে পশ্চিমারা এই রাষ্ট্রের অংশ নয় এবং এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করে না, তাদের হাতে বিমান বন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়ে যে আমরা ভুল করেছি, সেটা তো বুঝতে বাকি নেই। এতে শুধু যেসব সাম্রাজ্যবাদীদের চাপে এটা করা হয়েছে, তাদের স্বার্থই রক্ষিত হচ্ছে।

দ্বিতীয়তঃ বিমান বন্দরের ওই ভবনকে রাষ্ট্রদ্রোহীদের আড্ডাখানা হিসেবে পোষা যাবে না। আমরা এফ-৭ স্যাবোটাজ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি না। এদেশী লোক দিয়ে বিদেশী স্বার্থ রক্ষা করার দিন শেষ। তারা যতো শক্তিশালীই হোক না কেন, তাদের পেছনে যতো শ্রমিক সংগঠকই থাকুক না কেন, এদের শেকড় উপড়াতে হবেই। জাতীয় নিরাপত্তার ব্যাপারে ছাড় দেবার প্রশ্নই আসে না।

তৃতীয়তঃ যে রানওয়ে ব্যবহার করে দেশের সামরিক বিমান এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের বিমান ওড়ে, সেই রানওয়েকে সামরিক-বেসামরিক বিভেদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা থেকে বাদ দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত রানওয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ হতে হবে; পুরোটার নিরাপত্তা একই সূত্রে গাঁথা হতে হবে। পুরোটা একটা শরীরের মতো কাজ করবে; শরীরের এক অংশে চিমটি কাটলে সারা শরীর টের পাবে এবং সাথে সাথে ব্যবস্থা নেবে।

চতুর্থতঃ নাট-বল্টুর উপর দোষ চাপানোর মানে কি? অর্থাৎ আবারও সেই ১৯৯১-এর মতো সৃষ্টিকর্তার উপর দিয়ে চালিয়ে নেবার চেষ্টা নাকি? দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এই ক্ষেত্রে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। ‘আমার অধীনে এগুলি হয়েছে, তবে আমি জানতাম না’ – এধরনের যুক্তি অবান্তর। জাতীয় নিরাপত্তা যেখানে ভূলুন্ঠিত, সেখানে এধরণের গা-বাঁচানো কথা শুনতে আমরা প্রস্তুত থাকবো কেন?

‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়নের পথে আমরা যদি এসব আবর্জনা পেছনে জমিয়ে রেখে সামনে এগুনোর চেষ্টা করি, তাহলে আমরা হোঁচট খেতে বাধ্য। বিমান বন্দর এবং বিমান বাহিনী রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলিকে আলাদা করে দেখতে গেলে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা দেয়াও সম্ভব হবে না। এই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা রাষ্ট্রকে করবে দুর্বল। এই রাষ্ট্রের অতি-গুরুত্বপূর্ণ এই ‘গেইটওয়ে’র নিরাপত্তা এই রাষ্ট্রের হাতেই থাকতে হবে।

Friday, 2 December 2016

সৃজনশীলতাকে আমরা কি করে এগিয়ে নেব?

০৩ ডিসেম্বর ২০১৬
সইচিরো হনডা জাপানের বিখ্যাত হনডা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৬ সালে তিনি একটি মোটরসাইকেল তৈরি করেন, যা আসলে ছিল একখানা ইঞ্জিন বসানো বাইসাইকেল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর জাপানের সমাজে আবারো উঠে দাঁড়াবার যে বিপুল আকাংক্ষা ছিল, সেটার মাধ্যমে এই ইঞ্জিন-লাগানো বাইসাইকেল থেকে হনডা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচাইতে বড় মোটরসাইকেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজ চাইছিলো হনডা মোটরসাইকেল তৈরি করেন, সন্ত্রাসীসের অস্ত্র নয়।


সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না

বাংলাদেশ তথা পুরো বিশ্বেই তথাকথিত জঙ্গীবাদের কথা যখন আমরা টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকায় দেখি, তখন এমন কিছু মানুষের কাহিনী আমরা জানতে পারি, যারা তাদের high-tech জ্ঞানকে ভুল পথে প্রবাহিত করে বহু মানুষের হত্যাকান্ডের কারণ হয়েছে। এরা এই সমাজ থেকেই তাদের সৃজনশীলতাকে এগিয়ে নেবার জন্যে ভুল দিকনির্দেশনা পেয়েছে বলেই এটা হয়েছে। সমাজ চাইলে এই সৃজনশীলতা মানুষের কাজে লাগতো। একটা উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটাকে বোঝানোর চেষ্টা করি। সইচিরো হনডা (Soichiro Honda) ছিলেন জাপানের বিখ্যাত হনডা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন মোটরগাড়ি কারখানার মেকানিক। পরে ইঞ্জিনের পিস্টন তৈরি করার কারখানা করেন এবং পরবর্তীতে নিজেই অটোমোবাইল কারখানা দিয়ে ফেলেন। তার অটোমোবাইল কারখানা করার শুরুতে ১৯৪৬ সালে তিনি একটি মোটরসাইকেল তৈরি করেন, যা আসলে ছিল একখানা ইঞ্জিন বসানো বাইসাইকেল; আর এর ফুয়েল ট্যাংকটা ছিল পানির বোতল দিয়ে তৈরি। উদ্ভট শোনাতে পারে তার এই প্রথম মোটরসাইকেলের কথা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর জাপানের সমাজে আবারো উঠে দাঁড়াবার যে বিপুল আকাংক্ষা ছিল, সেটার মাধ্যমে এই ইঞ্জিন-লাগানো বাইসাইকেল থেকে হনডা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সবচাইতে বড় মোটরসাইকেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজ চাইছিলো হনডা মোটরসাইকেল তৈরি করেন, সন্ত্রাসীসের অস্ত্র নয়।

বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় বহু নতুন নতুন আবিষ্কারের কাহিনী আসে নিয়মিতই। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেই আবিষ্কারগুলিকে বুঝতে পারে? আবার যেহেতু সেই আবিষ্কারকেরা এই সমাজ থেকেই আবির্ভূত, প্রশ্ন আসবে যে সমাজের কোন ধরনের চিন্তা তাদেরকে এই বিশেষ আবিষ্কারের দিকে মনোনিবেশ করালো? সেই চিন্তাটা সমাজের বা‌‌ রাষ্ট্রের কি আসলেই কাজে লাগবে? নাকি মানুষের কাজে লাগে না – এমন কোন আবিষ্কারের চিন্তা সমাজ থেকে সেই মানুষটি পাচ্ছে? যদি এরকম ব্যর্থ আবিষ্কারের কাহিনী লেখার জন্যেই এই সমাজের বা‌‌ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাহলে আজ অথবা কাল যেকোন সময়েই হোক, এই আবিষ্কারকের দল বিভ্রান্ত হতে বাধ্য! আর বিভ্রান্ত এই আবিষ্কারকেরাই হবে সমাজের তথা রাষ্ট্রের জন্যে হুমকি স্বরূপ। যেহেতু এই সমাজ এই আবিষ্কার বোঝেনা, এই আবিষ্কারের চিন্তা সমাজের কোন চিন্তার ফলাফল সেটাও সে বোঝেনা, তাই যারা এই সমাজকে বা রাষ্ট্রকে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন, তারাই এই আবিষ্কারকে নিজেদের কাজে ব্যবহার করবেন – এটাই স্বাভাবিক। এমনকি দরকার হলে সেই আবিষ্কারকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে বা‌‌ রাষ্ট্রকে দুর্বল থেকে আরও বেশি দুর্বল করে তুলবে। আমরা আমাদের intellectual ability-তে ঘাটতি কারণে কিছুই বুঝতে ব্যর্থ হবো।
  
বরিশালের আজোপাড়াগাঁয়ের এক সৃজনশীল ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের জেট ইঞ্জিন কি ঢাকার এক শিল্পপতির জেট বিমানের স্বপ্নের সাথে মিলে যায়? চট্টগ্রামের এক মোটরসাইকেল নির্মাতার স্বপ্নের সাথে রাজশাহীর এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটরসাইকেলের কি মিল খুঁজে পাওয়া যায়? গাজীপুরের কোন ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারারের স্বপ্নের সাথে খুলনার কোন স্পাইং ডিভাইস আবিষ্কারকের স্বপ্নের কি মিল হয়? ইঞ্জিন, ড্রোন, সী-প্লেন, রকেট, হাই-টেক কেমিক্যাল, ইত্যাদি যে কোন জিনিসই সমাজের বিভিন্ন মানুষের স্বপ্নের যোগাযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু এখানে আসল প্রভাবক হবে রাষ্ট্র।

রাষ্ট্রকে স্বপ্ন দেখাতে হবে, হতে হবে স্বপ্নের যোগাযোগের মাধ্যম

আমাদের শিল্পপতিরা এদেশের ব্লু ইকনমি গড়ার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারেন। সমাজের সৃজনশীল মানুষেরাও কি রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করার স্পৃহা পান? একজন মানুষ তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কি আরেকজনের স্বপ্নের সাথে মিল খুঁজে পান? একজনের স্বপ্ন কি আরেকজনের স্বপ্ন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আরও বেশি দ্রুত সামনে এগুতে থাকে? বরিশালের আজোপাড়াগাঁয়ের এক সৃজনশীল ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের জেট ইঞ্জিন কি ঢাকার এক শিল্পপতির জেট বিমানের স্বপ্নের সাথে মিলে যায়? চট্টগ্রামের এক মোটরসাইকেল নির্মাতার স্বপ্নের সাথে রাজশাহীর এক তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের জ্বালানি সাশ্রয়ী মোটরসাইকেলের কি মিল খুঁজে পাওয়া যায়? গাজীপুরের কোন ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারারের স্বপ্নের সাথে খুলনার কোন স্পাইং ডিভাইস আবিষ্কারকের স্বপ্নের কি মিল হয়? ইঞ্জিন, ড্রোন, সী-প্লেন, রকেট, হাই-টেক কেমিক্যাল, ইত্যাদি যে কোন জিনিসই সমাজের বিভিন্ন মানুষের স্বপ্নের যোগাযোগ করে দিতে পারে। কিন্তু এখানে আসল প্রভাবক হবে রাষ্ট্র।

রাষ্ট্র তার চিন্তাকে প্রতিষ্ঠা করে, নিরাপত্তা দেয় এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। সেটাই হচ্ছে রাষ্ট্রের লক্ষ্য। রাষ্ট্র যখন তার লক্ষ্যের পিছনে ছুটবে, তখন সমাজের শিল্পপতি, আবিষ্কারক, চিন্তাবিদ, এবং অন্যান্য সকলেই একই লক্ষ্যের পিছনে ছুটবে। একই লক্ষ্যের পিছনে ছোটা মানুষগুলি একে অপরকে একই রাস্তায় নিজের পাশেই খুঁজে পাবে। কোনকিছুই অসংলগ্ন মনে হবে না। কোন শিল্পপতির জেট বিমান বানাবার স্বপ্ন তার ঘুমের ওষুধ হিসেবেই শুধু কাজ করবে না; কোন আবিষ্কারকের আবিষ্কৃত জেট ইঞ্জিনখানাকে তার মা চালের ঝুড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে না; কোন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের স্বপ্নের কেমিক্যাল প্ল্যান্টের প্ল্যান তার বিছানার বালিশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না; কোন এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের তৈরি প্রথম বিমান শুধু মশা মারার অস্ত্র হিসেবেই সমাজের কাছে গণ্য হবে না। হাজার হাজার নতুন আবিষ্কার শুধুমাত্র সায়েন্স ফেয়ারে হাততালি পাবার জন্যে বা পশ্চিমা দেশকে সমৃদ্ধ করার জন্যেই তৈরি হবে না। কোন শিল্পপতি পৃথিবীর সবচাইতে হাই-টেক অন্তর্বাস তৈরি করেছেন বলে শান্তিতে কবরে যেতে পারবেন বলে ভাববেন না। এদেশের পাটের মাঝে এই দেশের আসল উন্নতি মনে করে কেউ পাট থেকে হাই-টেক কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল তৈরির দিকে না গিয়ে মনোরম ঝুড়ি তৈরি করে কিছু ডলার কামিয়ে একবেলা আগের চাইতে একটু বেশি ভালো খাবার খাওয়ার চেষ্টাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে দেখবে না। বরং, স্টিলের পাতের মাঝে সে আফ্রিকার বন্দরে নিজেদের জাহাজ দেখবে! এলুমিনিয়ামের মাঝে সে ঘটি-বাটি নয়, বরং বিমান দেখবে। পাটের মাঝে সে ভারতে রপ্তানিযোগ্য সুতা নয়, বরং কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালের মিলিটারি এপ্লিকেশন দেখবে। ধানের তুষের মাঝে সে রপ্তানিযোগ্য ছাই নয়, বরং দেখতে পাবে কেমিক্যাল প্ল্যান্ট।
 
নিজেদের শ্রমে পশ্চিমাদের উপরে তোলার চেষ্টা বাদ দিতে হবে – এগুলি আমরা করে চলেছি আড়াই’শ বছরের বেশি সময় ধরে। এখন এদেশের ওইসব প্রভাবশালী পত্রিকার পশ্চিম-মুখী লোলুপ প্রতিবেদন গেলার সময় নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে আজ অতি-জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ, চলমান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ বেকারত্ব, ক্ষয়িষ্ণু জনসংখ্যা, চরম নৈতিক অবক্ষয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা, বৃদ্ধ জনসংখ্যা, ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা জেঁকে বসেছে। সামনের দিনগুলিতে এসব সমস্যা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কাজেই তাদেরকে আইডল হিসেবে দেখাটা বোকার স্বর্গে বাস করা।

সৃজনশীলতাকে পশ্চিম-মুখী করার সময় শেষ

একজন তরুণের স্বপ্ন হতে পারে না প্যারিসের ক্যাটওয়াকে তার ডিজাইন করা অর্ধনগ্ন জামাকাপড়ের জড়ানো মডেলের দিকে সবাই লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে থাকবে। অথবা তার ডিজাইন করা পাইলট-বিহীন সোলার বিমান ইউরোপের বড় কোম্পানি মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তার কাছ থেকে কিনে নেবে। অথবা বাংলাদেশের পাটকে ব্যবহার করে সে ইউরোপের কোম্পানির জন্যে মোটগাড়ির ইন্টেরিয়র ও বাম্পার তৈরি করবে। অথবা নাসার জন্যে রকেট বানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে করমর্দনরত অবস্থায় একটা সেলফি তুলবে। নিজেদের শ্রমে পশ্চিমাদের উপরে তোলার চেষ্টা বাদ দিতে হবে – এগুলি আমরা করে চলেছি আড়াই’শ বছরের বেশি সময় ধরে। এখন এদেশের ওইসব প্রভাবশালী পত্রিকার পশ্চিম-মুখী লোলুপ প্রতিবেদন গেলার সময় নয়। ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার পক্ষে ঢোল পেটানোর মতো সময় আমাদের এখন নেই। পশ্চিমা বিশ্বকে আজ অতি-জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ, চলমান ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ বেকারত্ব, ক্ষয়িষ্ণু জনসংখ্যা, চরম নৈতিক অবক্ষয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা, বৃদ্ধ জনসংখ্যা, ইত্যাদি মারাত্মক সমস্যা জেঁকে বসেছে। সামনের দিনগুলিতে এসব সমস্যা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কাজেই তাদেরকে আইডল হিসেবে দেখাটা বোকার স্বর্গে বাস করা। সবার হাতেই এখন ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। একটু সার্চ করলেই সামনে এসে যাচ্ছে তাদের এই সমস্যাগুলির কথা। এখন সকল ভবিষ্যত এখানে। সকল সৃজনশীলতার প্রয়োগও এখানেই হতে হবে।
 
সইচিরো হনডা তার বাইসেকেলে পানির বোতল ব্যবহার করেছিলেন ফুয়েল ট্যাঙ্ক হিসেবে – এটা জানলে কিন্তু আমাদের আবার আগের জায়গায় ফেরত যেতে হবে না। অর্থাৎ আবারও নতুন করে মোটসাইকেল আবিষ্কারের দরকার নেই। বরং একুশ শতকে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে আমরা নতুন কি দিতে পারি, সেটাই আজকে প্রশ্ন। ড্রোন, রাডার, সোনার, রকেট, স্যাটেলাইট, নাইট ভিশন, সিমুলেটর, রোবোটিক্স, ইত্যাদি প্রযুক্তি এখন হওয়া উচিত স্বাভাবিক। এগুলিকে পুঁজি করেই আগাতে হবে সামনে; রাষ্ট্র এখানে হবে মাধ্যম। রাষ্ট্র দেখাবে পথ; বলে দেবে ভবিষ্যত কোনটা - আন্ডার-ওয়্যার, নাকি আন্ডার-ওয়াটার ওয়ারফেয়ার।

সৃজনশীলতার দরকার একটা কর্মপদ্ধতি…

সৃজনশীলতাকে রাষ্ট্রের সাথে একই পথে নেয়ার জন্যে কিছু পথ অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন –

১. সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খবর পৌঁছে দেয়া যে নতুন কোন সৃজনশীল কাজ দেখলেই সেটা যেন ডকুমেন্ট করা হয় এবং রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কাছে (যেমন প্রশাসক, আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক বাহিনী, প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ) সেটা লিখিত আকারে পৌঁছে দেয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সৃজনশীল কাজের মেলা বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং সেখানে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের জড়িত হওয়া এক্ষেত্রে অনেকদূর এগিয়ে নেবে। তবে এখানে ক্রিয়েটিভিটি ফিল্টারিং-এর একটা ব্যবস্থা থাকতে হবে, নয়তো অদরকারী ব্যাপারগুলিও সৃজনশীল হিসেবে স্থান পেয়ে যাবে।

২. রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের কাছে লিখিত আকারে বলে দেয়া যে কোন ধরনের সৃজনশীল কর্মকান্ডকে কোথায় রিপোর্ট করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে যেসকল সৃজনশীল কর্মকান্ড থাকবে, সেগুলি রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা নিজেরাই রিপোর্ট করবেন। তাদের সকল অধঃস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে এধরনের সৃজনশীল কর্মকান্ড দেখলেই রিপোর্ট করার নিয়ম থাকবে।

৩. রাষ্ট্রের সকল বিভাগে রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আরএন্ডডি) উইং থাকতে হবে, যারা সৃজনশীলতা সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট প্রসেস করবে। এই উইং-গুলি এই রিপোর্টগুলিকে ডকুমেন্ট করবে এবং সেগুলি গুরুত্ব অনুসারে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করবে। বিভিন্ন বিভাগের আরএন্ডডি উইং-এর মাঝে যোগসূত্র থাকবে কাজের সুবিধার্থে। উদাহরণস্বরূপ - আইসিটি সেক্টরে কোন সৃজনশীল কাজের রিপোর্ট যাবে আইসিটি বিভাগে। যদি নৌ-পরিবহণ বিভাগের আইসিটি বিভাগের সাথে যোগাযোগ থাকে, তাহলে এমন হতে পারে যে আইসিটি বিভাগের ওই কাজ নৌ-পরিবহণের কাজে লেগে যেতে পারে।

৪. আরএন্ডডি উইং-গুলির সাথে এপ্লিকেশন এরিয়ার সরাসরি সংযোগ থাকতে হবে। তারা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের উপদেশ দেবে অথবা উচ্চতর শিক্ষার উপদেশ দেবে। উদাহরণস্বরূপ – কৃষি ক্ষেত্রের অনেক গবেষণা কৃষক পর্যায়ে যাচ্ছে বিএডিসি-র মাধ্যমে। তাই কৃষিক্ষেত্রে সকল সৃজনশীল কাজগুলিকেও এই প্রসেসের মাঝে নিয়ে আসতে হবে।

৫. আরএন্ডডি উইং-গুলির সাথে ওই বিভাগের সাথে সম্পর্কিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির সরাসরি যোগাযোগ থাকতে হবে, যাতে কোন সৃজনশীলতাকে সরাসরি এপ্লিকেশনে পাঠানো যায় কিনা বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে আরও আরএন্ডডি-তে নেয়া যায় কিনা, সেটা দেখা হবে। উদাহরণস্বরূপ – মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির আরএন্ডডি উইং-এর সাথে স্টিল ইন্ডাস্ট্রির যোগ থাকতে পারে, যাতে নতুন কোন সৃজনশীল প্রজেক্টকে এগিয়ে নেয়া যায়।

৬. গুরুত্ব অনুধাবন করা গেলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের পদ্ধতিও রাখতে হবে। এভাবে গুরুত্ব অনুসারে বেসরকারি শিল্পোদ্যক্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে সম্পূর্ণ নতুন কোন শিল্প-ধারণাকেও এগিয়ে নেয়া যায়।

৭. রাষ্ট্রের কোন কাজগুলি কাকে দিয়ে করা যাবে, সেটা রাষ্ট্রকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভুল পোস্টিং দিলে কোন সৃজনশীল কাজই কোনদিন দিনের আলো দেখবে না; রাষ্ট্র হবে প্রতারিত।

সৃজনশীলতার ব্যাপারে কর্মপদ্ধতিগুলি নিয়ে আগানোর সময় এখনই। সইচিরো হনডা তার বাইসেকেলে পানির বোতল ব্যবহার করেছিলেন ফুয়েল ট্যাঙ্ক হিসেবে – এটা জানলে কিন্তু আমাদের আবার আগের জায়গায় ফেরত যেতে হবে না। অর্থাৎ আবারও নতুন করে মোটসাইকেল আবিষ্কারের দরকার নেই। বরং একুশ শতকে রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে আমরা নতুন কি দিতে পারি, সেটাই আজকে প্রশ্ন। ড্রোন, রাডার, সোনার, রকেট, স্যাটেলাইট, নাইট ভিশন, সিমুলেটর, রোবোটিক্স, ইত্যাদি প্রযুক্তি এখন হওয়া উচিত স্বাভাবিক। এগুলিকে পুঁজি করেই আগাতে হবে সামনে; রাষ্ট্র এখানে হবে মাধ্যম। রাষ্ট্র দেখাবে পথ; বলে দেবে ভবিষ্যত কোনটা - আন্ডার-ওয়্যার, নাকি আন্ডার-ওয়াটার ওয়ারফেয়ার।

Tuesday, 29 November 2016

রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করা বলতে আমরা কি বুঝি?

২৯শে নভেম্বর ২০১৬

 
Motorola-কে আমরা মোবাইল হ্যান্ডসেট কোম্পানি বলে চিনি। কিন্তু তারা যে ডিফেন্স সাপ্লাইয়ার, সেটা আমরা কতজন জানি?


ডিফেন্স কনট্রাকটর কারা?

ইস্রাইলের মেরকাভা (Merkava) ট্যাঙ্কের বিভিন্ন কম্পোনেন্ট-এর সাপ্লাইয়ারের নাম আমরা কতটুকু জানি? অথবা জিজ্ঞেস করার মতো চিন্তা কতজন করি? আমরা যতটুকু জানি সেটা হলো ইস্রাইল মেরকাভা ট্যাঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু একটা ট্যাঙ্ক তো আর এমনি এমনি কেউ তৈরি করে ফেলতে পারবে না। এর বিভিন্ন কম্পোনেন্ট তৈরিতে বিভিন্ন ব্যাপারে এক্সপার্ট হতে হবে। যেমন যে ট্যাঙ্কের কামান তৈরি করবে, সে ইলেকট্রনিক্স বা ইঞ্জিন বা ট্র্যাক তৈরি করবে না। এই ট্যাঙ্কের কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতির encryption-এর সাপ্লাইয়ার হলো Motorola, যাকে আমরা মোবাইল হ্যান্ডসেট কোম্পানি বলে চিনি। এর ব্যালিস্টিক প্রোটেকশনের জন্যে যেসব জিনিস লাগছে, সেগুলি আসছে কেমিক্যাল কোম্পানি DuPont-এর কাছ থেকে। Caterpillar-কে আমরা চিনি কন্সট্রাকশন যন্ত্রপাতি তৈরি করার কোম্পানি হিসেবে; এরা সাহায্য করেছে ট্যাঙ্কটির ট্র্যাক ডিজাইন করতে। কাজেই এখন Motorola, DuPont আর Caterpillar-কে আপনি কি ধরনের কোম্পানি হিসেবে দেখবেন? এরা যে সকলেই ডিফেন্স কনট্রাকটর হিসেবে কাজ করছে এটা কি আমরা এখন বুঝতে পারছি?
  
মাহিন্দ্রা আমাদের কাছে গাড়ির কোম্পানি।মাহিন্দ্রা সেনাবাহিনীর জন্যে গাড়ি তৈরি করে। মাহিন্দ্রার সাথে Airbus Helicopters-এর চুক্তি হয়েছে সামরিক হেলিকপ্টার তৈরি করার জন্যে।

ভারতীয় কর্পোরেট হাউস, নাকি ডিফেন্স কনট্রাকটর?

এবার দেশের কাছাকাছি কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। মেরকাভা ট্যাঙ্কের ব্যালিস্টিক কম্পিউটার এবং ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম তৈরি করেছে ইস্রাইলের Elbit Systems Ltd, যারা কিনা মূলত ডিফেন্স-এর কনট্রাকটর। এই একই কোম্পানি ভারতের অর্জুন ট্যাঙ্কের Laser Warning Control System (LWCS) তৈরি করতে সাহায্য করেছে। এই একই ট্যাঙ্কের ইঞ্জিনটি এখন ডেভেলপ করছে ভারতের কয়েকটি কোম্পানি মিলে। এর মাঝে রয়েছে মহারাষ্ট্রের পুনের Kirloskar Group, যারা পাম্প, ইঞ্জিন, মোটর, ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, কমপ্রেসার, CNC Lathe, মোটরগাড়ি, ইত্যাদি তৈরি করে। ১৯৮৮ সালে এই গ্রুপের ১০০তম জন্মদিনে ভারতের রাষ্ট্রীয় ডাকটিকেট উন্মোচন করা হয়। এতে বোঝা যাচ্ছে যে সেই রাষ্ট্রের কাছে এই কোম্পানিটি শুধু একটি প্রাইভেট কোম্পানি নয়; অন্য কিছু। কোম্পানিটির ইঞ্জিন তৈরি করার সাবসিডিয়ারি ৩ হর্সপাওয়ারের পানির পাম্পের ইঞ্জিন থেকে শুধু করে ১১ হাজার হর্সপাওয়ারের ইলেকট্রিক পাওয়ার জেনারেশন ইঞ্জিন তৈরি করে। এরা ভারতে Toyota গাড়ি তৈরি করে। বর্তমানে কোম্পানিটি আমেরিকার Cummins-এর সাথে একত্রে অর্জুন ট্যাঙ্কের ইঞ্জিন ডেভেলপ করছে; সাথে অন্যান্যদের সহায়তাও রয়েছে। এখন Kirloskar Group-কে আমরা কি কোম্পানি বলবো? পানির পাম্প বা ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার তৈরি করা কোম্পানি, নাকি ডিফেন্স কনট্রাকটর?
  
বাংলাদেশে ভেড়ামারার ৩৬০ মেগাওয়াট গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র এবং শিকলবাহার ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ করছে Larsen & Toubro. তারা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্যে রাডার, মিসাইল, রকেট, নেভাল টর্পেডো, সাবমেরিন হাল, সোনার, ইত্যাদি তৈরি করে। Prithvi-II-সহ ভারতের অনেক স্ট্র্যাটেজিক মিসাইলের মোবাইল প্ল্যাটফর্ম Larsen & Toubro-এর হাতে তৈরি। এই কোম্পানিকে আমরা কি বলে চিনি?

এরকম বহু উদাহরণ রয়েছে ভারতে এবং বাকি বিশ্বে। ভারতের প্রাইভেট ডিফেন্স কনট্রাকটরদের মাঝে রয়েছে Tata, Mahindra, Reliance, Hinduja, Larsen & Toubro, Godrej ইত্যাদি। Tata Advanced Systems Limited নামে কোম্পানিটি আমেরিকার Sikorsky Aircraft Corporation-এর সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে Sikorsky S-92 হেলিকপ্টার তৈরি করছে। Israel Aircraft Industries-এর সাথে একত্রে তারা ড্রোন তৈরি করছে। হিন্দুজা গ্রুপের Ashok Leyland Defence Systems ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেশিরভাগ ট্রাক তৈরি করেছে। মাহিন্দ্রা সেনাবাহিনীর জন্যে গাড়ি তৈরি করে। মাহিন্দ্রার সাথে Airbus Helicopters-এর চুক্তি হয়েছে সামরিক হেলিকপ্টার তৈরি করার জন্যে। Reliance Defence and Engineering Limited ভারতের নৌবাহিনীর জন্যে যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে। Godrej Aerospace ভারতের স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেভিকেলের জন্যে ইঞ্জিন তৈরি করছে, BrahMos মিসাইল তৈরি করছে; যুক্তরাষ্ট্রের GE, Honeywell, যুক্তরাজ্যের Rolls-Royce এবং ইস্রাইলের Rafael-এর জন্যে বিভিন্ন কম্পোনেন্ট তৈরি করছে। Larsen & Toubro ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জন্যে রাডার, মিসাইল, রকেট, নেভাল টর্পেডো, সাবমেরিন হাল, সোনার, ইত্যাদি তৈরি করে। Prithvi-II-সহ ভারতের অনেক স্ট্র্যাটেজিক মিসাইলের মোবাইল প্ল্যাটফর্ম Larsen & Toubro-এর হাতে তৈরি। এই কোম্পানিগুলিকে আমরা কি বলে চিনি? বাংলাদেশে ভেড়ামারার ৩৬০ মেগাওয়াট গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র এবং শিকলবাহার ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ করছে Larsen & Toubro. গোদরেজ-কে আমরা চিনি চুলের কালার এবং গুডনাইট মশার ওষুধের জন্যে। টাটা, মাহিন্দ্রা, অশোক লেল্যান্ড আমাদের কাছে গাড়ির কোম্পানি; রিলায়েন্স হলো মোবাইল ফোন কোম্পানি। মোটকথা, আমাদের কাছে এই কোম্পানিগুলি বেসামরিক কোম্পানি, মিসাইল-রাডার-ট্যাঙ্কের ইঞ্জিন তৈরির কোম্পানি নয়। আমরা এমন অদ্ভূত শিশুসুলভ আচরণ কতোদিন করে যাবো সেটাই কি প্রশ্ন নয়?
 
Caterpillar-কে আমরা চিনি কন্সট্রাকশন যন্ত্রপাতি তৈরি করার কোম্পানি হিসেবে; এরা সাহায্য করেছে ইস্রাইলের মেরকাভা ট্যাঙ্কের ট্র্যাক ডিজাইন করতে। তাদের তৈরি ইঞ্জিন বহু সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।

আমরা রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করা শুরু করবো কবে থেকে?

এর আগেই লিখেছিলাম যে আমাদের শিল্পপতিরা কিভাবে ব্লু ইকনমি গড়বেনসামরিক-বেসামরিক বিভেদ চিন্তা এখানে আসতে দিলে রাষ্ট্র হবে ক্ষতিগ্রস্ত। রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করাই হচ্ছে উচ্চতর কাজ; বাকি সব গৌণ। ১০০ টাকার কাজের মাঝে ১ টাকার কাজ যদি রাষ্ট্রের জন্যে করা হয়, তার মানে হলো সেই কোম্পানিকে রাষ্ট্র বিশ্বাস করে। ওই ১% কাজই সেই কোম্পানিকে রাষ্ট্রের অংশ বানিয়ে ফেলে। আর সেটাই হয়ে যায় তার মার্কেটিং-এর সবচাইতে বড় অস্ত্র – “আমরা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে থাকি”। তার আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় না। ডিফেন্স কনট্রাকটর হওয়াটা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ। চিপস-এর প্যাকেট, আন্ডারওয়্যার, বিউটি সাবান অনেক তৈরি হয়েছে; এবার রাষ্ট্রের জন্যে কাজ করার পালা। বাংলাদেশ এখন আর বিশ্বব্যাংকের সংজ্ঞায় পড়ছে না; যেকারণে শুধু দিল্লীতে নয়, আটলান্টিকের ওপাড়েও ক্রাইসিস চলছে। এই রাষ্ট্র এখন বিশ্বকে আগের মতো দেখছে না – আমাদের কর্পোরেটদের এই ব্যাপারটাকে শুধু অনুধাবন করা নয়, কাজে প্রমাণ করার সময় এসেছে। যারা এসময় গালে হাত দিয়ে বসে থাকবেন, তাদের একসময় বিরাট আফসোসের মাঝে পড়তে হবে। মনে রাখতে হবে – সময় ফেরত আসে না।

Tuesday, 22 November 2016

সামরিক বাজেট ব্যাপারটা আসলে কি?

২২শে নভেম্বর ২০১৬

সামরিক-বেসামরিক বিভেদ তৈরি করে সেটাকে জিইয়ে রাখার একটা উতকৃষ্ট পদ্ধতি হলো আলাদা করে সামরিক বাজেট ঘোষণা করে সেটিকে ইস্যু হিসেবে সামনে নিয়ে আসা। বেসামরিক জনগণের মাঝে একটা চিন্তার সূত্রপাত ঘটানো যে সামরিক বাজেট সব টাকা খেয়ে ফেলছে। এভাবে দেশের মানুষকে দিয়েই দেশের নিজ নিরাপত্তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয় যাতে দেশের জনগণ নিজেরাই নিজেদের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে ফেলতে থাকে। আর দেশের প্রতিরক্ষা দুর্বল হলে তাদেরই লাভ হয়, যারা এই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী।


বাংলাদেশের সামরিক বাজেট নিয়ে কম বিতর্ক দেখিনি আমরা। সবসময়েই বিতর্কের নেতৃত্ব দিয়েছে বিদেশী অর্থে লালিত এনজিও-গুলি এবং তাদের মুখপাত্র কিছু আদর্শিক পত্রিকা। কিন্তু এই সামরিক বাজেট আসলে কি? বেসামরিক বাজেটই বা কি? সামরিক বাজেটকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে যে বেসামরিক বাজেটটা আসলে কি। এর আগে সামরিক-বেসামরিক আলাদা করার লাইনের কৃত্রিমতা নিয়ে লিখেছিলাম। আবার এরও আগে লিখেছিলাম যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু সামরিক কোন বিষয় নয়। আসলে সামরিক-বেসামরিক বিভেদ তৈরি করে সেটাকে জিইয়ে রাখার একটা উতকৃষ্ট পদ্ধতি হলো আলাদা করে সামরিক বাজেট ঘোষণা করে সেটিকে ইস্যু হিসেবে সামনে নিয়ে আসা। বেসামরিক জনগণের মাঝে একটা চিন্তার সূত্রপাত ঘটানো যে সামরিক বাজেট সব টাকা খেয়ে ফেলছে। দেশের সকল মানুষের হক খেয়ে ফেলছে সামরিক বাজেট। এভাবে দেশের মানুষকে দিয়েই দেশের নিজ নিরাপত্তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়। অর্থাৎ দেশের জনগণ নিজেরাই নিজেদের প্রতিরক্ষা দুর্বল করে ফেলতে থাকে। আর দেশের প্রতিরক্ষা দুর্বল হলে তাদেরই লাভ হয়, যারা এই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী।

দেশের বেসামরিক বাজেটের মাঝে যা থাকে, সেটার কি আসলে কোন সামরিক গুরুত্ব নেই? তাহলে কেন জরুরী মুহুর্তে বেসামরিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়? সেটা করা হয়, কারণ সেটা “বেসামরিক” হবার কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং সেটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ সেটা “কৌশলগত” দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই “কৌশলগত” ব্যাপারটাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত। এভাবে অনেক ব্যাপারই রয়েছে যেগুলি কৌশলগত দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলিকে বলা হয় “বেসামরিক” বাজেট। যেমন –

দুর্বল স্বাস্থ্যের একটা লোক তো একটা রাইফেলই তুলতে পারবে না। দেশের খাদ্য এবং স্বাস্থ্যনীতি তাই দেশের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত।
    
 ১. যদি দেশের মানুষ অপুষ্টিতে ভোগে, তাহলে আপনি দরকারের সময়ে সামরিক বাহিনীর জন্যে রিক্রুট পাবেন কোথা থেকে? দুর্বল স্বাস্থ্যের একটা লোক তো একটা রাইফেলই তুলতে পারবে না। ১৯৭১ সালে সালে যত মানুষ যুদ্ধ করেছিল, তার বেশিরভাগই তো ছিল বেসামরিক লোক। তাহলে সেই সময়ের “সামরিক সামরিক” এবং “বেসামরিক সামরিক” লোকগুলিকে আপনি কি করে আলাদা করবেন? এরা সবাই তো অস্ত্রধারী যোদ্ধা ছিল এবং রক্ত ঝড়িয়েছে। দেশের খাদ্য এবং স্বাস্থ্যনীতি তাই দেশের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত।
     
ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, এরোনটিক্যাল, ম্যারিন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার না থাকলে সামরিক কোন স্থাপনা বা যন্ত্রপাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা বাজেট তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
২. দেশের মানুষ অশিক্ষিত হলে উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক যন্ত্র চালানোর জন্যে লোক কি আপনি বাইরে থেকে নিয়ে আসবেন? অশিক্ষিত লোক তো আর্টলারি টার্গেটিং-এর হিসেব বুঝবে না। যুদ্ধবিমান চালাতে বা বিমান তৈরি ও মেরামতে হবে অক্ষম। ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, এরোনটিক্যাল, ম্যারিন, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার না থাকলে সামরিক কোন স্থাপনা বা যন্ত্রপাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। শিক্ষানীতি এবং শিক্ষা বাজেট তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতির চাকাকে সর্বদা সচল রাখতে না পারলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং সামরিক সক্ষমতাও হ্রাস পাবে।

    ৩. ষোল কোটি মানুষকে খাইয়ে-পড়িয়ে বাঁচিয়ে রাখতে যে অর্থনীতির চাকা চালিত রাখতে হবে, সেটা কাউকে বোঝাতে হবে না। এই চাকাকে সর্বদা সচল রাখতে না পারলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং সামরিক সক্ষমতাও হ্রাস পাবে। বাণিজ্যনীতি, জ্বালানিনীতি, পরিবহণনীতি, সমুদ্রনীতি, ইত্যাদি আরও অনেক কিছুই এর মাঝে পড়ে যাবে।

ইলেকট্রনিক্স শিল্প, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক্স শিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, অটোমোবাইল শিল্প, জাহাজ-নির্মাণ শিল্প, এরোনটিক্যাল শিল্প, মহাকাশ শিল্প, অবকাঠামোগত শিল্প, ইত্যাদি গড়ে না উঠলে সামরিক সক্ষমতা তৈরি হবে না কখনোই।



  ৪. মূল শিল্পগুলিকে উন্নত না করলে সামরিক সক্ষমতা কখনোই তৈরি হবে না; অন্যের উপরে নির্ভরশীল থাকতে হবে। যেমন – স্টিল, এলুমিনিয়াম, কপার, ইত্যাদি মেটাল ইন্ডাস্ট্রি উন্নত করতে না পারলে সামরিক শিল্প গড়ে উঠবে না। ইলেকট্রনিক্স শিল্প, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক্স শিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, অটোমোবাইল শিল্প, জাহাজ-নির্মাণ শিল্প, এরোনটিক্যাল শিল্প, মহাকাশ শিল্প, অবকাঠামোগত শিল্প, ইত্যাদি গড়ে না উঠলে সামরিক সক্ষমতা তৈরি হবে না কখনোই। শিল্পনীতি তাই দেশের নিরাপত্তার জন্যে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

উপরে যে কথাগুলি আলোচনা করেছি, সেগুলি সর্বদাই দেশের শত্রুর জন্যে টার্গেট থাকবে। এর আগে সবিস্তারে লিখেছি যে একটা দেশকে কিভাবে দুর্বল করা হয়। সেখানে বলেছিলাম যে আদর্শিক আক্রমণে কিভাবে একটি দেশকে দুর্বল করে ফেলা হয়। এখানে যেগুলি লিখেছিল সেগুলি একটা দেশের material power-এর সাথে সম্পর্কিত। এগুলি ঠিকমতো পরিচালনা করতে না পারলে রাষ্ট্র দুর্বল থাকবে।

একটা দেশের নিরাপত্তা দরকার হয় কেন? কারণ তার কিছু একটা রক্ষা করতে হয়। সেটা কি? সেটা হচ্ছে দেশের ভিত্তি; একটা চিন্তা। সেই চিন্তাকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, নিরাপত্তা দেয় এবং বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়। সেটাই হচ্ছে রাষ্ট্রের লক্ষ্য। এই লক্ষ্যে বাধা আসবেই। কারো পৌষ মাস; কারো সর্বনাশ! সেই বাধা অতিক্রম করার জন্যেই রাষ্ট্রের physical নিরাপত্তা দরকার হয়। এই নিরাপত্তার মাঝে সামরিক-বেসামরিক কোন ব্যাপার নেই। সেই ব্যাপারটা তৈরি করা মানেই রাষ্ট্রের লক্ষ্যকে আঘাত করা। নিরাপত্তা না থাকলে রাষ্ট্রের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে না। আর চিন্তা না থাকলে রাষ্ট্র হবে লক্ষ্যহীন; অর্থহীন। 

Wednesday, 9 November 2016

হুভার ড্যাম এবং পদ্মা সেতু - "Strategic Springboard'

১০ই নভেম্বর ২০১৬

  
হুভার ড্যাম তৈরি করেছিল সেই আমেরিকা, যা কিনা ড্যাম তৈরি করার পাঁচ বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, এবং আরও চার বছরের মাথায় পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী দেশরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। এই স্থাপনা মার্কিনীদের material power-এর সক্ষমতার জানান দিয়েছিল। আর মার্কিনীরাও তাদের ক্ষমতাকে নতুন করে টের পেয়েছিল।


যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো নদীর উপরে ১৯৩০-এর দশকে নির্মিত হয়েছিল হুভার ড্যাম বা হুভার বাঁধ। সেসময়ের চরম অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার পেছনে এই বাঁধের গুরুত্ব ছিল বিপুল। হাজার পাঁচেক মানুষ এখানে কাজ করেছিল, যাদের থাকার জায়গা দিতে সেখানে একটা শহর তৈরি করা হয়েছিল। ৩৩ লক্ষ কিউবিক মিটার কনক্রিট ব্যবহার করা হয়েছিল এতে; ব্যবহার করা হয়েছিল অনেক নতুন নতুন প্রযুক্তি, যা কিনা এর আগে কোনদিন ব্যবহার করা হয়নি। ১৯৩৬ সালে বাঁধটি যখন চালু করা হয়, তখন এটি ছিল পৃথিবীর সবচাইতে বড় কনক্রিট স্থাপনা। বাঁধ ১,৩৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুত উতপাদন করে সেই বিদ্যুত বিক্রি করে বাঁধের ঋণ শোধ করা হয়েছিল। বাঁধের মূল সুফল পেয়েছিল ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ। ১০ লক্ষ একর চাষের জমিতে সেচের ব্যবস্থা হয়েছিল। ছয়টি মার্কিন কোম্পানি একত্রিত হয়ে বাঁধটি তৈরি করে এমন সময়, যখন পুরো পশ্চিমা বিশ্বে কাজের হাহাকার চলচিল। হ্যাঁ, এগুলি অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক সুফল বয়ে এনেছিল। কিন্তু হুভার ড্যাম কি আসলেই শুধুমাত্র একটা অর্থনৈতিক স্থাপনা ছিল? আজ কিন্তু এই ড্যামের চাইতে অনেক বড় বড় ড্যাম তৈরি হয়ে গেছে? এটাকি তাহলে আজ গুরুত্বহীন? এই ব্যাপারটা বুঝতে হলে একটু ভিন্ন দিক থেকে চিন্তা করে দেখতে হবে।
    
যারা ১৯৩০-এর দশকে হুভার ড্যাম বানিয়েছিলেন, তারাই ১৯৪০-এর দশকে হাজার হাজার জাহাজ তৈরি করেছিল বিশ্বযুদ্ধে জয়ের জন্যে। হুভার ড্যাম আমেরিকা এমন কিছু দিয়েছিল, যা তাদের ছিল না - বিশ্ব পরিচালনার আত্মবিশ্বাস।

হুভার ড্যাম থেকে গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার

হুভার ড্যাম তৈরি করেছিল সেই আমেরিকা, যা কিনা ড্যাম তৈরি করার পাঁচ বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, এবং আরও চার বছরের মাথায় পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী দেশরূপে আবির্ভূত হয়েছিল। চীনের ইয়াংজি নদীর উপরে তৈরি Three Gorges Dam দেখে সারা বিশ্বের মানুষ যেমন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল, হুভার ড্যাম তার চাইতে কয়েক গুণ বেশি প্রভাব ফেলেছিল। এই স্থাপনা মার্কিনীদের material power-এর সক্ষমতার জানান দিয়েছিল। আর মার্কিনীরাও তাদের ক্ষমতাকে নতুন করে টের পেয়েছিল। এই ক্ষমতার আস্বাদন পুরোপুরি পেতে অবশ্য তাদেরকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জেতা অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হুভার ড্যাম ছিল একটা Springboard, যার উপরে পা দিয়ে তারা এক লাফে মহাসাগর পাড়ি দিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে আমেরিকানদের রাজি করানোটা খুবই কঠিন ছিল। তারা মনে করতো যে ওটা ইউরোপিয়ানদের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ নয়। দুনিয়াটাকে মার্কিনীরা তখনও তাদের করে নিতে শেখেনি। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও একই ঘটনা ঘটেছিল। যখন হিটলার পুরো ইউরোপ দখল করে নিচ্ছিল, তখন মার্কিনীরা চেয়ে চেয়ে দেখছিল। শুধুমাত্র জাপানের আক্রমণই মার্কিনীদের যুদ্ধে নামিয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই জানতেন যে মার্কিনীদের যুদ্ধে জড়াতেই হবে। আর কেউ কেউ আবার মনে মনে খুশিই হয়েছিলেন যে জাপানীর মার্কিনীদের আক্রমণ করে বসেছিল – কারণ তারা মনে করতেন যে জাপানীরা আক্রমণ না করলে তো এই অলস মার্কিনীদের দিয়ে মহাসাগর পাড়ি দেয়ানো যাবে না। কিন্তু মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুদ্ধ করতে পারার মতো মানসিক সক্ষমতা তাদেরকে দিয়েছিল সেই হুভার ড্যাম। এই ড্যাম মার্কিনীদের সেই আত্মবিশ্বাস গড়ে দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাম হয়ে যায় গণতন্ত্রের অস্ত্রাগার (Arsenal of Democracy)। হুভার ড্যাম তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখা মার্কিন ব্যবসায়ী হেনরি জে. কাইজার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বিরাট সংখ্যক জাহাজ নির্মান করেন। তার শিপইয়ার্ডে ৮০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। হুভার ড্যাম কাইজারের মতো আরও অনেক লোক তৈরি করেছিল, যারা পরবর্তীতে বিশ্বযুদ্ধ জয়ে বিরাট অবদান রেখেছিল।
  
হুভার ড্যাম এখন অনেক পুরোনো কথা। সেই ড্যাম এখন আর আমেরিকানদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় না। ফেসবুক সেলফি, কিম কার্দাশিয়ান, বা WWE Wrestling এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প-হিলারির প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট-এ এন্টারটেইনমেন্ট না থাকলে মানুষ সেটা দেখে না।

অধঃপতনের পথে….

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের চিন্তাগুলিকে material রূপ দিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল হুভার ড্যাম এবং তার ঠিক পরবর্তী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তখন ছিল মার্কিন চেতনার উচ্ছ্বাসের সময়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে টানা ৪৫ বছর ঠান্ডা যুদ্ধের মাঝ দিয়ে এই চেতনার উল্লম্ফন আমরা দেখেছি। প্রযুক্তিগত উত্তরণের পথে তারা বিরাট সাফল্য দেখিয়েছে। তখন ছিল আদর্শিক যুদ্ধের চরম অবস্থা; জিততে না পারলে জীবনটাই বৃথা। সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেল ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর। আফগানিস্তানে হঠাত যুদ্ধে হেরে যাবার ফলাফল যে এটা হতে পারে, তা ছিল সকলের কল্পনার বাইরে। রাতারাতি মার্কিনীরা সেই শত্রুকে হারালো, যার ভয় দেখিয়ে তারা শিশুদের ঘুম পাড়াতো, ব্যাংকার-স্টক ব্রোকারদের সামরিক ট্রেনিং দিতো, মাল্টিবিলিয়ন ডলার খরচ করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতো। শত্রু নাই তো অস্ত্রের উদ্দেশ্যও নাই। ২০০১ সাল থেকে অফিশিয়ালি এমন এক শত্রুকে মার্কিনীরা ধরে নিয়ে এলো, যার আসলে কোন শারীরিক অস্তিত্ব নেই। যার অস্তিত্ব নেই তাকে তারা মারবে কি করে? এখানেই হয়ে গেল সমস্যা। এই শত্রুকে মার্কিনীরা খুঁজে পাচ্ছে না; বুঝতে পারছে না। একুশ শতকের আমেরিকা এগুলি বুঝতে পারছে না। হুভার ড্যাম এখন অনেক পুরোনো কথা। সেই ড্যাম এখন আর আমেরিকানদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যায় না। ফেসবুক সেলফি, কিম কার্দাশিয়ান, বা WWE Wrestling এখন তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প-হিলারির প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট-এ এন্টারটেইনমেন্ট না থাকলে মানুষ সেটা দেখে না। অনুষ্ঠানের টিআরপি বেশি গুরুত্বপূর্ণ; ব্যবসা তো করতে হবে তাই না? অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়; কি আর করা? এই আমেরিকা এখন আর কিসিঞ্জার-ব্রেজিনস্কিদের মতো মারদাঙ্গা আদর্শিক চিন্তাবিদদের রাষ্ট্র নয়

চিন্তার অধঃপতনের সাথে সাথে material power-এরও অধঃপতন হয়েছে। এই মুহুর্তে পৃথিবীর কোথাও আরেকটা যুদ্ধে জড়িয়ে গিয়ে সেখান থেকে সফলভাবে বের হয়ে আসার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। তার অর্থনীতি এখন আমদানি-নির্ভর। তারা এখন তেমন কিছুই তৈরি করে না; সব আমদানি করে। এমনকি গণতন্ত্রের অস্ত্রাগারের অবস্থাও এখন খারাপের দিকে। একটা যুদ্ধবিমান (F-35) এবং একটা যুদ্ধজাহাজ (Littoral Combat Ship) ডিজাইন করতে গিয়ে তাদের যা অবস্থা হয়েছে, তাতে এটা অস্ত্রাগার থেকে কোন একসময় ভাগাড়ে রূপ নিতে পারে। অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বের ভাগাড়-সদৃশ প্রতিযোগিতাই দেখিয়ে দিয়েছে তারা কোন দিকে যাচ্ছে। একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তির করুণ চেহারা দিনে দিনে ফুটে উঠছে। ক’দিন আগেই ফিলিপাইনকে হারিয়েছে তারা। এর আগে হারিয়েছে থাইল্যান্ডকে। এই দুই দেশই ছিল তাদের বহুকালের স্যাটেলাইট দেশ। বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিনীরা “বন্ধু” দেশের উপরে নির্ভর করছে পুলিশম্যানের কাজ করার জন্যে। এই আমেরিকা হুভার ড্যামের আমেরিকা নয়। এই আমেরিকা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতি-ধর্ম বিদ্বেষযুক্ত কটূক্তিতে আসক্ত আমেরিকা। তবে হুভার ড্যামের একটা ব্যাপারের সাথে এখানে মিল পাওয়া যাবে – সেই ড্যাম তৈরিতে মাত্র ৩০ জন কালো চামড়ার মানুষকে নেয়া হয়েছিল। এটাই বলে দেয় যে মার্কিন সভ্যতা কিসের উপরে প্রতিষ্ঠিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প একুশ শতকে ওই ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতারই হাল ধরতে যাচ্ছেন।
   
পদ্মা সেতুর মাঝে তারা বঙ্গোপসাগরের ফানেলের গোড়ায় একটা Springboard দেখতে পাচ্ছিল; তারা দেখতে পাচ্ছিল হুভার ড্যামের প্রতিচ্ছবি। পদ্মা সেতু ভারত মহাসাগরে একটা ভূমিকম্পের জন্ম দেবে, যার থেকে সৃষ্ট সুনামি পুরো মহাসাগরের উপকূল ছাপিয়ে যাবে। রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসকে উঠিয়ে ধরতে এই সেতু যে কাজটি করবে, তা পরিমাপ করা দুষ্কর। এই Springboard জন্ম দেবে এমন আরও অনেক Springboard-এর।

হুভার ড্যাম এবং পদ্মা সেতু

এখন আসি আমাদের কথায়। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির কেলেংকারির কথা যখন তুঙ্গে, তখন না বুঝলেও এখন মানুষ বুঝতে পারছে যে আলোচনার বিষবস্তু আসলে ছিল এই সেতু তৈরিতে দুর্নীতি হয়ছিল কিনা সেটা নয়, বরং এই সেতু আদৌ তৈরি হবে কি হবে না, সেটা। তারা এই প্রশ্নটি তুলেছিল, কারণ তারা বঙ্গোপসাগরের ফানেলের গোড়ায় একটা Springboard দেখতে পাচ্ছিল; তারা দেখতে পাচ্ছিল হুভার ড্যামের প্রতিচ্ছবি। পদ্মা সেতু ভারত মহাসাগরে একটা ভূমিকম্পের জন্ম দেবে, যার থেকে সৃষ্ট সুনামি পুরো মহাসাগরের উপকূল ছাপিয়ে যাবে। রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসকে উঠিয়ে ধরতে এই সেতু যে কাজটি করবে, তা পরিমাপ করা দুষ্কর। এই Springboard জন্ম দেবে এমন আরও অনেক Springboard-এর। এর আগের লেখায় একটা Springboard নিয়ে আলোচনা করেছি, যা কিনা বহুদূর নিয়ে যেতে পারে খুব অল্প সময়ের মাঝেই।

চিন্তার উত্তরণ নিয়ে অনেক লিখেছি। এখন চিন্তাকে material রূপ দেয়ার সময়। Material Progress-এর পথে যতো বাধা আসবে সব সাফ করতে হবে কঠোরভাবে। যারা গুলশানের রক্তাক্ত ঘটনা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের পরেও বুঝে উঠতে ব্যর্থ হচ্ছেন যে আসল টার্গেট কারা, তারা হয়তো কখনোই বুঝবেন না। বুঝতে বাকি থাকা উচিত নয় যে এই জঘন্য ব্যাপারগুলি ঘটানো হচ্ছে ভারত মহাসাগরে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঠেকাতে। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলি যখন মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চোখের পানি ফেলছে, তখন প্রশ্ন করতেই হয় যে “তাদের নেতা” কি আসলেই “আমাদের নেতা” কিনা? তারা এমন চিন্তা করে কারণ স্ট্যাচু অব লিবার্টি তাদের তীর্থ। প্রভূর সুখ-দুঃখের ভাগীদার হতে তাধিং তাধিং করে নাচতে নাচতে সাত-সমুদ্র তারা পাড়ি দিয়ে দেয়; বাংলাদেশের জন্যে তারা একটা নদী বা খালও পাড়ি দেবে না। তাদের জন্যে পদ্মা সেতু Springboard নয়, বরং হুভার ড্যামের প্রতিযোগী। পদ্মা সেতুতে তারা ভারত মহাসাগরে মার্কিন কর্তৃত্বের ধ্বংসের ছায়া দেখতে পায়। আর ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্ব হারানোর চিন্তায় মার্কিনীদের সারা দুনিয়ার উপরে কর্তৃত্ব ছুটে যায়; ঘুম হারাম হয়। আটলান্টিকের ওপারের ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্রের নেতৃত্ব আমাদের জন্যে কাঁসার পাতে কয় দানা বাশি ভাত রেখেছে, সেটা আজ আমাদের চিন্তা নয়। বরং চিন্তা হচ্ছে আর কি কি Springboard আমরা নিয়ে আসবো, যা কিনা আমাদের material শক্তিকে অপ্রতিরোধ্য গতি দেবে।

Sunday, 30 October 2016

আর্জেন্টিনার মেসির মুখে বাংলার বাঘ?

৩০শে অক্টোবর ২০১৬
তারা জানবে একুশ শতকের বাঘের নাম, যে কিনা শুধু গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ত্রাসই নয়, মহাসমুদ্র সাঁতড়ে দুনিয়ার অপর প্রান্তে গিয়ে তার অবস্থান জানান দিতে পারে!



চিন্তার নিয়ন্ত্রণ


বাংলাদেশকে এদেশের মানুষ কেমন দেশ হিসেবে তুলে ধরবে, সেটা নির্ভর করবে দেশের মানুষ দেশ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থে কি বিশ্বাস করে। অর্থাৎ নিজেকে কিভাবে মূল্যায়ন করে। এই মূল্যায়ন কিভাবে হবে, সেটা নির্ভর করবে দেশের সমাজ দেশের মানুষকে কি ধরনের চিন্তা দিচ্ছে। চিন্তাকে মানুষের মস্তিষ্ক পর্যন্ত পৌঁছে দেয়াটা অনেকভাবেই করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে মিডিয়া যেন সবসময় এগিয়েই থাকে। ঊনিশ শতকে ছাপা মিডিয়া আসার পর, আর বিংশ শতকের শুরুতে ইলেকট্রনিক মিডিয়া আসার পর মিডিয়ার গুরুত্ব শুধুই বেড়েছে। আর মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে পারার ক্ষমতা মিডিয়াকে শুধু শক্তিশালীই করেনি, তৈরি করেছে শক্তিশালী জাতি-গোত্র-ব্যক্তির যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলে দিনরাত যুদ্ধ। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা চায় না মিডিয়া তাদের চিন্তা ছাড়া অন্য কোন চিন্তা প্রচার করুক, আর যারা ক্ষমতা থেকে দূরে, তারা চায় মিডিয়ার দখল নিতে। বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরে নয়; তাই বাকি পৃথিবীর নিয়মকানুন (সে যতই অপ্রীতিকর হোক না কেন) বাংলাদেশেও দৃশ্যমান। এলাকাভিত্তিক এবং দেশভিত্তিক পার্থক্য থাকলেও মূলতঃ পার্থক্য সামান্যই। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে আমরা একই ধরনের চিন্তার প্রসার দেখি। খুব কম মানুষই প্রশ্ন করে যে একই চিন্তা মানুষের মাঝে এলো কোত্থেকে? একটা সুন্দর ব্যাখ্যা অবশ্য দাঁড় করানো হয়ে থাকে, যাকে আদর করে নাম দেয়া হয়েছে গ্লোবালাইজেশন। অবশ্য যারা এর সৃষ্টি করেছেন, আজ তারাই প্রশ্ন তুলছেন যে এটা কার নিয়ন্ত্রণে। নিয়ন্ত্রণ – সেটাই কি আসল উদ্দেশ্য ছিল না? সেটা নিয়েই আজকের এই কথা।

কিছু শক্তিশালী মিডিয়া আমাদের দেশে এই নিয়ন্ত্রণমূলক কর্মকান্ডই করে যাচ্ছে। মানুষকে নিয়ন্ত্রণমূলক চিন্তা দিলে মানুষ নিয়ন্ত্রণে থাকবে – এটাই হলো মূল কথা। মানুষের চিন্তার একটা লিমিট ঠিক করে দেয়া। যারা সৃজনশীল কাজ করেন, তারা হয়তো মনে করতে পারেন যে অনেক ক্রিয়েটিভ কাজ করার সুযোগ তারা পাচ্ছেন। তবে ব্যাপারটা আসলে কি তাই? একজন সৃজনশীল মানুষকে যখন বলা হচ্ছে কিছু একটা ডিজাইন করে দিতে, তিনি তার সবটুকু সৃজনশীলতা নিংড়ে সেটা ডিজাইন করে দিচ্ছেন। খুব ভালো কথা; ক্রিয়েটিভ আউটপুট। কিন্তু তিনি একবারও প্রশ্ন করেননি যে, যেটা নিয়ে ডিজাইন করতে বলা হলো, সেটাকে কেন নির্বাচন করা হয়েছে। এই প্রশ্নটা যাতে তিনি না করেন, সেই ব্যবস্থাটার নামই হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ। আমাদের দেশের বেশ কিছু শক্তিশালী মিডিয়া সেই কাজটাই করে।

প্রতিদিনের সকালটা নষ্ট করে দেয়া…

প্রায় প্রতিদিনই একটা করে খবর আসে, যা কিনা মানুষের প্রতিদিনের সকালটা নষ্ট করে। একটা মানুষ যখন সকালে একটা বাজে চিন্তা দিয়ে দিন শুরু করে, তার সারাদিন কেমন যাবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একটা মানুষের সকালটায় তার চিন্তার ভিত্তিটাকে দুর্বল করে দেয়া গেলে সে সারাদিন আর শক্তিশালী কোনকিছু দিতে পারবে না – এটাই হলো সেই চিন্তার ভিত, যদি না সে দিনের মাঝে অন্য কোন উতস থেকে শক্তিশালী কিছু পেয়ে যায়। উদাহরনস্বরূপ, প্রতিদিনই খবর ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন সূচক বা ইনডেক্স নিয়ে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান হয় ১১০ নম্বরে, নতুবা ১৪০, অথবা একেবারে ১৭৬। যে মানুষটা এই সূচকে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে সারাদিনে দেশের সম্পর্কে পজিটিভ চিন্তা করতে পারবে না। তার মাথায় শুধু থাকবে আজকের দিনের কাজটা শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারলেই হলো। আগামীকাল বা পড়শু আরও উপরে থাকবো, বা এক মাস পর আজকের অবস্থান থেকে উপরে থাকতেই হবে – এধরনের কোন চিন্তা থাকবে তার জন্যে সেকেন্ডারি। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পদ্ধতি এটা, যার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান সবসময় ১১০ বা ১৪০ বা ১৭৬ই থাকবে, কোনদিনই এগুবে না। যদি কখনো এগিয়েই যাই, তাহলে নিয়মগুলি পরিবর্তন করা হবে সূচকে আবারো আগের অবস্থানে ফেরত আনতে। এটাই নিয়ন্ত্রণ।

যা সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখা হয়…

এসব সূচক যাদের তৈরি, তাদের নিজেদের তৈরি করা কিছু সূচকই আবার গোপন রাখা হয়; বাকিগুলি সামনে আনা হয়। যেমন কয়জন জানেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতি কাজাকস্তান, গ্রীস, পর্তুগাল, রোমানিয়া, চেক রিপাবলিক, হাঙ্গেরী, পেরুর মতো আরও অনেক দেশের অর্থনীতি থেকে বড়? কয়জন জানেন যে ভারত মহাসাগরে সমুদ্রসীমা থাকা দেশগুলির মাঝে কয়টি দেশের অর্থনীতি ২২০ বিলিয়ন ডলার বা তার চাইতে বেশি? আর কয়টি দেশ আছে, যাদের অর্থনীতি ২০০ বিলিয়ন ডলারের উপরে এবং একইসাথে যাদের জনসংখ্যা ১০০ মিলিয়নের বেশি? কয়টি দেশে বৃষ্টিপাতের আধিক্য আছে এবং একইসাথে তিন-তিনটি প্রধান নদীর সংগমস্থলে তিন-তিনটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে, যা কিনা নদীপথে (সবচাইতে সস্তা যোগাযোগ ব্যবস্থা) দেশের অভ্যন্তরের সাথে সরাসরি সংযুক্ত? কয়টি দেশ আছে পুরো দুনিয়াতে, যেখানে প্রাকৃতিকভাবে দেশের স্থলভাগ প্রতি বছর বড় হচ্ছে? কয়টি দেশ আছে, যেখানে প্রায় পুরো দেশই চাষযোগ্য? কয়টি দেশের জনগোষ্ঠীকে ভৌগোলিকভাবে ভাগ করা সম্ভব নয় (অর্থাৎ জনগণ কতটা homogenous)? এগুলির সাথে এখন ২২০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি যোগ করুন তো? এটাই কি প্রতিদিনের সংবাদ হওয়া উচিত ছিল না?

উপরে যে কয়টি দেশের নাম উল্লেখ করেছি, তার মধ্যে কাজাকস্তান একটি স্থলবেষ্টিত দেশ, যার সমুদ্র পর্যন্ত যেতে রাশিয়ার সহায়তা লাগে। হাঙ্গেরী এবং চেক রিপাবলিকেরও একই অবস্থা। রোমানিয়ার খোলা সমুদ্রে যেতে তুরস্কের অনুমতি লাগে। এই দেশগুলির বেশ কতগুলির সামনের দিনের অর্থনীতি আশাব্যাঞ্জক নয়; জনসংখ্যা কমে যাচ্ছে; অগ্রগতি ঋণাত্মক। আর বাংলাদেশ গত দুই দশকে পিছনে তাকায়নি। সারা দুনিয়ার অর্থনীতি দুইবার উঠেছে, দুইবার নেমেছে; অথচ বাংলাদেশের এতে যেন কিছুই হয়নি। বাংলাদেশের অর্থনীতি খুব শীঘ্রই ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এবং চিলির অর্থনীতিকে অতিক্রম করতে যাচ্ছে। আইএমএফ-এর হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি পৃথিবীর ৪৬তম। কিন্তু এখানে আঞ্চলিক ব্যাপারগুলিকে জুড়ে দিলে হিসেব পালটে যাবে। যেমন বাংলাদেশ একইসাথে পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার সাথে সমুদ্রপথে সবাসরি যুক্ত এবং এদের সকলের একেবারে মধ্যিখানে। এই অঞ্চলগুলিতে যেতে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক bottleneck বাইপাস করতে পারে। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে এই সক্ষমতা আরও বাড়বে। বর্তমান দুনিয়াতে ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র হচ্ছে ইউরেশিয়া+আফ্রিকা। বাংলাদেশ এই কেন্দ্রের যতটা কাছে অবস্থিত, ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলি সেই তুলনায় দূরে; সরাসরি সমুদ্র যোগাযোগ নেই বা তেমন ভালো নয়। অনেকগুলি আঞ্চলিক bottleneck তাদের অতিক্রম করতে হয়। ভারত মহাসাগর এখন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মহাসাগর। এই মহাসাগরের সাথে সরাসরি যুক্ত কয়টি দেশের অর্থনীতি ২২০ বিলিয়ন ডলারের উপরে এবং জনসংখ্যা ১৬০ মিলিয়নের উপরে? উপরে যে শক্তিশালী ফ্যাক্টরগুলি উল্লেখ করেছি সেগুলি যোগ করে দিই এর সাথে? এখন এই দেশকে কতটা দুর্বল মনে হচ্ছে?
 
বাংলাদেশে এসে মেসি হয়তোবা তার জনপ্রিয়তাটা কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। তবে সেটা বাংলাদেশের প্রমোশনের জন্যে যথেষ্ট কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। মেসিই হতে পারে বাংলাদেশের সেই brand ambassador যাকে আর্জেন্টিনার মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষ উভয়েই পছন্দ করে।

বাংলাদেশের লিওনেল মেসি…

এর আগে আফ্রিকা নিয়ে লিখেছিলাম। আফ্রিকা আমাদের থেকে অনেক দূরে – এটাই হচ্ছে সেই নিয়ন্ত্রণমূলক subversion. প্রকৃতপক্ষে যা আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, তার কোন দূরত্ব নেই, বিশেষতঃ যখন আমাদের ভূকৌশলগত অবস্থান এতটা শক্তিশালী। এই অবস্থানকে অস্বীকার করা মানেই সেই নিয়ন্ত্রকের ফাঁদে পা দেয়া। তারা এটাই চায় – সারাজীবন তাদের পা ধরে বসে থাকতে হবে আমাদের; অথর্ব দেশ; ব্যর্থ রাষ্ট্র। এগুলি গীত শোনার সময় এখন আর আমাদের নাই। এখন সময় চিন্তা করার লিওনেল মেসিকে নিয়ে। মেসির আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশের সয়াবিন আসে। ব্রাজিল থেকে আমাদের ৮৬% চিনি আমদানি হয়। চিলি থেকে আসে কপারের একটা অংশ, যা দিয়ে এদেশের সকল প্রকার ইলেকট্রিক্যাল তার এবং যন্ত্রপাতি তৈরি হয়। বাংলাদেশের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ইকুয়েডরে জাহাজ রপ্তানি করেছে। আরও অনেক সুযোগ অপেক্ষা করছে সেখানে আমাদের জন্যে। মেসি আমাদের কাছে ল্যাটিন আমেরিকার প্রতিনিধি, যাকে পরিচয় করানোর কিছু নেই। কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষ কি জানে এখানে মেসির জনপ্রিয়তা কতটুকু? ব্রাজিলের মানুষ কি জানে এখানে মানুষ বিশ্বকাপের সময় তাদের দেশের পতাকা তৈরি করে (যদিও বানাতে গিয়ে ভুল হয়)? আমরা আর্জেন্টিনার মানুষের জন্যে মেসিকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করি না কেন, যা আর্জেন্টিনার মানুষের সাথে বাংলাদেশকে পরিচয় করিয়ে দেবে? তাদের দেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশকে নতুন করে চেনাবার চেষ্টা করি না কেন আমরা? মেসিই হতে পারে বাংলাদেশের সেই brand ambassador যাকে আর্জেন্টিনার মানুষ এবং বাংলাদেশের মানুষ উভয়েই পছন্দ করে।
 
ব্রাজিলের নৌবাহিনীর সাথে আমাদের নৌবাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে লেবাননের উপকূলে কাজ করছে। এতদিনে ব্রাজিলের নৌবাহিনীর প্রায় সবাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নাম জেনে গেছে। কাজেই যেদিন ব্রাজিলের কোন বন্দরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজের ফ্লোটিলা শুভেচ্ছা সফরে যাবে, সেদিন সেখানে তারা পুরোনো অনেক বন্ধুকেই খুঁজে পাবে। কোটি কোটি টাকা ভারতীয় নর্তক-নর্তকীদের পেছনে না ঢেলে মেসির আর্জেন্টিনাতে আর ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শুভেচ্ছা সফরের পেছনে ঢাললে একটা গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-কৌশলগত দুয়ার খুলে যাবে।

আমরা কেন ব্রাজিলিয়ানদের বলি না যে বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশে ফুটবল খেলা নিয়ে যে পাগলামি হয়, সেটা তাদের মিডিয়াতে নিয়ে আসতে? এই দেশগুলির মানুষের কাছে বাংলাদেশকে কিভাবে তুলে ধরা হয়েছে সেটা আমরা না জানলেও অনুমান করতে পারি – খুব একটা ভালো কিছু না। ব্রাজিলের নৌবাহিনীর সাথে আমাদের নৌবাহিনী বেশ কয়েক বছর ধরে লেবাননের উপকূলে কাজ করছে। এতদিনে ব্রাজিলের নৌবাহিনীর প্রায় সবাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নাম জেনে গেছে। কাজেই যেদিন ব্রাজিলের কোন বন্দরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজের ফ্লোটিলা শুভেচ্ছা সফরে যাবে, সেদিন সেখানে তারা পুরোনো অনেক বন্ধুকেই খুঁজে পাবে। ব্রাজিলের নৌবাহিনী অনেক পুরোনো; তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ওই এলাকা সম্পর্কে শিখতে পারবো। আর একইসাথে আমাদের দেশের নাম সেখানে জানিয়ে আসা ছাড়াও আমাদের দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প সম্পর্কে ল্যাটিন আমেরিকায় একটা জানান দিয়ে আসতে পারবো আমরা। কোটি কোটি টাকা ভারতীয় নর্তক-নর্তকীদের পেছনে না ঢেলে মেসির আর্জেন্টিনাতে আর ল্যাটিন আমেরিকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শুভেচ্ছা সফরের পেছনে ঢাললে একটা গুরুত্বপূর্ণ মহাদেশে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-কৌশলগত দুয়ার খুলে যাবে। তারা জানবে একুশ শতকের বাঘের নাম, যে কিনা শুধু গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ত্রাসই নয়, মহাসমুদ্র সাঁতড়ে দুনিয়ার অপর প্রান্তে গিয়ে তার অবস্থান জানান দিতে পারে!

কূপমুন্ডুক চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার সময় হয়েছে আমাদের। মেসির মাঝে শুধু আবেগ না খুঁজে বাংলাদেশকে খুঁজতে হবে। দেশকে এবং দেশের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করতে হলে “দুর্বল দেশ” চিন্তা পরিত্যাগ করতে হবে। দূরত্ব কোন বাধা নয়; রবার্ট ক্লাইভের কাছে অষ্টাদশ শতকে দূরত্ব বাধা হয়নি। অথচ আমাদের মাথায় ঠিকই সেটা গুঁজিয়ে দিয়েছে তারা। বাংলাদেশের মানুষকে তারা বারংবার মনে করিয়ে দেয় যে দেশটা গরীব; অথচ ২০ কোটি অভুক্ত মানুষের দেশকে বলে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী ভারত। পশ্চিমা প্রেসক্রিপশনে দেশ চালাবার সময় বহু আগেই গেছে। এখন এগুলি নিয়ে পত্রিকায় হাহুতাশ দেখলে হাসিই পায়। ভারত মহাসাগরে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অবস্থানে থেকে মিউ মিউ করার সময় এখন নয়। শক্তিশালী দেশের মানুষ হাহুতাশ করে না; বাঘের গর্জন দেয়।

Monday, 24 October 2016

আমাদের শিল্পোন্নয়নের “হার্ট” কোথায়?

একটা ইঞ্জিনের মূল বডি এটা, যাকে ইঞ্জিন ব্লক বলে। এর উপরে ছিদ্রগুলি দিয়ে ঢুকে লাইনার, আর লাইনারের মধ্যে দিয়ে ওঠানামা করে পিস্টন। আমরা এখন লাইনার এবং পিস্টন তৈরি করি। ইঞ্জিনটার বাঁ পাশে দু'টা বড় ছিদ্র দেখা যাচ্ছে, যার নিচেরটা দিয়ে ক্র্যাংকশাফটের একটা অংশ বের হয়ে থাকে। এই শাফট-এর মাধ্যমেই মেকানিক্যাল শক্তি ইঞ্জিন থেকে বাইরে বের হয়। এই ইঞ্জিনই হচ্ছে শিল্পোন্নয়নের "হার্ট"
২৪শে অক্টোবর ২০১৬

হার্ট ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না, ঠিক তেমনি ইঞ্জিন ছাড়া এই একুশ শতকে কোন দেশ উন্নতি করতে পারে না। হার্টের মতোই একটি ইঞ্জিন অন্য সকল কিছুকে চালাতে থাকে। হার্ট যেভাবে ধমনীর মাধ্যমে রক্ত পাম্প করে, ঠিক তেমনি ইঞ্জিন মেকানিক্যাল শক্তিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানোর ব্যবস্থা করে অসার বস্তুতে প্রাণ এনে দেয়। বাংলাদেশে ইঞ্জিনের সবচাইতে বেশি ব্যবহার যেসব স্থানে, তার মাঝে সামনের সাড়িতে রয়েছে পানি সেচ। আমাদের প্রতিবেশীরা পঞ্চাশোর্ধ সংখ্যক নদীর উপরে উজানে বাঁধ দিয়ে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পরেও গত কয়েক দশকে কৃষিতে যে বিপ্লব ঘটে গেছে, তার মূলের কারণগুলির মাঝে একটি হলো এই পানি সেচ। নদী ড্রেজিং করা হয়নি প্রায় চার দশক ধরে (কিছুদিন আগে যা শুরু হয়েছে), যেটার কারণে খাল কেটেও পানির সংকুলার হয়নি; বর্ষার পর বৃষ্টির পানি আর অবশিষ্ট ছিল না। কাজেই পানির যোগাড় হয়েছে মাটি খুঁড়ে। যদিও এটা মোটেই ভালো কোন পদ্ধতি নয়, তারপরেও এটা ছাড়া আর কোন পদ্ধতি তখন কারও জানা ছিল না। এই সেচের উপরে ভিত্তি করে এক বিশাল অর্থনীতি সচল রয়েছে আজ। সেচের পাম্পগুলির বেশিরভাগই ডিজেল ইঞ্জিনে চলে; কিছু চলে বিদ্যুতে। ডিজেল ইঞ্জিনের জন্যে ডিজেল সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয়েছে; বিদ্যুতের জন্যে বিশেষ সময়ে আলাদাভাবে বিদ্যুত সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ইঞ্জিনের সাথে সংযুক্ত পাম্প বিভিন্ন কারণে বিকল হয়ে যায়; সেই পাম্পগুলি মেরামত এবং পরবর্তীতে পাম্প তৈরি করার শিল্প তৈরি হয়েছে। ইঞ্জিনের লাইনার এবং পিস্টনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, যেগুলি নিয়মত বিকল হয়, সেগুলি মেরামত এবং তৈরির জন্যে শিল্প হয়েছে। পানি সরবরাহের জন্যে লোহা এবং প্লাস্টিকের পাইপ তৈরির শিল্প প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ডিজেল সরবহারের জন্যে জাহাজ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। সড়ক পরিবহণের ক্ষেত্রে ট্রাকের বডি তৈরির শিল্প দাঁড়িয়েছে। এই সবগুলি লোহার শিল্পের উপরে ভিত্তি করে আবার শিপব্রেকিং শিল্প দাঁড়িয়েছে (যদিও শিপব্রেকিং থেকে আরও অনেক শিল্প উপকৃত হয়েছে)। বিদ্যুতচালিত পাম্পের ক্ষেত্রেও অনেক কিচু ঘটেছে, তবে যেহেতু বিদ্যুতের ব্যাপারটা অনেক বড় পরিসরের আলাপ, তাই আর উল্লেখ করলাম না (তবে বৈদ্যুতিক মোটরকে বাদ দিচ্ছি না)। মোটকথা এ এক বিরাট কাহিনী – পুরোটার মূলে রয়েছে একটা কাজ – শুষ্ক মৌসুমে জমিতে পানি সেচ করা। এত্তোবড় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড; এত্তো এত্তো শিল্প গড়ে উঠলো! কিন্তু আসল জিনিস কই?? ইঞ্জিন কই?? সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সেচের কাজে নিয়োজিত রয়েছে ১৭ লক্ষ ইঞ্জিন!! যে ১৭ লক্ষ ইঞ্জিনের উপরে নির্ভর করে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে; অর্থনীতিতে লক্ষ কোটি টাকা সঞ্চালিত হয়েছে, সেই ইঞ্জিনই তো উপরের এই লিস্টের মাঝে নেই!! হার্ট নেই; হাত-পা তৈরি করে বসে আছি আমরা!! হার্টখানা আমদানি করতেই আমাদের সুখ!!
  
 একটা ইঞ্জিন তৈরির ফুল অটোমেটিক পদ্ধতির একটা ভিডিও দিয়ে দিচ্ছি প্রসেসটা বোঝার জন্য। কিছু কিছু ইঞ্জিন তৈরির ক্ষেত্রে অতটা অটোমেটেড প্রসেস নেয়া হয়না উতপাদনের সংখ্যার কারণে। তবে যেগুলি বেশি সংখ্যায় তৈরি হয়, সেগুলি অটোমেটেড প্রসেসে খরচ বাঁচে।

এত বড় বাজার বিদেশীর জন্যে?

ঊনিশ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব হয়েছিল এই ইঞ্জিনের আবির্ভাবেই। আমাদের তো আর নতুন করে সেই ইঞ্জিন আবিষ্কার করতে হচ্ছে না। আমাদের শুধু যেটা দরকার ছিল তা হলো ঐ ১৭ লক্ষ ইঞ্জিনের অন্তত কয়েক লক্ষ (পুরোটা করতে পারলে অবশ্য সমস্যা নাই) দেশে তৈরি করা। আমরা এই ইঞ্জিন তৈরি করতে পারলে আজও আমাদের মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন নিয়ে টানাটানি করতে হতো না; কয়েক লক্ষ ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার আমদানি করতে হতো না; গাড়ি বানাতে পারবো কি পারবো না, সেটাও চিন্তা করতাম না। এদেশে ইঞ্জিনের ব্যবহার মোটেই কম না – এ এক বিশাল বাজার। এর উপরেও রয়েছে ৩০ হাজারের উপরে জলযান, যেগুলি সবগুলিই ইঞ্জিনচালিত; রয়েছে ৬০ হাজারের উপরে ইঞ্জিনচালিত মাছ ধরার নৌকা। লক্ষ লক্ষ মোটরগাড়ি, লক্ষ লক্ষ মোটরসাইকেল, অজানা সংখ্যক অনান্য যানবাহন, লক্ষ লক্ষ জেনারেটর – এর প্রত্যেকটিই আমদানি করা ইঞ্জিনচালিত। এদেশের বিরাট জনসংখ্যা এই বাজারকে ধরে রাখবে বহুকাল। বিদেশীরা এই বাজার হারাতে চায় না; আর আমরাও এই বাজার বিদেশীদের হাতে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
   
 মার্সিডিস এএমজি-৬৩ ইঞ্জিনের এসেম্বলি লাইন। এখানে একজন কর্মী একাই একটা ৪-লিটার ৪৫১ হর্স-পাওয়ারের ভি-৮ (৮টা সিলিন্ডার) ইঞ্জিন এসেম্বলি করে ফেলছেন। এটা খুবই হাই-পার্ফরমেন্স ইঞ্জিন, তাই তৈরি হয় সংখ্যায় কম; কাজেই ফুল অটোমেটিক প্রসেস এখানে নেয়া হয়নি।

এই সুযোগ হাতছাড়া করার সময় এখন নয়…

ইঞ্জিন ছাড়া একটা জাতি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। উন্নয়নের এটা একটা পূর্বশর্তের মতো। (আশা করি পরবর্তী আরও কয়েকটি লেখায় এই পূর্বশর্তগুলি নিয়ে লিখবো।) বিদ্যুত ছাড়া শিল্প হয় না; জেনারেটর ছাড়া বিদ্যুত হয় না; ইঞ্জিন ছাড়া জেনারেটর হয় না। যানবাহন ছাড়া পণ্য পরিবহণ হয় না; ইঞ্জিন ছাড়া আজ যানবাহন হয় না (দয়া করে রিক্সা-বাইসেকেলের কথা মনে করাবেন না)। টাকা উঠে আসবে কি-না, এটা কোন কথা হতে পারে না। ব্রিটিশরা যখন এদেশের মানুষকে চা খাইয়েছিল, তখন এখান থেকে মুহুর্তের মাঝে টাকা উঠানোর কথা তারা চিন্তা করেনি; তারা জানতো যে টাকা একসময় এমনিতেই উঠে আসবে; কিন্তা চা খাওয়ানোর অভ্যাস না করাতে পারলে বাজারই গড়বে না। বাংলাদেশেও বহু উদাহরণ রয়েছে। একসময় এখানে টিস্যু পেপারের কোন বাজার ছিল না। সয়াবিন তেলের বদলে মানুষ সরিষার তেল দিয়ে রান্না করতো। বেবি ডায়াপারের কোন প্রশ্নই আসতো না মাত্র কয়েক বছর আগেও। মোট কথা বাজার তৈরি করা হয় পরে; আগে বাজার তৈরি করে প্রডাক্ট আনার চেষ্টা করলে সারাজীবন অন্যের পিছন পিছন চলতে হবে। একুশ শতকে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অতি-গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে এটা আমাদের অপশন নয়। ইঞ্জিন তৈরি করতে হবে; ইঞ্জিনের চাপে বাজার তৈরি হবে।
যেসব স্থানে ইঞ্জিন তৈরির বিরাট সুযোগ রয়েছে আমাদের –

১. সেচের জন্যে ডিজেল ইঞ্জিন (সেচ পাম্প)

২. পাওয়ার টিলার এবং ট্রাক্টর

৩. মোটরসাইকেল

৪. কমার্শিয়াল মোটরগাড়ি

৫. জেনারেটর

৬. মেরিন ইঞ্জিন

 এই ভিডিওখানা থেকে মোটামুটিভাবে ধারণা পাওয়া যাবে যে অলটারনেটর বা মোটর কিভাবে তৈরি করা হয়। এটা 'মডার্ন' প্রসেস। প্রসেস মডার্ন হতে পারে, কিন্তু আসলে কাজগুলি আগের মতোই আছে। সাইজে অনেক বড় হয়ে গেলেও যে একই পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়, সেটা নিচের ভিডিওতে দেখা যাবে। আর এই পদ্ধতি যে ফ্যানের মোটর তৈরি থেকে মোটেও আলাদা নয়, সেটা এর পরের ভিডিওতে দেখা যাবে।

এখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল মোটর/অলটারনেটরের উতপাদন প্রসেস বোঝা যাবে। বিরাট আকৃতির মোটর; প্রসেস দেখলে অনেক হাই-টেক ঠেকবে। কিন্তু খেয়াল করলে বোঝা যাবে সে আসলে ঐ একই পদ্ধতি।



  

এই ভিডিওতে বিআরবি ফ্যানের উতপাদন প্রসেস দেখে বুঝতে পারা যাবে যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল মোটরের উতপাদন প্রসেসের সাথে এর পার্থক্য কতটা সামান্য।
 

শিল্পোন্নয়নের আরেক ভিত্তি – বৈদ্যুতিক মোটর

উপরে লিখেছি যে ইঞ্জিন ছাড়া বিদ্যুত তৈরি হয় না। আসলে সেই ইঞ্জিনটা হলো জেনারেটরের অংশ। ইঞ্জিনটা মেকানিক্যাল শক্তি তৈরি করে; আর সেই মেকানিক্যাল শক্তি থেকে বিদ্যুত তৈরি করে অলটারনেটর (Alternator)। অলটারনেটর লাগানো থাকে ইঞ্জিনের ক্র্যাংকশাফট-এর সাথে; ইঞ্জিন ঘুরলে অলটারনেটর-এর মাঝের অংশটিও ঘুরে এবং বিদ্যুত উতপন্ন হয়। এই যন্ত্রটি (অলটারনেটর) অত্যন্ত সাধারণ একটা যন্ত্র, যা তৈরি করা খুব সহজ। এর প্রযুক্তিখানা হলো ইলেকট্রিক মোটরের ঠিক উল্টোটা। যেখানে অলটারনেটর মেকানিক্যাল শক্তি থেকে বৈদ্যুতিক শক্তি উতপাদন করে, সেখানে মোটর বৈদ্যুতিক শক্তি থেকে মেকানিক্যাল শক্তি উতপন্ন করে। যে মোটর তৈরি করতে পারে, তার কাছে অলটারনেটর একই জিনিস। আবার এই দুইটি জিনিস (মোটর এবং অলটারনেটর) আরও একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রের খুব কাছের – ট্রান্সফরমার। আমাদের দেশে যে বৈদ্যুতিক ফ্যান তৈরি হয়, তা আসলে মোটর। আর ফ্যানের এই মোটর আমাদের দেশেই তৈরি হয়। আবার বাংলাদশে খুবই উন্নত ট্রান্সফরমার তৈরি হয় (বিদেশে রপ্তানিও হয়)। অথচ কোন উদ্ভট এক কারণে যারা এই ফ্যানের মোটর বানায় বা যারা ট্রান্সফরমার বানায়, তারা কেউই অন্য কোন মোটর তৈরি করে না। ইউরোপের একটি কোম্পানি বাংলাদেশে পানির পাম্পের সাথে মোটর বিক্রি করে বিরাট ব্যবসা করে ফেললো; আর আমরা হাততালি দিয়েই ঠান্ডা থাকলাম। সেই কোম্পানি নাকি বাংলাদেশে ১০ লক্ষের বেশি মোটর বিক্রি করেছে, যার একটা বড় অংশ নিয়োজিত রয়েছে মাটির নিচ থেকে পানি তোলার কাজে। চিন্তা করে দেখুন তো বাংলাদেশে কতগুলি মাল্টি-স্টোরিড বিল্ডিং রয়েছে? এবার ভাবুন তো এই বিল্ডিংগুলির ছাদের উপরে পানির ট্যাঙ্কে পানি কি করে ওঠে? প্রত্যেক বাড়িতে পানি ব্যবস্থাপনার জন্যে একটি বা দু’টি করে পাম্প (মোটর) থাকে। সবাই যে পানি পাম্পটাকে পাম্প বলে চিনে, সেটা আসলে একটা বৈদ্যুতিক মোটর, যার শাফট-এর সাথে ইম্পেলার (Impeller) নামে একটি অতি সাধারণ যন্ত্র লাগানো থাকে, যেটিকে আসলে আমরা পাম্প বলে চিনি। (ডিজেল ইঞ্জিনের সাথে ইম্পেলার লাগালে সেটা সেই সেচ পাম্পের মতো কাজ করে।) মোটরে বিদ্যুত সংযোগ দিলে শাফট ঘোরে, অর্থাৎ মেকানিক্যাল শক্তি উতপন্ন হয়। এই মেকানিক্যাল শক্তি ইম্পেলারকে ঘোরালে মেকানিক্যাল শক্তি হয়ে যায় হাইড্রলিক শক্তি, অর্থাৎ পানির শক্তি। এর ফলেই পানিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত করা সম্ভব হয়। আমাদের দেশে এই ইম্পেলার-খানা তৈরি করা হয়; কিন্তু মোটরখানা বিদেশীদের ব্যবসার জন্যেই আমরা রেখে দিয়েছি!

 

এনার্জিপ্যাকের কাস্ট রেজিন ট্রান্সফরমার (সিআরটি) তৈরির একটা ভিডিও। এটা বেশ এডভান্সড এক ধরনের ট্রান্সফরমার। তবে প্রসেস দেখলে বোঝা যাবে যে বৈদ্যুতিক মোটর বা অলটারনেটর তৈরির প্রসেস থেকে এই প্রসেস খুব একটা দূরে নয়।
 

ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন…

কাজেই ইঞ্জিনের সাথে অলটারনেটর লাগালে তৈরি হয় বিদ্যুত, আর মোটরের সাথে (বা ইঞ্জিনের সাথে) ইম্পেলার লাগালে টানা যায় পানি। আর মোটর এবং অলটারনেটর আসলে একই জিনিস। এখন যদি আমরা মোটরের সাথে বা অলটারনেটরের সাথে গিয়ার চাকা (বর্তমানে দেশে তৈরি হয়, তবে প্রযুক্তি আরও অনেক দূর এগিয়ে নিতে হবে) লাগিয়ে অন্য কিছু ঘোরাবার চেষ্টা করি? এখানেই হলো শিল্পোন্নয়নের আরেক চাবি। যা কিছু ঘোরে বা নড়াচড়া করে, সেটা যদি বিদ্যুতের সাহায্যে নড়াচড়া করে, তাহলে সেখানে অবশ্যই একটা মোটর আছে। এসেম্বলি লাইন এবং প্রসেস চালু থাকে মোটরের কারণে। ফর্কলিফট চলে মোটরে (কারণ সেটা ব্যাটারি-চালিত গাড়ি)। বয়লারের পানি ঢোকানো-বের করা হয় মোটরের (পাম্পের) সাহায্যে। ক্রেন চলে মোটরে। যেকোন মেশিন চলে মোটরে, যেমন লেদ মেশিন, শিয়ারিং মেশিন, কাটিং মেশিন, বোরিং মেশিন, ইত্যাদি। আগেই বলেছি যে, যে ফ্যানের মোটর বানাতে পারে, সে অন্য মোটরও বানাতে পারবে – প্রযুক্তি অত্যন্ত সাধারণ। যতো উন্নত কারখানাই হোক না কেন, সেটাতে মোটর ছাড়া কাজ হয় না। রোবটের হাত-পা নাড়ানো হয় কি করে? কয়েকটি মোটর সেখানে কাজ করে। অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোবট তৈরি করতেও মোটর লাগবে।

একটা গ্যাস বা তেল বা কয়লা বা হাইড্রো বা পারমাণবিক বিদ্যুতকেন্দ্র থেকে বিদ্যুত কি করে তৈরি হয়? প্রথমে মেকানিক্যাল শক্তি তৈরি করা হয়, যা কিনা একটা আলটারনেটরের মাঝের অংশটিকে ঘোরায় এবং অলটারনেটর বিদ্যুত তৈরি করে। অবশ্য সবাই বিদ্যুতকেন্দ্রের আলটারনেটরকে জেনারেটর হিসেবেই চেনে। শিল্প, দোকানপাট, বাড়িঘরে যে ব্যাকআপ জেনারেটর থাকে, সেটাও একইভাবে কাজ করে। কাজেই যেটা বোঝা যাচ্ছে তা হলো শিল্প স্থাপনে মোটর একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশনের পূর্বশর্ত। আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন করতে না পারলে হাই কোয়ালিটি জিনিস তৈরি করা কঠিন, সময়সাপেক্ষে এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্ভবই না। আমাদের নতুন করে মোটর আবিষ্কার করতে হবে না; শুধু উতপাদনে যেতে হবে; সর্বশেষ প্রযুক্তি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে হবে, যা কিনা আমরা বহু শিল্পের জন্যেই করেছি। ফ্যানের মোটর তৈরি করে ফুলস্টপ দেয়াটা বোকার স্বর্গে বসবাস। এভাবে একটা জাতি গরমকালে কিছুটা স্বস্তি পাবে, কিন্তু সামনে এগুতে পারবে না। সব ধরনের মোটর এবং অলটারনেটর তৈরি করতে হবে। এগুলিরও একটা লিস্ট করে ফেলা যাক –

১. পানি তোলার এবং পানি সেচের মোটর (পাম্প)

২. জেনারেটর (ইঞ্জিন + অলটারনেটর)

৩. ইন্ডাস্ট্রিয়াল মোটর

৪. ফ্যান, ট্রান্সফরমার, ইত্যাদি (বর্তমানে তৈরি হচ্ছে)

ইঞ্জিন যদি হার্ট হয়, তাহলে মোটর এবং অলটারনেটর হবে সেই হার্টের ভালভ। একটা গাড়ি যখন চলে, তখন সেই গাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার চলে কি করে? রেডিও চলে কি করে? কারণ ইঞ্জিনের শাফট-এর সাথে একটা অলটারনেটর লাগানো থাকে, যা কিনা বিদ্যুত উতপাদন করে। একেকটা গাড়ি একেকটা বিদ্যুতকেন্দ্র। একেকটা জেনারেটর একেকটা বিদ্যুতকেন্দ্র। বিদ্যুত না থাকলে প্রস্তরযুগে ফিরে যেতে হবে। আর সেই বিদ্যুতের দায়িত্ব আমরা কখনোই অন্য কারুর হাতে তুলে দিতে পারি না। হাত-পা তৈরি করছি আমরা; সেটা চলবে। তবে এখন “হার্ট” তৈরি করার পালা। ইঞ্জিন, মোটর, অলটারনেটর – এগুলি না হলে দেশের শিল্পোন্নয়নের ভিত্তি তৈরি হবে না। ভাগারের উপরে বিল্ডিং যেমন স্থায়ী হয় না, তেমনি ইঞ্জিন, মোটর, অলটারনেটর ছাড়া একটা দেশের উন্নয়ন বেলুনের মতো ফুলবে, কিন্তু কোনদিনই দৃঢ় হবে না।