Monday, 11 September 2017

বাংলাদেশের সামরিক বাজেট নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সময় এসেছে

মিয়ানমারের সামরিক প্যারেডে শোভা পাচ্ছে রাশিয়ায় তৈরি শক্তিশালী Kvadrat-M (Buk-M1) মিডিয়াম-রেঞ্জ এয়ার-ডিফেন্স মিসাইল। যুগের পর যুগ যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-সমর্থিত সুশীলদের কথা শুনে সামরিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী পত্রিকা প্রতিদিনের খবরে তথাকথিত "সুশীল সমাজ"এর কিছু লোককে প্রতিদিন হাইলাইট করেছে। "খবর" বলে প্রকাশিত ঐসব বিবৃতি ঔপনিবেশিকদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন ছাড়া আর কিছুই করেনি। এই ঔপনিবেশিক এজেন্টদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডের কারণে বাংলাদেশের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলির সামরিক দিক থেকে বিরাট অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়েছে।


১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭


  
ঔপনিবেশিক এজেন্টদের সামরিক বাহিনী-বিরোধী প্রপাগান্ডা 

যুগের পর যুগ যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-সমর্থিত সুশীলদের কথা শুনে সামরিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী পত্রিকা প্রতিদিনের খবরে তথাকথিত "সুশীল সমাজ"এর কিছু লোককে প্রতিদিন হাইলাইট করেছে। "খবর" বলে প্রকাশিত ঐসব বিবৃতি ঔপনিবেশিকদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন ছাড়া আর কিছুই করেনি। বিশেষ করে নির্বাচনের সময়ে এই লোকগুলিকে দিয়ে মানুষের আবেগ যেদিকে যায় এমন সব কথাবার্তা বলিয়ে এদের পক্ষে বড় একটা সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করেছে। সময় সুযোগমত এরা সর্বদা বাংলাদেশের সামরিক শক্তি তৈরিতে বাধা দিয়েছে। যেকোন সামরিক উন্নয়ন পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্তরায় বলে উপস্থাপন করেছে, এবং সন্তর্পণে প্রতিবেশী দেশ ভারত বা মিয়ানমারের সামরিক শক্তির উন্নয়নের ব্যাপারগুলিকে এড়িয়ে গিয়েছে। এরা তৈরি করেছে সামরিক-বেসামরিক বিভেদ। সমাজের প্রভাবশালী মহলের মাঝ থেকে কেউ যেন সামরিক বাহিনী সদস্য হয়ে না যায়, তারা সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে। এমন একটা চিন্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে যে 'ভালো ঘরের ছেলেপেলার মিলিটারিতে কেন যাবে'!!

বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্টগুলি জায়গা নষ্ট করছে বলে একজন তথাকথিত মানবাধিকারকর্মী সাংবাদিক সন্মেলন করে বলেন যে, "বাংলাদেশে জমির দাম সাংঘাতিক। জমি তো সোনার চেয়েও দামি বাংলাদেশে।... এতো বিশাল জমি তাদের আবাসনের জন্য কেন দরকার? হাজার হাজার একর জমি তারা নিয়ে নিয়েছে তাদের বাসস্থানের জন্য। - কেন?" তাদের কথায়, সেনানিবাস প্রতিষ্ঠার নামে একের পর এক বসত ভিটা, কৃষিজমি, বনভূমি, জলাধার বেআইনিভাবে বেহাত হচ্ছে। দেশের প্রতিরক্ষার উন্নয়নের চাইতে দেশের সেকুলার সাংস্কৃতিক উন্নয়ন (নাচ-গান-কবিতা আবৃত্তি) তাদের কাছে সর্বদাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ঠেকেছে। আরেক দল আবার পরিবেশ আন্দোলনের নাম করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রজেক্টের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে (বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্ট্র্যাটেজিক শিল্পকারখানা) বাধাগ্রস্ত করতে "পরিবেশ দূষণ"এর নামে আদালতে মামলা করে কাজের স্থগিতাদেশ নিয়ে এসেছে। আবার সামরিক ক্রয়ের কথা শুনলেই পত্রিকায় এর বিরুদ্ধে বিবৃত দিয়েছে এরা। "স্বচ্ছতার অভাব"এর কথা বলে সামরিক ক্রয় বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছে বারংবার। তথাকথিত দূর্নীতি-বিরোধী সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে "সামরিক খাতে বাংলাদেশের দুর্নীতির ঝুঁকি রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা-সম্পর্কিত গোপন বিষয়গুলো সম্পর্কে সংসদে যেমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয় না, তেমনি নিরাপত্তা খাতের বার্ষিক হিসাবের নিরীক্ষা প্রতিবেদন নিয়েও কোনো বিতর্কের প্রমাণ মেলে না।"

এজেন্টরা বাংলাদেশকে ঘোরের মাঝে রেখে দুর্বল করেছে

এই ঔপনিবেশিক এজেন্টদের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকান্ডের কারণে বাংলাদেশের সাথে তার প্রতিবেশী দেশগুলির সামরিক দিক থেকে বিরাট অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ধারও অনেক কমে গেছে। কূটনৈতিক ভাষার পেছনে সামরিক শক্তি যে প্রচ্ছন্ন হুমকি বহণ করে, সেটা অন্য কিছুতে সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যে এক্ষেত্রে তার প্রতিবেশীদের থেকে পিছিয়ে আছে, তা সীমান্ত হত্যা, সীমান্ত প্রহরার বাহিনীর মাঝে গোলা বিনিময়, সমুদ্র ও আকাশাসীমা লংঘন, ইত্যাদি ঘটনায় মোটামুটি পরিষ্কার। মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে মিয়ানমার গুরুত্ব দেয়নি একেবারেই। একে তো মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে, অন্যদিকে চীন এবং রাশিয়াও যে কিছু বলবে না, সেটা মিয়ানমার জানে। একইসাথে তারা এটাও টের পেয়েছে যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী মিয়ানমারকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে না। যেকারণে রাখাইনে সামরিক অভিযান তারা চালিয়েই গেছে।
  


নিজ দেশে তৈরি মিয়ানমার নৌবাহিনীর অত্যাধুনিক ফ্রিগেট 'সিন-ফায়ু-সিন'। নৌবাহিনীর স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিক থেকে মিয়ানমার বাংলাদেশের চাইতে বহু বছর এগিয়ে আছে। যতদিনে বাংলাদেশ ৫০মিটারের পদ্মা-ক্লাসের প্যাট্রোল বোট তৈরি শুরু করেছে, ততোদিনে মিয়ানমার ১০৬মিটার স্টেলথ ফ্রিগেট তৈরিতে বেশ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশে তৈরি 'দুর্জয়'-ক্লাসের জাহাজগুলি এখনো অপারেশনাল হয়নি; অথচ মিয়ানমারের স্টেলথ ফ্রিগেটগুলি অলরেডি কমিশন্ড হয়ে গেছে।


মিয়ানমার নৌবাহিনী - বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে

মিয়ানমারের সামরিক উন্নয়ন তাদের নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই মিয়ানমার তার সামরিক ইন্ডাস্ট্রিকে বেশ ভালোই উন্নয়ন করেছে। নিজেদের সামরিক গাড়ি বানানো ছাড়াও নৌবাহিনীর জন্যে ফ্রিগেট, কর্ভেট, ওপিভি, মিসাইল বোট, টর্পেডো বোট এবং ল্যান্ডিং ক্রাফট তৈরি করছে তারা। '৯০-এর দশকের শুরুতে যখন দ্বিতীয়বারের মতো রোহিঙ্গা সমস্যা শুরু হয়, তখনই তারা বাংলাদেশের নৌবাহিনীকে ব্যালান্স করার নিমিত্তে যুদ্ধজাহাজ তৈরি শুরু করে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১২ সালের মাঝে তারা ৪৫ মিটার লম্বা ২০টি যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছে যেগুলির ১১টি সজ্জিত হয়েছে চীনে তৈরি সি-৮০২ সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল দিয়ে। শুধু তা-ই নয়, এগুলির অনেকগুলিরই নিজস্ব বিমান-প্রতিরক্ষা রয়েছে। 'ইগলা' সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল দেখা যায় এগুলির অনেকগুলির উপরেই।

মিয়ানমার ‘আনাওইয়াহতার’-ক্লাসের ৭৭ মিটার লম্বা দু'টা কর্ভেটও বেশ আগেই তৈরি করেছে। পরে সেগুলিকে আরও উন্নত করেছে; মিসাইল-সজ্জিত করেছে সেগুলি। তাদের বানানো ফ্রিগেট 'অং জে ইয়া', ‘কায়ান সিথথার’ এবং 'সিন-ফায়ু-সিন' আর ৪৯ মিটার লম্বা মিসাইল বোটের ডিজাইন দেখলে বিশ্বাস করা দুষ্কর যে সেগুলি মিয়ানমারের মত তৃতীয় বিশ্বের একটা দেশে তৈরি। ৮০মিটার লম্বা লেটেস্ট কর্ভেট 'তাবিনশয়েতি' এবং নতুন তৈরি অফশোর প্যাট্রোল ভেসেলও লেটেস্ট ডিজাইন ফলো করেছে। এগুলির প্রায় সকল জাহাজেই জাহাজ-ধ্বংসী সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল বসানো হয়েছে। শুধু ১৭টা মিসাইল বোটেই বসানো রয়েছে ৫৬টা সি-৮০২ মিসাইল। ৫টা ফ্রিগেটে ৪০টা, ৩টা কর্ভেটে ১২টা মিসাইল এবং ৪৯মিটারের মিসাইল বোটে আরও ৪টা; মোট কমপক্ষে ১১২টা মিসাইল। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ৪টা গাইডেড-মিসাইল ফ্রিগেট বহন করে ৩২টা মিসাইল; ৬টা কর্ভেট-এলপিসি বহন করে ২৪টা মিসাইল; আর পুরোনো ৯টা মিসাইল বোট বহন করে ২৬টা মিসাইল; মোট ৮২টা মিসাইল। বলা বাহুল্য যে নৌবাহিনীর স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিক থেকে মিয়ানমার বাংলাদেশের চাইতে বহু বছর এগিয়ে আছে। যতদিনে বাংলাদেশ ৫০মিটারের পদ্মা-ক্লাসের প্যাট্রোল বোট তৈরি শুরু করেছে, ততোদিনে মিয়ানমার ১০৬মিটার স্টেলথ ফ্রিগেট তৈরিতে বেশ অনেকদূর এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশে তৈরি 'দুর্জয়'-ক্লাসের জাহাজগুলি এখনো অপারেশনাল হয়নি; অথচ মিয়ানমারের স্টেলথ ফ্রিগেটগুলি অলরেডি কমিশন্ড হয়ে গেছে। মিয়ানমার চীনের কাছ থেকেও টাইপ ০৫৩-এর দু'টা ফ্রিগেট কিনেছে। মিসাইল বোট এবং অনান্য বোটও কিনেছে। এখন ভারত চাইছে মিয়ানমারের কাছে অফশোর প্যাট্রোল বোট বিক্রি করতে। মিয়ানমার সাবমেরিন কেনার চেষ্টাতেও আছে। আর সেটা কিনে ফেললে বাংলাদেশের আর কোন এডভান্টেজ থাকছে না মিয়ানমার নৌবাহিনীর সাথে।
   






মিয়ানমারের বিমান প্রতিরক্ষা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে দূরে রাখবে 

বিমান প্রতিরক্ষায় মিয়ানমার আরও বেশি এগিয়ে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের সবে-ধন নীলমণি ৮টা মিগ-২৯ বিমান মিয়ানমারের ৩১টা মিগের সাথে কতটা প্রতিযোগিতা দিতে সক্ষম হবে, তা নিয়ে যে কেউ আলোচনা করবেন। মিয়ানমার আকাশ-প্রতিরক্ষার জন্যে মিডিয়াম রেঞ্জের (৩০ থেকে ৫০কিঃমিঃ) রুশ Pechora-2M (S-125/SA-3), রাশিয়ার Kvadrat-M (Buk-M1) এবং চীনের KS-1/HQ-12 বিমান-ধ্বংসী সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল মোতায়েন করেছে। শর্ট রেঞ্জের Igla-S (SA-24) মিসাইল দিয়েও ভরিয়ে ফেলেছে সেনাবাহিনী। ২০০০ সালের শুরুতেই মিয়ানমার Myanmar Integrated Air Defence System (MIADS) প্রতিষ্ঠা করে। ২০১০ সালে সারাদেশে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ের্কের সাথে যুক্ত হয় এই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, যার ফলে মিয়ানমারের সকল বিমানবন্দর, বিমান ইউনিট, রাডার ইউনিট, এয়ার ডিফেন্স মিসাইল এবং আর্টিলারি-সহ বিমান প্রতিরক্ষার সকল কিছু একটা সিস্টেমের অন্তর্গত হয়।

মিয়ানমার যদিও বহুকাল যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মাঝে ছিল, তদুপরি সে কিন্তু তার বিমান প্রতিরক্ষাকে কেবল সাম্প্রতিক সময়েই উন্নত করেছে; এবং এখনও উন্নত করে যাচ্ছে। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলি বেশ মডার্ন এবং মোবাইল। যেকোন সময়ে দরকারে যেকোন স্থানে মোতায়েন করা যায়।  মিয়ানমারের এই বিমান-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিপক্ষে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফাইটারগুলিকে পাঠালে কয়েকটা বিমান হারানোটা অসম্ভব কিছু ছিল না। তখন বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতার সর্বোচ্চ অবস্থা সকলের কাছে বেরিয়ে যেতো।  


২০১৫ সালের এই ছবিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চীনে তৈরি মিডিয়াম-রেঞ্জের KS-1/HQ-12 বিমান-ধ্বংসী সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল দেখা যাচ্ছে। মিয়ানমার যদিও বহুকাল যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মাঝে ছিল, তদুপরি সে কিন্তু তার বিমান প্রতিরক্ষাকে কেবল সাম্প্রতিক সময়েই উন্নত করেছে; এবং এখনও উন্নত করে যাচ্ছে। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলি বেশ মডার্ন এবং মোবাইল। যেকোন সময়ে দরকারে যেকোন স্থানে মোতায়েন করা যায়।  মিয়ানমারের এই বিমান-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিপক্ষে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফাইটারগুলিকে পাঠালে কয়েকটা বিমান হারানোটা অসম্ভব কিছু ছিল না। তখন বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতার সর্বোচ্চ অবস্থা সকলের কাছে বেরিয়ে যেতো। 


মিয়ানমার সেনাবাহিনী - পুরোপুরি ডিফেন্সিভ

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বেশ ভালো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। বহু বছর মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে তাদের অভিজ্ঞতা কম হয়নি। তবে তাদের পুরো সেনাবাহিনীই মোটামুটিভাবে কাউন্টার ইনসার্জেন্সিতে এক্সপার্ট; এবং ওটাই তারা পারে। 

৩০০-এর বেশি লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়ন রয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীতে, যার একেকটার সদস্যসংখ্যা ৫০০-এর মতো। ১৪টা রিজিওনাল কমান্ড এবং ১০টা লাইট ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন (১০টা ব্যাটালিয়নে একটা ডিভিশন) অধীনে এই ব্যাটালিয়নগুলি সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দেশকে বহু খন্ডে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোই এদের উদ্দেশ্য। আশেপাশের দেশে অপারেশন চালাবার মতো সক্ষমতা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নেই। তাদের বাহিনী পুরোপুরিই ডিফেন্সিভ। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সৈন্য পাঠানোটা নির্ভর করবে একেক অঞ্চলের বিচ্ছন্নতাবাদীদের সাথে যুদ্ধের অবস্থার প্রেক্ষিতে।

সাম্প্রতিক সময়ে এর বাইরে তারা যে সক্ষমতাগুলি অর্জন করেছে তার মধ্যে মূল হলো আর্টিলারি, সাঁজোয়া ইউনিট এবং এয়ার ডিফেন্স। এগুলি ইনসার্জেন্সিতে যতটা না বেশি ব্যবহৃত হবে, তার চাইতে বেশি ব্যবহৃত হবে আশেপাশের প্রতিবেশীদের ভয় দেখিয়ে দূরে রাখতে। একসময় শুধুমাত্র চীনের ছত্রছায়ায় থাকার সময়ে মিয়ানমার সবসময়েই ভয়ে থাকতো যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কখনো তাদের উপরে সামরিক হামলা করে বসবে। তবে অং সান সু কি-র ক্ষমতায় আসার পর থেকে মিয়ানমারের সেই ভয়টুকু নেই। তবে আশেপাশের দেশগুলির (চীন, থাইল্যান্ড, ভারত) ইন্ধনপ্রাপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীরা রয়েই গেছে। তাদের রয়েছে বিশাল সুগঠিত সামরিক বাহিনী। এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী হয়েছে এক্সপার্ট। তবে বাইরের যেকোন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।

প্রায় ৪৫০-এর মতো ট্যাঙ্ক মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে সক্ষম। এর মাঝে ৫০টা চীনের MBT-2000, ১২০টার মতো ইউক্রেনের T-72S, ৮০টার মতো চীনা Type 69-II, ১৬০এর মতো চীনা Type 59D, এবং ৫০টার মতো চীনা Type 63 লাইট ট্যাঙ্ক। এর সাথে রয়েছে হাজার খানেকের মতো আর্মার্ড পার্সোনেল ক্যারিয়ার, ১৮০-২০০-এর মতো সেলফ-প্রপেল্ড আর্টিলারি এবং একটা বড় সংখ্যক টানা আর্টিলারি। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সফলভাবে এই আর্টিলারির ব্যাপক ব্যবহার করেছে।
  

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর T-72S ট্যাঙ্ক। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বেশ ভালো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। বহু বছর মিয়ানমারের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সাথে যুদ্ধ করতে করতে তাদের অভিজ্ঞতা কম হয়নি। তবে তাদের পুরো সেনাবাহিনীই মোটামুটিভাবে কাউন্টার ইনসার্জেন্সিতে এক্সপার্ট; এবং ওটাই তারা পারে। তবে বাইরের যেকোন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন প্রতিরোধ গড়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।


মিয়ানমারের দুর্বল ভূকৌশলগত অবস্থান - বাংলাদেশ কিছুই করতে পারলো না!

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের থেকে দেশ বাঁচাতে ডিফেন্সিভ-ভাবে তৈরি করা হয়েছে। আর ভৌগোলিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকায় আরাকানে খুব একটা সহজে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সেনা মোতায়েন সম্ভব নয়। তবে আরাকানকে ধরে রাখার যথেষ্ট সক্ষমতা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর আছে, যদি অন্য সার্ভিসগুলি তাদের ঠিকমতো সহায়তা করে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের বিমান প্রতিরক্ষার বেশিরভাগটাই মিয়ানমারের পক্ষে আরাকান এবং এর আশেপাশে মোতায়েন করা সম্ভব; কারণ এগুলি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে কমই ব্যবহৃত হয়। মিয়ানমার নৌবাহিনীর বেলাতেও একই কথা। এই অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে যদি মিয়ানমারের দক্ষিণে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দাঁড়ায়। তাহলে মিয়ানমার তার বিমান এবং নৌবাহিনীর পুরোটা একত্রে মোতায়েন করতে সক্ষম হবে না।

তবে মূল কথা হলো, মিয়ানমার অত্যন্ত দুর্বল ভূকৌশলগত অবস্থানে থেকেও বাংলাদেশ মিয়ানমারকে কোন রকম ভীতি প্রদর্শন করতেই সক্ষম হলো না। মিয়ানমার জানে যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর পক্ষে মিয়ানমারকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব নয়। আর একইসাথে কূটনৈতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-চীন-রাশিয়া সকলেই মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রায় সকলকেই সমূলে উৎপাটন করার দৃশ্য তথাকথিত বিশ্ব-নেতৃত্ব উপভোগ করেছে। বাংলাদেশের নাকের ডগা দিয়ে নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার গিয়ে স্ট্র্যাটেজিক চুক্তি করে আসলেন। আর তুরস্কের এরদোগান কৌশলগত দিক থেকে কোন সমর্থন না দিয়ে তার পত্নীর চোখের পানিতে তার কর্মসম্পাদন করলেন। পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্টরা বাংলাদেশকে যুদ্ধবিমান না দিয়ে দিলেন মিয়ানমারকে! ইন্দোনেশিয়া যুদ্ধজাহাজ না পাঠিয়ে পাঠালো পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে, আর মালয়েশিয়া পাঠালো শুধুমাত্র ত্রাণ।
   

চোখের পানি, ত্রাণসামগ্রী, আর "মানবতার আহ্বান"এ মিয়ানমার চাপ বোধ করবে না। জাতিসংঘে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত আর চীন-রাশিয়ার মারামারি দেখার সময় নেই কারুর। এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের কূটনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মালদ্বীপের মতো হতে পারে না। সুশীলদের "চাপে" প্রতি বছর দুই ফোঁটা করে সামরিক বাজেট বৃদ্ধির দিন শেষ! 'ব্লু ইকনমি', 'ম্যারিটাইম নেশন', ফোর্সেস গোল-২০৩০' - এগুলি বাকওয়াজ হয়ে থাকবে, যদি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যকে কাপড় খুলে লুঙ্গি পড়িয়ে অপমান করা হয় বা ১৭ বার কোন বাধা ছাড়াই আকাশসীমা লঙ্গন করা হয়। ভিক্ষাবৃত্তি আর অপমান হজম করা বাংলাদেশের মানুষের কাছে সমরশক্তির উন্নয়নের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় হলো কবে থেকে?


সুশীলদের শান্তিপূর্ণ নীতি পরিহার করার সময়ে এসেছে 

চোখের পানি, ত্রাণসামগ্রী, আর "মানবতার আহ্বান"এ মিয়ানমার চাপ বোধ করবে না। জাতিসংঘে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত আর চীন-রাশিয়ার মারামারি দেখার সময় নেই কারুর। এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের কূটনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনার। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মালদ্বীপের মতো হতে পারে না। বাংলাদেশ তার নিজের পররাষ্ট্রনীতির ফলকে ভারত-চীনের হাতেও তুলে দিতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়ণক হয়ে সকলের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষাবৃত্তিও করতে পারে না। তবে তার সামরিক শক্তিকে সত্যিকার অর্থে বলীয়ান করে সারা বিশ্বকে তার অবস্থান জানান দিতে পারে। সুশীলদের "চাপে" প্রতি বছর দুই ফোঁটা করে সামরিক বাজেট বৃদ্ধির দিন শেষ! এভাবে এগুলে ভারত খুব সহজেই মিয়ানমারকে দিয়েই বাংলাদেশকে ব্যালান্স করে রাখবে চিরকাল। 'ব্লু ইকনমি', 'ম্যারিটাইম নেশন', ফোর্সেস গোল-২০৩০' - এগুলি বাকওয়াজ হয়ে থাকবে, যদি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যকে কাপড় খুলে লুঙ্গি পড়িয়ে অপমান করা হয় বা ১৭ বার কোন বাধা ছাড়াই আকাশসীমা লঙ্গন করা হয়। ভিক্ষাবৃত্তি আর অপমান হজম করা বাংলাদেশের মানুষের কাছে সমরশক্তির উন্নয়নের চাইতে বেশি আকর্ষণীয় হলো কবে থেকে?

Tuesday, 5 September 2017

অবাধ্য মিয়ানমার, আর নিম্নগামী বাংলাদেশ…

২৩শে জুলাই ২০১৭। আরব সাগরে নৌ-মহড়ায় তুর্কী জাহাজ 'গিরেসুন' এবং পাকিস্তানী জাহাজ 'সাইফ'। তুরস্কের এরদোগান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে ফোন করেছেন; কিন্তু মাত্র কিছুদিন আগেই ২৯শে জুন ২০১৭-তে তুরস্ক আরব সাগরে Combined Task Force 151- নামের মাল্টিন্যাশনাল ম্যারিটাইম ফোর্সের কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছে চার মাসের জন্যে (পঞ্চম বারের মতো)। তুরস্কের এরদোগানের জন্যে আরব সাগর টহল দেয়াটা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চাইতে মিয়ানমারের মুসলিমদের রক্ষা করাটা অবশ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭


রোহিঙ্গাদের আর্তনাদ আর এরদোগানের মায়াকান্না...

মিয়ানমারের মুসলিমদের আর্তনাদ যেমন মানুষ সহ্য করতে পারছে না, ঠিক তেমনি মিয়ানমারের ধৃষ্টতাও সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারকে একের পর এক সুযোগ দিয়ে এমন একটা অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে মিয়ানমার বেয়াড়া পশুর মতো আচরণ করছে। অবশ্য যেহেতু সেই সুযোগ মিয়ানমারকে বাংলাদেশ এবং মুসলিম বিশ্বের অনান্য দেশগুলির নেতৃত্বরাই দিয়েছেন, তাই কাকে দোষারোপ করা দরকার সে নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ দোষারোপের সংস্কৃতির মাঝেই কিছু লোক চাইছে “কিছু তো করেছি” বলে ভালো সাজতে এবং রাজনৈতিক সুবিধা নিতে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে চলে আসবে। তুরস্কের এরদোগান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে ফোন করেছেন; কিন্তু মাত্র কিছুদিন আগেই ২৯শে জুন ২০১৭-তে তুরস্ক আরব সাগরে Combined Task Force 151- নামের মাল্টিন্যাশনাল ম্যারিটাইম ফোর্সের কমান্ডার নিযুক্ত হয়েছে চার মাসের জন্যে (পঞ্চম বারের মতো)। তুরস্কের এরদোগানের জন্যে আরব সাগর টহল দেয়াটা যতটা না গুরুত্বপূর্ণ, তার চাইতে মিয়ানমারের মুসলিমদের রক্ষা করাটা অবশ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। অবশ্য সেটা খুব সহজেই বোঝা যাবে তুরস্কের সীমান্তে সিরিয়া-ইরাকের ধ্বংসের কাহিনী দেখে। এরদোগান চেয়ে চেয়ে লাখো মুসলিমের সমাধি দেয়া দেখেছেন। বিশাল সামরিক বাহিনী ঘরে পুষে রেখে এই হত্যাকান্ড দেখা মানে এতে অংশগ্রহণ করা। অবশ্য তিনি সিরিয়াতে সরাসরিও অংশগ্রহণ করেছেন। আলেপ্পোর যুদ্ধটা হঠাত শেষ হওয়ার পেছনে এরদোগানের অবদান যথেষ্ট। ‘অপারেশন ইউফ্রেটিস শিল্ড’-এর নাম করে আলেপ্পো থেকে আসাদ-বিরোধীদের একটা বড় অংশকে এরদোগান বের করে নিয়ে আসেন; আর ঐ সময়েই আলেপ্পোর দখল নেয় আসাদ-বাহিনী। মুখে আসাদের বিরুদ্ধাচরণ করে তিনি আসাদের সাথেই হাতে-হাত মিলিয়ে কাজ করেছেন; মুসলিম নিধনে সহায়তা দিয়েছেন। বাংলাদেশের ব্যাপারে এরদোগানের কাছে একটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের কয়েকটা যুদ্ধপরাধীকে বাঁচানোর জন্যে ফোন কল করাটা রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরাসরি দরকারি সহায়তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই এরদোগানের কাছ থেকে আশা করা যায় কতটুকু?

তুরস্ক বাংলাদেশকে বলছে যে বাংলাদেশ মিয়ানমারের মুসলিমদের থাকার ব্যবস্থা করে দিক; তুরস্ক তাদের জন্যে অর্থ সরবরাহ করবে। অবশ্য এরদোগানের এমন ভালো সাজার ইতিহাস তো রয়েছেই। সিরিয়ার মানুষের পক্ষে যুদ্ধ না করে তিনি যুদ্ধ চলতে দিয়েছেন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্যে শরণার্থী শিবির তৈরি করে নিজে ভালো সাজার চেষ্টা করেছেন। আসলে ইরাক-সিরিয়ার মুসলিমদের মতো মিয়ানমারের মুসলিমদেরও দরকার নেই শরণার্থী শিবিরের; তাদের দরকার একজন অভিভাবকের, যিনি দায়িত্ব নেবেন মুসলিমদের এবং শত্রুর মুখের উপরে বলবেন – “আমার মুসলিম ভাইদের গায়ে আর একটা আচর লাগলে আমি তোমার হাত কেটে ফেলবো”। এরদোগান সেই নেতা হবার মতো ব্যক্তিত্ব দেখাতে পারেননি। তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাকারীদের পক্ষে তুরস্কের মার্কিন বিমান ঘাঁটি থেকে এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান ওড়ার পরেও এরদোগান আমেরিকাকে সবচাইতে বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ২০১০ সালে গাজায় ইস্রাইলী অভিযানের সময়ে ইস্রাইলের আক্রমণে কয়েকজন তুর্কী সৈন্য নিহত হন। এরদোগান তাদের জন্যে শুধুমাত্র “হিরোস ফিউনেরাল” দিয়েছেন! ছয় বছর পরে ইস্রাইলের সাথে আবারও সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিয়েছেন। এই এরদোগানের কাছ থেকে আশা করা কঠিন যে তিনি ফোন দেবেন মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টকে এবং বলবেন যে, ‘তোমরা তোমাদের নৌবাহিনী থেকে দু’টা করে ফ্রিগেট এবং বিমান বাহিনী থেকে ৪টা করে ফাইটার জেট বাংলাদেশে পাঠাও। আমি আরব সাগর থেকে তুরস্কের নৌবাহিনীর জাহাজ বঙ্গোপসাগরে পাঠাচ্ছি; সাথে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর দু’টা জাহাজ পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। আর আমি বাংলাদেশকে বলে দিচ্ছি আমাদের এই অভিযানে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার জন্যে’। সিরিয়ার মানুষের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়া এবং ইস্রাইলকে বন্ধু মনে করা এরদোগান এই ফোন কল করতে পারবেন?
  
ম্যানিলাতে অং সান সু কি-র সাথে মিলিত হয়েছিলেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট উইদোদো। ইন্দোনেশিয়া এবং তুরস্ক তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। মন্ত্রীদের এই সফর কি শুধু তাদের দেশের মানুষগুলিকে এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ঠান্ডা রাখার উদ্দেশ্যে, না সঠিক কোন পদক্ষেপ নেবার উদ্দেশ্যে? ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগের দফায়ও বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে তার তখনকার সফর যে লোক দেখানোই ছিল, তা এই সমস্যার পূণরাবৃত্তি দেখলেই বোঝা যায়। এবারও কি সেই লোক দেখানো সফর? তুরস্কের ক্ষেত্রেও কি তা-ই? মুসলিম দেশগুলির মানুষের মাঝে যখন প্রচন্ড ক্রোধের সৃষ্টি হচ্ছে, তখন উনারা কি সেকুলার গণতন্ত্রের “পুরষ্কৃত” কন্যা অং সান সু কি-র সাথে চা-নাস্তা খেয়েই সময় পার করবেন?



সবাই আসছেন অং সান সু কি-র সাথে চা-নাস্তা খেতে...

তুরস্ক-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-পাকিস্তানের মানুষ এবং সেসব দেশের রাষ্ট্রীয় পদের লোকজন কিন্তু মিয়ানমারের মুসলিমদের এই অবস্থা সহ্য করতে পারছেন না। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। এই অবস্থায় ইন্দোনেশিয়া এবং তুরস্ক তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাংলাদেশে পাঠাচ্ছে। মন্ত্রীদের এই সফর কি শুধু তাদের দেশের মানুষগুলিকে এবং সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ঠান্ডা রাখার উদ্দেশ্যে, না সঠিক কোন পদক্ষেপ নেবার উদ্দেশ্যে? ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগের দফায়ও বাংলাদেশে এসেছিলেন। তবে তার তখনকার সফর যে লোক দেখানোই ছিল, তা এই সমস্যার পূণরাবৃত্তি দেখলেই বোঝা যায়। এবারও কি সেই লোক দেখানো সফর? তুরস্কের ক্ষেত্রেও কি তা-ই? মুসলিম দেশগুলির মানুষের মাঝে যখন প্রচন্ড ক্রোধের সৃষ্টি হচ্ছে, তখন উনারা কি সেকুলার গণতন্ত্রের “পুরষ্কৃত” কন্যা অং সান সু কি-র সাথে চা-নাস্তা খেয়েই সময় পার করবেন?

মিয়ানমারের সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারের ভূরাজনীতি বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার চীনের বলয়েই ছিল বহুকাল। তবে অং সান সু কি-র মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মিয়ানমারে প্রবেশ। এর পর থেকেই চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের টানাপোড়েন শুরু। রাখাইনের উপকূলে Kyaukpyu বন্দরে চীন তৈরি করেছে গভীর সমুদ্রবন্দর, যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজে করে আসা তেল ডাউনলোড হচ্ছে। সেখান থেকে হাজার মাইলের পাইপলাইন দিয়ে সেই তেল পৌঁছে যাচ্ছে চীনের মূল ভুখন্ডে। একইসাথে গ্যাস পাইপলাইনও তৈরি করা হয়েছে। এই পাইলাইনের মাধ্যমে চীন স্ট্র্যাটেজিক মালাক্কা প্রণালীকে বাইপাস করতে চাইছে। পাকিস্তানে গোয়াদর পোর্ট তৈরি করেও চীন একই সুবিধা চাইছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই প্রচেষ্টাকে বাধা দিচ্ছে। আর এই কাজে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে ভারত। গোয়াদর পোর্ট পাকিস্তানের বালুচিস্তানে অবস্থিত, যেখানে ভারত বিচ্ছিন্নতাকামীদের সহায়তা দিচ্ছে। বিচ্ছিন্নতাকামীরা চীনা ইঞ্জিনিয়ারদের মেরে ফেলছে। তবে মিয়ানমারে ভারত আরও একটা কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে- বাংলাদেশকে ব্যালান্স করে রাখা, বা ব্যস্ত রাখা। ভারত মিয়ানমারের নৌবাহিনীর ফ্রিগেটগুলির জন্যে অত্যাধুনিক রাডার, সোনার এবং টর্পেডো সরবরাহ করেছে। প্রশ্ন হলো, নৌবাহিনী কেন? কারণ মিয়ানমারের নৌবাহিনী বাংলাদেশের বাণিজ্য রুটের উপরে চলাচলের সুযোগ পাবে। এই কাজে মিয়ানমারকে আরও কার্যক্ষম করে তুলতে ভারত তাদের নিয়মিত ট্রেনিং দিচ্ছে।

তবে একটা ব্যাপার ভুলে গেলে চলবে না যে মিয়ানমারে চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সকলেরই অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তাই তারা কেউই মিয়ানমারকে ছেড়ে দিতে চায় না; প্রভাব রাখতে চায়। তাদের পূঁজিবাদী লক্ষ্যের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে মিয়ানমারের মুসলিমদের নিধনের গল্প। তারা কেউই মিয়ানমারের মুসলিমদের বাঁচাতে আসবে না; বরং তারা বাংলাদেশকে বলবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের মাঝে থাকার জায়গা করে দিতে, যাতে তারা আরাম-আয়েশে মিয়ানমারে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারে। তাদের জন্যে অর্থই সবকিছু, তাই তারা বাংলাদেশকে শধু অর্থই সাধবেন। ঠিক এরদোগানের তুরস্কের মতোই।

সময় নষ্ট করার যতো পদ্ধতি...

অনেক ধরনের সমাধান দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন দিক থেকে। এই সমাধানগুলির সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে হলে এগুলির চিন্তার ভিত্তি নিয়ে কথা বলতে হবে।

১। রোহিঙ্গাদের স্বাধীন দেশ দেয়া হোকঃ

এই চিন্তাখানা এসেছে এই মনে করে যে এরকম একটা ছোট্ট দেশ তৈরি হলেও সেটা “স্বাধীন” হতে পারে। আর এখানে আরও ধরে নেয়া হচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব-ব্যবস্থা থেকে অনুমতি না নিলে একটা দেশ “স্বাধীন” হবে না। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের কাছ থেকে “স্বীকৃতি” পেতে হবে। বলাই বাহুল্য যে এই দেশগুলি রোহিঙ্গাদের উপরে অত্যাচার রোধে কিছুই করেনি। আর যে প্রশ্নটা করা হবে না তা হলো, এভাবে তৈরি হওয়া নতুন একটা দেশকে স্বীকৃতি দেয়া দেশের (যুক্তরাষ্ট্রের) দাসত্ব মেনে নিয়েই চলতে হবে। দেশটা যুক্তরাষ্ট্রের উপরে পুরোপুরি নির্ভর করবে, এবং মিয়ানমারের প্রতিবেশী হওয়ায় দেশটাকে প্রতিরক্ষার জন্যে সর্বদা যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী থাকতে হবে।

২। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের অস্ত্র সহায়তা দেয়া হোকঃ

এই চিন্তাখানা ধরে নিচ্ছে যে রোহিঙ্গা “মুক্তিযোদ্ধা”রা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই যুদ্ধ করে দেশ “স্বাধীন” করে ফেলবে। এক্ষেত্রে সেই উপরের প্রশ্নখানারই পূণরাবৃত্তি হচ্ছে – “স্বাধীন” বলতে কি বোঝাচ্ছি আমরা? যুক্তরাষ্ট্রের “স্বীকৃতি” নিয়ে “স্বাধীন”?

আর যদি যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নয় এমন কোন বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ দেয়া হয়, তবে কিন্তু বাংলাদেশকে “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র” তকমা দেয়া হবে এবং “সন্ত্রাস তাড়ানো”র নাম করে ড্রোন হামলার শুরু হবে। বুঝতে বাকি থাকে না যে এই ড্রোন হামলা ভারতের মাটি থেকেই হবে।

আর একই সময়ে একই মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারত-সমর্থিত কিছু লোক স্বাধীনতা দাবি করতে থাকবে, যাদেরকে অস্ত্র দিতে ভারতের দুই মিনিটও অপেক্ষা করতে হবে না। তখন “ব্লু ইকনমি”, “ডিজিটাল বাংলাদেশ”, “ফোর্সেস গোল-২০৩০” এগুলি বাদ দিয়ে “বাংলাদেশের বিভাজন” ঠেকাতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে হবে।

৩। মিয়ানমারের উপরে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিঃ

এই চিন্তাখানার অসারতা প্রমাণ করার দরকার কতটুকু রয়েছে, সেটা নিয়ে বরং কথা হতে পারে। আলোচনার পর আলোচনা হয়েছে মিয়ানমার সরকারের সাথে। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কোন সমাধান আসেনি। যে পশ্চিমা আন্তর্জাতিক চাপের কথা বলা হচ্ছে, তা কখনোই কাজ করেনি – একথা সবারই জানা। যে জাতিসংঘের কথা বলা হচ্ছে, সে জাতিসংঘের ব্যর্থতার তালিকা এতো বড় হয়েছে যে সেটা এখন নাম-সর্বস্ম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সর্বদা তার নিজের তৈরি করা এই প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে কাজ করছে। ২০০৩ সালে ব্যাপক-ধ্বংসী অস্ত্রের নাম করে ইরাক দখল করার চাইতে আর কোন ভালো উদাহরণ হয়তো দেয়া যাবে না। জাতিসঙ্ঘ কি করতে পেরেছিল ইরাকের লাখো মানুষের জন্যে, যারা পরবর্তীতে যুদ্ধে নিহত হয়? দক্ষিণ চীন সাগরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মেনে চলতে বলছে, অথচ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই আন্তর্জাতিক আদালতের অংশ হতে স্বাক্ষর করেনি! অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আদালতের আইন তার নিজের উপরে প্রযোজ্য নয়। ‘মিয়ানমারের উপরে আন্তর্জাতিক চাপ’ – এটা একটা মরীচিকা মাত্র। সময় নষ্ট করার একটা পদ্ধতি।

৪। যা আলোচনা করা হবে নাঃ

যে চিন্তাখানা আলোচনায় আসবে না তা হলো মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের সামরিক অভিযান। এই অভিযানে পুরো আরাকান মুক্ত করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদেরকে নিজেদের ভিটেমাটিতে পূনস্থাপন করা। এই চিন্তাখানা আসবে না শুধু এই কারণে নয় যে বাংলাদেশ এটা করতে পারে না, বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থায় বাংলাদেশ সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই অনুমতি চাইবে এই কাজটা করা জন্যে। অথচ এই সমাধানের চাইতে ভালো সমাধান নেই। মার্কিন-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন হলেই এটা সম্ভব।


সমাধান সামরিক……

বাংলাদেশ আহ্বান করলে তুরস্ক-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া-পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে সাড়া দেবেই; নেতৃত্ব যা-ই চাক না কেন। মিয়ানমারকে ভীতি প্রদর্শন করতে হলে দরকার মুসলিম দেশগুলির একত্রে সামরিক পদক্ষেপ। বঙ্গোপসাগরে জয়েন্ট মিলিটারি এক্সারসাইজ হতে পারে মিয়ানমার এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের ভীতি প্রদর্শনের পথ। তবে যেহেতু এই এক্সারসাইজ সর্বদা চলবে না, তাই বাংলাদেশকে ডিটারেন্ট হিসেবে সামরিক বাহিনীকে ডেভেলপ করতে হবে। সাবমেরিন ফ্লীট গড়ে তোলা ছাড়াও বিমান বাহিনীকে উন্নত করাটা এখন ফরয কাজ হয়ে গেছে। আর কতো বছর বাংলাদেশের মানুষকে অপেক্ষে করতে হবে পরবর্তী ফাইটার বিমান অর্ডার করার জন্যে? কোন বিমান কেনা হবে, এটার উপরে বছরের পর বছর নষ্ট করে এক হাস্যকর পরিস্থিতির উদ্ভব করা হয়েছে। এখন মিয়ানমার এক দিনে তিনবার বাংলাদেশের আকাশ-সীমা ভেদ করে গেলেও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কিছু শব্দ করে বিমান ওড়ানো ছাড়া কিছু করার সক্ষমতা থাকছে না। এই শব্দে মিয়ানমার ভয় তো পাবেই না, বরং আরও নতুন উদ্যমে মুসলিম খেদাও অন্দোলনে নামবে।
 
২০১৭ সালের বাংলাদেশ সমরাস্ত্র প্রদর্শনীতে JF-17 Thunder ফাইটারের রেপ্লিকা। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে ভারতের জন্যে  হুমকি তৈরি করতে পারে JF-17 ফাইটার জেট। এই ফাইটার জেট দুনিয়ার সবচাইতে মারাত্মক ফাইটার জেট নয়। কিন্তু বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে এই বিমানের অন্তর্ভুক্তি দিল্লীতে যে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করবে, তা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবমেরিন ক্রয়ের চাইতে বহুগুণে বেশি শক্তিশালী হবে।


মিয়ানমারের উপরে চাপ সৃষ্টি করতে হলে মিয়ানমারের পৃষ্ঠপোষকদের উপরেও চাপ প্রয়োগ করতে হবে। এই চাপ তৈরি করতে ভূরাজনৈতিক হিসেব কষতে হবে। ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক সুপারপাওয়ারের জন্যে সর্বদাই বিপদের ডাক দেয়। তাই বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের কথা উঠলেই জামায়াত-ই-ইসলামী এবং ভারতপন্থীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আর এভাবে তারা উভয়েই ভারতের (এবং যুক্তরাষ্ট্রের) বন্ধুরূপে কাজ করে। ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের সাজানো খেলায় পানি ঢেলে দেয়ার উপায় হলো পাকিস্তান থেকে অস্ত্র ক্রয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী পাকিস্তানে তৈরি K-8W ট্রেইনার বিমান ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করছে ‘বাখতার শিকান’ (রেড এরো-৮) এন্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল। বিমান বাহিনী পাকিস্তানে তৈরি কমান্ড সেন্টারও ব্যবহার করেছে। তবে এগুলি কোনটাই ভূরাজনৈতিক দিক থেকে ভারতের জন্যে হুমকি-স্বরূপ হয়নি। এই হুমকি তৈরি করতে পারে JF-17 Thunder ফাইটার জেট। এই ফাইটার জেট দুনিয়ার সবচাইতে মারাত্মক ফাইটার জেট নয়। কিন্তু বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে এই বিমানের অন্তর্ভুক্তি দিল্লীতে যে ভূমিকম্পের সৃষ্টি করবে, তা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সাবমেরিন ক্রয়ের চাইতে বহুগুণে বেশি শক্তিশালী হবে। এই ফাইটারকে ব্যাপকভাবে উন্নত করতে সহায়তা করছে চীন, তুরস্ক, এবং সম্ভবতঃ দক্ষিণ আফ্রিকা-সহ আরও কিছু দেশ। এই বিমান চালিত হচ্ছে রাশিয়ায় তৈরি বিখ্যাত RD-93 ইঞ্জিন দ্বারা, যা কিনা MiG-29 ফাইটারে ব্যবহৃত হয়। ভ্লাদিমির পুতিন পাকিস্তানকে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে কত বড় সহায়তা দিয়েছে এই ইঞ্জিনই তার প্রমাণ। এই বিমানের কোন অংশের জন্যেই পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দায়বদ্ধ হতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে এই ফাইটার জেট একটা ভূরাজনৈতিক বিভীষিকাময় অধ্যায়। বাংলাদেশের এই মুহুর্তে ২ থেকে ৩ স্কোয়াড্রন ফাইটার জেট দরকার; যাকে বলে “হট-ট্রান্সফার”! ফ্যাক্টরিতে তৈরি করে নয়, বরং অলরেডি তৈরি বিমানের লাইন থেকে এই সরবরাহ হতে হবে। যদি কেউ এর আগে কখনো ঢাকায় বসে দিল্লীতে বাজ পড়ার শব্দ না পেয়ে থাকেন, তবে এই ঘটনার সাথে সাথে সেটা শুনতে পাবেন। এই ঘটনাই পারবে মিয়ানমারকে থামাতে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ভূরাজনীতিতে অনেক স্টেশন মিস করেছে। দোকলাম ইস্যুতে বাংলাদেশের উচিত ছিল কথা বলা। একটা বিবৃতিই যথেষ্ট ছিল এক্ষেত্রে। বাংলাদেশ যদি বলতো যে বাংলাদেশের সীমানার এতো কাছে সামরিক কর্মকান্ডে বাংলাদেশ উদ্বিগ্ন, এবং ভারত-চীনকে বাংলাদেশ ঢাকায় বসে সমস্যার সমাধান খুঁজতে বলতো – বাংলাদেশের অবস্থান তখন বিশ্বে কোথায় থাকতো সেটা কল্পনাও করা সম্ভব নয়। কিন্তু ভারত কি মনে করবে – এধরনের নিম্নমানের চিন্তায় ডুবে গিয়ে এই সুযোগ হাতছাড়া করা হয়। এখন সেই একই নিম্নমানের কূটনীতির উপরে ভর করে মিয়ানমারকে আস্কারা দেয়া হচ্ছে। যেখানে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আইওরা সামিটে যা দেখিয়েছে এবং কসোভোকে স্বীকৃতি দিয়ে যে প্রভাব তৈরি করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেখানে কোন যুক্তিতে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে ঠান্ডা করতে পারবে না, এটা বোধগম্য নয়। একুশ শতকে বাংলাদেশের অবস্থান মিয়ানমারের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। কিন্তু ভূরাজনীতি না বুঝে নিম্নমানের কূটনীতির উপরে ভর করে মিয়ানমার-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মাথা নত করে, আর বাকি দুনিয়া থেকে রোহিঙ্গাদের জন্যে ভিক্ষাবৃত্তি করে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্নগামী হতে বাধ্য।

Friday, 1 September 2017

মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশ তার ডিটারেন্ট ব্যবহার করছে না কেন?

বাংলাদেশের সাবমেরিনগুলি মোটামুটি কর্মক্ষম হলেও একেবারে লেটেস্ট মডেলের কিন্তু নয়, যা কিনা তাদের ডিটারেন্ট ভ্যালুকে কমিয়ে দেয়। কাজেই বাংলাদেশকে খুব শীঘ্রই আরও সাবমেরিন যোগাড় করতে হবে। নতুন তৈরি করে সাবমেরিন যেমন আনতে হবে, তেমনি ‘অফ-দ্যা-শেলফ’ সাবমেরিনও খুঁজতে হবে, যা কিনা প্রযুক্তির দিক থেকে টাইপ-০৩৫জি থেকে আরও উন্নত।
০২রা সেপ্টেম্বর ২০১৭



সাবমেরিন হলো একটা ডিটারেন্ট প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ শত্রু যাতে তার শত্রুতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, সেটা নিশ্চিত করে এই সাবমেরিন। শত্রু জানবে যে সে ঝামেলা করলে তাকেও ঝামেলাতে পড়তে হবে। এভাবে সাবমেরিন একটা স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যাটফর্মই বটে। তবে সাবমেরিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারার মাঝেই এই ডিটারেন্ট। বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে দু’টা টাইপ-০৩৫জি সাবমেরিন কেনার পরে বাংলাদেশের হাতেও ডিটারেন্টের একটা অপশন এসেছে। বাংলাদেশের প্রতি বৈরী আচরণকারী কোন দেশকে একটা মেসেজ দেয়ার জন্যে এই সাবমেরিনগুলির ব্যবহার হতে পারে।

বাংলাদেশের সাথে তার প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের কিছু সমস্যা অনেক পুরোনো। এর প্রধানতম হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইনের মুসলিমদের নিয়ে। মিয়ানমারের এই মুসলিম নাগরিকদের প্রতি বৈরী আচরণ করার ফলে সেখান থেকে হাজারো মুসলিম নরনারীর বাংলাদেশমুখী যে ঢল সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রত্যুত্তর দিতে বাংলাদেশ তার ডিটারেন্টগুলিকে ব্যবহার করতে পারে, যার সর্বাগ্রে এখন রয়েছে সাবমেরিন-দু’টা। মিয়ানমারের সরকারকে মেসেজ পেতে হবে যে ভারত-মার্কিন ঔপনিবেশিকদের কথায় নেচে মিয়ানমার তার বিপদ ডেকে আনছে। মুখের কথায় যদি চিড়ে না ভেজে, তাহলে শক্ত হতেই হবে। এই শক্ত হবার কাজটা বাংলাদেশ আরও আগেই করতে পারতো। এর আগের বারে মিয়ানমার থেকে যখন দলে দলে মুসলিম আসা শুরু করলো, তখনই বাংলাদেশ মেসেজটা দিতে পারতো।

 


আগেই যা করা উচিত ছিল...

মালয়েশিয়ার একটা জাহাজ কিছু ত্রাণ নিয়ে বাংলাদেশ ঘুরে গিয়েছিল তখন। ইন্দোনেশিয়ার এক মন্ত্রীও এসেছিলেন শরণার্থীদের দেখতে। কিন্তু এই কাজগুলি তখন সেই সরকারগুলি করেছিল তাদের দেশের রাস্তায় মুসলিমদের প্রতিবাদ সমাবেশ সামলাতে। আসল কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি, তা এখন খুবই পরিষ্কার। এধরনের কর্মকান্ডের অন্তসারশূণ্যতার একটা প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হয়ে রইলো সেটা। যা তখনই করা উচিত ছিল তা হলো –

১। মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সাথে ‘লাইভ-ফায়ারিং জয়েন্ট মিলিটারি এক্সারসাইজ’ করতো।

২। তারপর মিয়ানমারের সিতওয়ে বন্দরে যৌথভাবে ত্রাণ পাঠাবার কথা বলতো।

৩। ত্রাণবাহী জাহাজটির সাথে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার চারটা যুদ্ধজাহাজ এবং ৮টা যুদ্ধবিমান আসতো এবং

৪। সেগুলিকে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী এসকর্ট করে বঙ্গোপসাগরে নিয়ে আসতো।

তাহলেই বোঝা যেতো কে কার কথা শোনে। মিয়ানমার যদি বুঝতে পারতো যে এই ভীতি প্রদর্শন শুধু ফাঁকা বুলি নয়; এরা দরকার হলে সামরিক অভিযানেও পিছপা হবে না, তাহলে মিয়ানমার সরকার সত্যিকারের ভয় পেতো।

আন্ডারওয়াটার জয়েন্ট এক্সারসাইজ

তবে যেহেতু সেবারে এটা করা হয়নি, তাই এবারে আরও কঠিন হবার সময় এসেছে। মিয়ানমারের সামরিক বিমান বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করার ফলে কঠিন প্রত্যুত্তর দেবারই গ্রাউন্ড প্রস্তুত হয়েছে। এই প্রত্যুত্তর দিতে হবে বাংলাদেশের ডিটারেন্ট প্ল্যাটফর্ম সাবমেরিনকে ব্যবহার করে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কিনেছে অল্প কিছুদিন। তাই সাবমেরিন অপারেশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অনেক কিছুই শেখার রয়েছে। আবার বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার কাছ থেকেও জয়েন্ট এক্সারসাইজের মাধ্যমে সহায়তা নিতে পারে। তাদের সাবমেরিন বহরকে বাংলাদেশে নিয়ে এসে বঙ্গোপসাগরে মহড়া দেয়া যায়। এতে সবাই উপকৃত হবে। চীনও বাংলাদেশকে এক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। চীনের সাবমেরিন ভারত মহাসাগরে নতুন নয়। তাই চীনের সাবমেরিনের সাথেও বঙ্গোপসাগরে যৌথ মহড়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্রুদের স্কিল ডেভেলপ করা যেতে পারে।
  
তুরস্কের সাবমেরিনগুলি জার্মান প্রযুক্তির; তাই সন্দেহাতীতভাবে আরও শক্ত ডিটারেন্ট তৈরি করতে সক্ষম। বঙ্গোপসাগর টহল দিতে এবং বাংলাদেশের সী-লেন-কে শত্রুর ভীতি প্রদর্শন থেকে দূরে রাখতে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৮ থেকে ১২টা সাবমেরিন লাগবে। আর প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকলে সংখ্যা আরও অনেক বাড়াতে হতে পারে। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য যেহেতু সমুদ্রপথে হয়, তাই এর কোন বিকল্প বাংলাদেশের সামনে নেই।


আরও উন্নত প্ল্যাটফর্ম

তবে এক্ষেত্রে আরও একটা বিষয় গুরুত পাবে। বাংলাদেশের সাবমেরিনগুলি মোটামুটি কর্মক্ষম হলেও একেবারে লেটেস্ট মডেলের কিন্তু নয়, যা কিনা তাদের ডিটারেন্ট ভ্যালুকে কমিয়ে দেয়। কাজেই বাংলাদেশকে খুব শীঘ্রই আরও সাবমেরিন যোগাড় করতে হবে। নতুন তৈরি করে সাবমেরিন যেমন আনতে হবে, তেমনি ‘অফ-দ্যা-শেলফ’ সাবমেরিনও খুঁজতে হবে, যা কিনা প্রযুক্তির দিক থেকে টাইপ-০৩৫জি থেকে আরও উন্নত। এক্ষেত্রে চীন যেমন ভালো অপশন দেবে, তেমনি তুরস্ক বা দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও উন্নত প্রযুক্তির সাবমেরিন আনা যেতে পারে। তুরস্কের সাবমেরিনগুলি জার্মান প্রযুক্তির; তাই সন্দেহাতীতভাবে আরও শক্ত ডিটারেন্ট তৈরি করতে সক্ষম। বঙ্গোপসাগর টহল দিতে এবং বাংলাদেশের সী-লেন-কে শত্রুর ভীতি প্রদর্শন থেকে দূরে রাখতে বাংলাদেশের কমপক্ষে ৮ থেকে ১২টা সাবমেরিন লাগবে। আর প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকলে সংখ্যা আরও অনেক বাড়াতে হতে পারে। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য যেহেতু সমুদ্রপথে হয়, তাই এর কোন বিকল্প বাংলাদেশের সামনে নেই।

আর অন্যদিকে মিয়ানমারের কৌশলগত অবস্থান খুব দুর্বল। বাংলাদেশ এই দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে পারে খুব সহজেই। সিতওয়ে বন্দর খুবই দুর্বল অবস্থানে, যে বন্দরের উপরে মিয়ানমারের রাখাইনের বেশিরভাগটাই নির্ভরশীল। এরকম দুর্বল অবস্থানে থেকেও মিয়ানমার বাংলাদেশের সাথে ঝামেলা করতে পারছে – এটা বাংলাদেশের দুর্বল কূটনীতির বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ তার ডিটারেন্ট তৈরিতে আরও মনোযোগী হলে, এবং বর্তমানের ডিটারেন্টগুলির উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করলে মিয়ানমার এধরনের আচরণ করতে সাহস পেতো না কখনোই। মিয়ানমারকে শক্তভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে যে তাদের ভারত-মার্কিন ঔপনিবেশিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বাংলাদেশ সহ্য করবে না।

Monday, 28 August 2017

মিয়ানমার তার কৌশলগত অবস্থান কতটুকু বোঝে?

২৮শে অগাস্ট ২০১৭



মিয়ানমারের রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা শুরু হয়েছে। জাতিগত এই সহিংসতাকে ঔপনিবেশিক শক্তিরা জিইয়ে রাখছে এই এলাকাকে (বঙ্গোপসাগর এলাকা) নিয়ন্ত্রণে রাখতে। পরাশক্তি কখনোই চায় না যে বঙ্গোপসাগরে কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়ে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত ব্যালান্সকে পরিবর্তন করে দেবে। ঠিক যখনই পরাশক্তি তার নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে, ঠিক সেসময়েই সে কোন না কোন ঝামেলা পাকিয়ে তার নিয়ন্ত্রণ পূণপ্রতিষ্ঠা করতে চায়। মিয়ানমারের এই সমস্যাটাও ঠিক তেমনই। কিছুদিন পরপরই সেখানে জাতিগত সমস্যা শুরু হয়। এক্ষেত্রে সমস্যা শুরু হওয়াটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কখন এই সমস্যার আবির্ভাব হচ্ছে। মিয়ানমারের সরকার যে পরাশক্তির প্ররোচনায় রাখাইনে জাতিগত সমস্যা জিইয়ে রাখছে, তা বুঝতে বাকি থাকে না। এই কার্যকলাপে মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে ভারত, যে কিনা এখন ভারত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র। সিকিম-ভুটান সীমান্তে চীনের রাস্তা নির্মাণে ভারতের বাধা দেয়া এবং এর ফলশ্রুতিতে ভারত-চীনের উত্তেজনা এবং বঙ্গোপসাগরে ভারত-মার্কিন নৌ-মহড়া “এক্সারসাইজ মালাবার-২০১৭” এই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের তৎপরতার পরিচয় দেয়। তবে একইসাথে এই কর্মকান্ডগুলি বলে দিচ্ছে যে পরাশক্তি তার নিজ দেশে যে অস্থিরতায় রয়েছে, সেই একই অস্থিরতায় সে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তার নিয়ন্ত্রণ হারানো নিয়ে।  

  

তবে এখানে শুধু পরাশক্তির কথা বললেই হবে না, মিয়ানমারের কথাও আলোচনা আসা উচিৎ। মিয়ানমারের সরকার হয়তো ভুলে যাচ্ছে যে তাদের কৌশলগত অবস্থান তাদের এধরনের প্রক্সি-যুদ্ধকে সমর্থন করে না। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে মিয়ানমার একখানা তাসের ঘরের উপরে দাঁড়িয়ে থেকে নৃত্য করছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ভৌগোলিক সীমানার দিকে তাকালেই বোঝা যাবে যে মিয়ানমারের রাখাইন মিয়ানমারের বাকি অংশের সাথে যতটা না সংযুক্ত, তার চাইতে বেশি ভালোভাবে সংযুক্ত বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সাথে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের মংডু শহরের সাথে মিয়ানমারের বাকি অংশের যোগাযোগের মূল মাধ্যম হলো মংডু-বুথিডুয়াং সড়ক। এই সড়ক গিয়েছে সুউচ্চ আরাকান পর্বতের মাঝ দিয়ে এবং কিছু স্থানে পাহাড় কেটে তৈরি করা টানেলের মাঝ দিয়ে। এই টানেল কোন কারণে বন্ধ হয়ে গেলে মংডুর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা মিয়ানমারের পক্ষে খুবই কঠিন হবে। শুধু তা-ই নয়, বুথিডুয়াং হয়ে যে রাস্তাটা কালাদান নদীর অববাহিকা বেয়ে দক্ষিণে চলে গিয়ে বাকি মিয়ানমারের সাথে যুক্ত হয়েছে, সেই রাস্তা থমকে দাঁড়িয়েছে সিতওয়ের উত্তরে বিরাট এক নদীর তীরে। মায়ু নদীর ঐ মোহনাতে কোন সেতু নেই, যা দিয়ে সহজে যানবাহন পার করা সম্ভব। আবার মংডু থেকে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে দক্ষিণের রাস্তাটাও ঐ একই স্থানে এসে মায়ু নদীর মোহনায় থমকে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত এলাকায় সৈন্য সমাবেশ করতে মিয়ানমারের যে লজিস্টিক্যাল নেটওয়ার্কের উপরে নির্ভর করতে হয়, তা অন্যন্ত দুর্বল এবং অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় একেবারেই অপ্রতুল।

রাখাইনের সিতওয়ে বন্দরের একপাশে যেমন মায়ু নদী, অন্যপাশে রয়েছে কালাদান নদী। কালাদান নদী ব্যবহার করে ভারত তার বিচ্ছন্নতাকামী মিজোরাম এবং মণিপুর রাজ্যের লাগাম টেনে রাখতে চাইছে। কোলকাতা থেকে পরিবহণ জাহাজ বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে কালাদান নদী হয়ে উত্তরে যাবে এবং একটা পর্যায়ে মালামাল ল্যান্ড করাবার পরে ট্রাকে করে সেগুলি মিজোরামে নেয়া হবে। এভাবেই সিতওয়ের আশেপাশের এই নদী-বেষ্টিত অঞ্চলটা মিয়ানমারের জন্যে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারতের জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই পুরো অঞ্চলটাই নদীর উপরে নির্ভরশীল এবং এই অঞ্চলের সাথে মিয়ানমারের বাকি অংশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যারপরনাই খারাপ। সিতওয়ে বন্দর নৌ-অবরোধে পড়লে মিয়ানমারের পক্ষে মংডু ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব। অথচ গোটা-দুই সাবমেরিনের মাধ্যমেই সিতওয়ে বন্দরের আশেপাশের এই এলাকাকে অবরোধে ফেলে দেয়া যায়। আর এরকম পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর পক্ষেও এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখাটা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তার উপরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মতো রাষ্ট্রগুলি মিয়ানমারের রাখাইন নীতির যেখানে ঘোর বিরোধী, সেখানে এই তিন দেশের নৌশক্তির কাছে মিয়ানমারকে অসহায়ই বলতে হবে। এই অসহায়ত্ব থেকে উদ্ধার পেতে মিয়ানমারকে আবারও তাদেরই (যুক্তরাষ্ট্র-ভারত) সরণাপন্ন হতে হবে, যারা রাখাইনের সমস্যা জিইয়ে রাখায় প্ররোচনা দিচ্ছে। 


মংডু-বুথিডুয়াং রাস্তাখানি নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের সাথে জাপানি সেনাদের যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে এটা অন্ততঃ পরিষ্কার যে বিশাল উঁচু আরাকান পর্বত পাড়ি দিয়ে রাখাইন ধরে রাখাটা মিয়ানমারের পক্ষে চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ মংডু মিয়ানমারের অভ্যন্তরের চাইতে বাংলাদেশের সীমানা থেকেই বরং বেশি কাছে অবস্থিত। মিয়ানমারকে দিয়ে রাখাইনে সমস্যা সৃষ্টি করার সময়ে মিয়ানমার সরকারকে কেউ পরামর্শ দেয়নি যে কতটা দুর্বল কৌশলগত অবস্থানে থেকে মিয়ানমার রাখাইনে এই নৃশংসতা চালিয়ে নিচ্ছে। তাদের বোঝা উচিত ছিল যে এই প্রক্সি একশনে তাদের লাভ তো কিছু হবেই না, বরং তাদের রক্তকে ব্যবহার করে মার্কিন-ভারতীয় গোয়েন্দারা নিজেদের কাজ হাসিল করে নেবে।

তার উপরে মিয়ানমার সরকার ভেবে দেখেছে কি, যে সিতওয়ে বন্দরে অবরোধের মুখে পড়ে এবং মংডুর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পুরো রাখাইনই যদি তাদের হাতছাড়া হবার উপক্রম হয়, তাহলে মিয়ানমারের কাচিন এবং কারেন বিদ্রোহীরা কি করবে? চীনের ভূমিকাই বা তখন কি হবে? রাখাইনে সমস্যা জিইয়ে রাখলে রাখাইন হারাবার সাথে সাথে মিয়ানমার নামের দেশটারই যে অস্তিত্ব থাকবে না, তা কি মিয়ানমার সরকার ভেবে দেখেছে? আশেপাশের শক্তিরা তখন মিয়ানমারকে ছিঁড়ে খাবে। মিয়ানমার সরকার ভারত-মার্কিন ক্রীড়নক হয়ে কাজ করছে এবং নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে – এটা বোঝাবার মতো লোক সম্ভবত নে পি ডাউ-তে নেই।

Tuesday, 15 August 2017

একুশ শতকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির গুরুত্ব

১৬ই অগাস্ট ২০১৭

বাংলাদেশের সীমানা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দু’টা রাষ্ট্রের জোর সামরিক কর্মকান্ড চললেও এদেশের মানুষ মুভি দেখার মতো করে তাকিয়ে আছে! এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তারা অনুধাবনই করতে পারছে না! অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসেই ভূরাজনীতির কিছু চমৎকার উদাহরণ রয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো। বঙ্গবন্ধুর নাম এসে যায় সেসব ভূরাজনীতির আলোকে।



বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি ও ঘুমন্ত জনতা

কিছুদিন আগেই জুলাই মাসে বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তি এবং তার দোসর ভারত আয়োজন করেছিল সামরিক মহড়া “মালাবার-২০১৭”। বাংলাদেশ বাণিজ্য-নির্ভর দেশ; দেশটার ৯০ শতাংশের উপরে বণিজ্য হয় সমুদ্রপথে। এই সমুদ্রপথ গিয়েছে বঙ্গোপসাগরের মাঝ দিয়ে, যেকারণে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে ওঁতপ্রোঁতভাবে জড়িত। আর বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের উপরে পরাশক্তি এবং তার দোসরেরা যখন অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে মেতেছে, তখন এদেশের মানুষ নিশ্চিন্ত থাকবে – এটা কোন যুক্তির কথা হতে পারে না! ‘আমার উঠানে ডাকাতের সরদার মদের আসর বসালেও আমি নিশ্চিন্ত থাকবো’ –এটা কোন ধরনের মানসিকতা? বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে উদাসীনতা এদেশের জনগণের জন্যে বিপদ ডেকে নিয়ে আসছে।

চীন-ভারত সীমান্তে উত্তেজনার ব্যাপারটাও সেরকমই।[1] বাংলাদেশের সীমানা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দু’টা রাষ্ট্রের জোর সামরিক কর্মকান্ড চলছে, আর এদেশের মানুষ মুভি দেখার মতো করে তাকিয়ে আছে! এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকাটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা তারা অনুধাবনই করতে পারছে না! বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় বেশিরভাগ মানুষই ঐদাসীন্যের চরম উদাহরণ রেখে চলেছেন এবং আমজনতার মতোই নির্বোধ চিত্তে ঘটনা দেখছেন। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসেই ভূরাজনীতির কিছু চমৎকার উদাহরণ রয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো। সেই আলোচনায় যাবার আগে কিছু ঘটনার পর্যালোচনা জরুরি।

বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৭ সালে চীনে যান। চীনের সাথে বঙ্গবন্ধুর সুসম্পর্কে ভাটা ফেলার চেষ্টা চলেছে ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে। মার্কিনীরা চেয়েছিল বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আবার ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশ চীন থেকে দূরে থাকুক। যেকারণে শুধু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়েই বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে এগুতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এখানকার রাষ্ট্র এবং জনগণ চীনকে কখনোই প্রত্যাখ্যান করেনি; ওয়াশিংটনের ছলচাতুরি এবং ভারতের বারংবার হস্তক্ষেপের কারণেই চীনের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব রয়ে গিয়েছিল।


বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের অগ্রগতি

২০১৬-এর জানুয়ারীতে বাংলাদেশে চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত চাই জি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ের চীনা ভাষায় অনূদিত একটা কপি প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন যে বঙ্গবন্ধুর চীন সফর নিয়ে একটা বই প্রকাশ করা হবে, সেটারও চীনা ভাষায় অনূবাদের দরকার হবে। বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে এবং ১৯৫৭ সালে চীনে যান। বঙ্গবন্ধুর চীন সফরকে পাকিস্তান সরকার তখন ভালো চোখে দেখেনি, কারণ তখন চীন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী। তিনি লেখেন, “আমার পাসপোর্টের জন্য দরখাস্ত করলাম, পাওয়ার আশা আমাদের খুবই কম। কারণ, সরকার ও তার দলীয় সভ্যরা তো ক্ষেপে অস্থির। কমিউনিস্ট না হলে কমিউনিস্ট চীনে যেতে চায়? শান্তি সন্মেলন তো না, কমিউনিস্ট পার্টির সভা, এমনি নানা কথা শুরু করে দিল”। [2] ভূরাজনীতি যে পরিবর্তিত হয়, সেটা খুব সহজেই বোঝা যায় চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক থেকে। যেখানে ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে চীনে যেতে দেবে কিনা, সেটাতে সন্দেহ ছিল, সেখানে ১৯৭১ সালেই চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক বেশ গাড় হয়ে যায়। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের জের ধরেই পাকিস্তানের সাথে চীনের সম্পর্কোন্নয়ন হতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সম্পর্ক ওঠা-নামার ব্যাতিক্রম হয়নি।

চীনের সাথে বঙ্গবন্ধুর এই সম্পর্কে ভাটা ফেলার চেষ্টা চলেছে ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে। মার্কিনীরা চেয়েছিল বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে তারাই নিয়ন্ত্রণ করবে। আবার ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশ চীন থেকে দূরে থাকুক। যেকারণে শুধু ১৯৭৫ পরবর্তী সময়েই বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্ককে এগুতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে এখানকার রাষ্ট্র এবং জনগণ চীনকে কখনোই প্রত্যাখ্যান করেনি; ওয়াশিংটনের ছলচাতুরি এবং ভারতের বারংবার হস্তক্ষেপের কারণেই চীনের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব রয়ে গিয়েছিল। তবে এই ছলচাতুরি পেরিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। এবং ২০১৬ সালে এসে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী অনূবাদ এই বার্তাই বহণ করে। চীন বাংলাদেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সহযোগী। এবং একইসাথে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর একটা বড় অংশ চীনাদের যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত। অন্যভাবে বলতে গেলে, ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে চীনের সহায়তাতেই বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা উল্টে যায়। ১৯৭০-এর দশকে ভারত যেমন মনে করতো যে তারা যেকোন সময় ‘সিকিম-স্টাইলে’ বাংলাদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে, সেটা চীনা সহায়তাতেই উল্টে যায়। ভারত অনেক আগেই বুঝে গেছে যে বাংলাদেশ এখন আর ভারতের গিলে ফেলার মতো অবস্থায় নেই (Too big to swallow); বাস্তবতা পাল্টে গেছে। তবে এখনও কেউ কেউ বাংলাদেশের অসহায়ত্বের কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে পালে হাওয়া লাগাবার একটা বৃথা চেষ্টা করছেন।
 
আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাউয়ারি বোরেমেদ্দিন এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধু (১৯৭৪)। ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, সেটা ভারত তার স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখেছিল। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ইসলামিক চেতনার উত্থানকে ভারত ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তার জন্যে বিপজ্জনক হিসেবে দেখেছে। একারণেই এদেশে ভারতের লবি গ্রুপগুলি বঙ্গবন্ধুর মুসলিম দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টাকে প্রতিহত করার যারপরনাই চেষ্টা করেছে।


ইসলামিক চেতনার ভূরাজনীতি

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের মাঝেই চীনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে যেতে না পারলেও আরও কিছু কাজ করে গিয়েছেন, যা কিনা ভূরাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী করেছিল। ১৯৭১ সালে ঠান্ডা যুদ্ধ চরমে। তখন কিছু মুসলিম দেশের সরকার আমেরিকাপন্থী, আর কিছু দেশের সরকার সোভিয়েতপন্থী। তবে সেসব দেশের মুসলিম জনগণ সর্বদাই ছিল শাসকদের থেকে বিচ্ছিন্ন। ইসলামের বিশ্বাসের চেতনার কারণেই মুসলিমদের মাঝে বিভেদকে তারা পছন্দ করেনি; এবং বিভাজনের রাজনীতিকে পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই দেখেছে। বঙ্গবন্ধু চীনে গিয়েও ইসলামকে খুঁজে পেয়েছেন; লিখেছেন, “চীনে কনফুসিয়ান ধর্মের লোকেরা সংখ্যায় বেশি। তারপর বৌদ্ধ, মুসলমানের সংখ্যাও কম না, কিছু খ্রিস্টানও আছে। একটা মসজিদে গিয়েছিলাম, তারা বললেন, ধর্ম কর্মে বাধা দেয় না এবং সাহায্যও করে না”। [2] কিন্তু মাওলানা ভাসানীর সাথে যে মানুষটা জেলের ভেতরে জামাতে নামাজ পড়তো এবং নিয়মিত কুরআন পাঠ করতো [2], তাকে কেন ইসলাম-বিদ্বেষী তকমা নিতে হয়েছে?

১৯৭১-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু মুসলিম রাষ্ট্রগুলির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন, সেটা ভারত তার স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখেছিল। কারণ বাংলাদেশের মানুষের ইসলামিক চেতনার উত্থানকে ভারত ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তার জন্যে বিপজ্জনক হিসেবে দেখেছে। একারণেই এদেশে ভারতের লবি গ্রুপগুলি বঙ্গবন্ধুর মুসলিম দেশগুলির সাথে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টাকে প্রতিহত করার যারপরনাই চেষ্টা করেছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলি একইসাথে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পিছনে কাজ করেছে। লাহোরে ইসলামিক সামিট কনফারেন্সে বাংলাদেশকে যুক্ত করতে ইন্দোনেশিয়া অনেক চেষ্টা করেছে। [3] ১৯৭৪-এর ফেব্রুয়ারী মাসে বাংলাদেশ সফরে আসেন মিশরের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং সৌদি সরকারের একজন প্রতিনিধি। কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ জাবের আল-আহমেদ আল-সাবাহ-ও ঢাকা সফরে আসেন আলজেরিয়া, লেবানন, সেনেগাল, সোমালিয়া এবং প্যালেস্টাইনের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়ে। এখানে যুক্তরাষ্ট্র কলকাঠি নাড়লেও মুসলিম ভাইদের একে অপরের সাথে মিলিত হবার বাসনা কখনোই দমে যায়নি। যেকারণে প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ার নির্যাতিত মানুষের সাথে এদেশের মানুষ সর্বদাই সুর মিলিয়েছে।

ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে ভারতের ভয় ছিল যেকারণে

বঙ্গবন্ধুর আরও একটা দিক অনেকেই হিসেব করেনা, তা হলো, তার সন্মোহনী ক্ষমতা। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের কংগ্রেস পার্টির দহরম মহরম ছিল বেশি। আর ভারতে চার দশকের বেশি সময় কংগ্রেস পার্টি ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগকে তথা বঙ্গবন্ধুকে ভারত-ঘেঁষা তকমাই নিতে হয়েছে। অথচ সকলেই ভুলে যায় যে মহত্মা গান্ধীর খুনের পেছনে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সরাসরি ইন্ধন ছিল।[4] অর্থাৎ কংগ্রেসের মাঝে বিভিন্ন গ্রুপ ছিল। এই গ্রুপগুলি সবসময়ই হিসেব কষেছে কংগ্রেসের সামনের দিনগুলিতে নেতৃত্ব কে দেবে। ইন্দিরা গান্ধীর পর কংগ্রেসে যে তেমন কোন বড় নেতৃত্ব আসবে না, সেটা মোটামুটি বুঝে গিয়েছিল অনেকেই। আর বাংলাদেশের সাথে ভারতের, বিশেষতঃ পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীদের সুসম্পর্কের কারণে ঐ গ্রুপগুলি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে শেখ পরিবারের দিকে দৃষ্টি রেখেছিল সবসময়। তারা শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্বকে আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখেছে। ১৯৭০-এর নির্বাচনের পরে বঙ্গবন্ধু যখন পুরো পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছিলেন, তখন ভারতের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল! পাকিস্তানে বাঙ্গালী (অবশ্যই মুসলিম) প্রধানমন্ত্রী? তা-ও আবার শেখ মুজিবুর রহমান? পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাঙ্গালী হলে ভারতের বাঙ্গালীদের কি হবে? ভারতের মুসলিমদেরই বা কি হবে? সেই গ্রুপগুলি শেখ মুজিবের মাঝে ভারতের অস্তিত্ব বিপন্ন হবার ভয় দেখেছিল। তারা জানতো যে পশ্চিম পাকিস্তানে এমন কোন নেতা নেই যে কিনা ভারতের জনগণের বড় একটা অংশের সমর্থন আদায় করতে পারবে; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বেলায় ব্যাপারটা কিন্তু তা ছিল না। ১৯৪৭ সালে কোলকাতা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু কতটা ব্যাথিত হয়েছিলেন [2], সেটা দেখলেই বোঝা যায় যে বঙ্গবন্ধুর মানুষের প্রতি ভালোবাসা র‍্যাডক্লিফ-মাউন্টব্যাটেনের কৃত্রিম সীমানা ছাপিয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সময় আল্লাহাবাদে বঙ্গবন্ধু মুসলিমদের রক্ষায় যে ভূমিকা [2] রেখেছিলেন, সেটা ঐ গ্রুপগুলি জানতো। তারা বঙ্গবন্ধুর মাঝে পুরো ভারতের মুসলিমদের নেতৃত্ব দেবার সক্ষমতা দেখতে পেয়েছিল। বাংলার সুলতানদের ইতিহাস তারা ভোলেনি; তাই বঙ্গবন্ধুকেও তারা শত্রু হিসেবেই দেখেছে।
 
জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে বঙ্গবন্ধু (১৯৭৪)। বাংলাদেশে ভারতপন্থীরা আল্ট্রা-সেকুলাররা এবং পাকিস্তানের জামাত-ই-ইসলামী একইসাথে বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমনের বিরোধিতা করেছে এবং বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়নে বাধা দিয়েছে। বলাই বাহুল্য যে এরা দু’পক্ষই ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে। ভারতকে টিকিয়ে রাখার পরাশক্তির এই চেষ্টাকে এখনও জিইয়ে রেখে চলেছে জামাত-ই-ইসলামী। উপমহাদেশে মুসলিম উত্থান ঠেকাবার পরাশক্তির শেষ সম্বল এরা।


বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান রাজনীতির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ভারতকে যেভাবে ব্যালান্স করেছিলেন, সেটা দিল্লীতে অনেকেই গিলতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভারত ভালো সম্পর্কই রেখেছিল। ১৯৭৫ অগাস্ট-পরবর্তী সরকারের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশে তার অবস্থানকে পাকাপোক্ত রাখতে চেয়েছিল। পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থানগুলিতে থেকেও ভারতকে আলাদা করা যাবে না। ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমন করেন, যা পাকিস্তানে অনেকেই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছিলেন। সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরোধিতা করেছিল পাকিস্তানের ‘জামাত-ই-ইসলামী’ এবং ‘তেহরিক-ই-ইস্তিকলাল’। বিরোধীদলীয় পত্রিকা ‘নাওয়াই-ই-ওয়াক্ত’ একই সুরে কথা বলেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে ভারতপন্থীরা আল্ট্রা-সেকুলাররা এবং পাকিস্তানের জামাত-ই-ইসলামী একইসাথে বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমনের বিরোধিতা করেছে এবং বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কোন্নয়নে বাধা দিয়েছে। বলাই বাহুল্য যে এরা দু’পক্ষই ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেছে। ভারতকে টিকিয়ে রাখার পরাশক্তির এই চেষ্টাকে এখনও জিইয়ে রেখে চলেছে জামাত-ই-ইসলামী। উপমহাদেশে মুসলিম উত্থান ঠেকাবার পরাশক্তির শেষ সম্বল এরা।

বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন যে একটা নতুন রাষ্ট্রকে দাঁড় করাতে হলে প্রচন্ড পরিশ্রমের গত্যন্তর নেই, কিন্তু একইসাথে ভারতের পেটে ঢুকে গেলে সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হবে। এই লক্ষ্যেই তিনি ভারতকে সর্বদা ব্যালান্স করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে তিনি পছন্দ করতেন না এবং জানতেন যে সকলকিছুর মূলেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কলকাঠি; তারপরেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক রেখেছিলেন ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়নকে ব্যালান্স করার জন্যে। তবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কোন্নয়নকে ভারত একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মের পিছনে ভারতের ইন্ধন দেবার মূল আগ্রহটা ছিল পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার সুযোগের কারণে। সেখানে ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলার সুযোগ না আসলে ভারত হয়তো অতটা ঝুঁকি নিতো না, যতটা তারা নিয়েছিল।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা হবার ফলে ভারত যে স্বস্তি পেয়েছিল, সেটারই উল্টোটা তৈরি হয় যখন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন শুরু করেন। বস্তুতঃ ১৯৭৪ সালেই ভারত বুঝে যায় যে বঙ্গবন্ধু ভারতের জন্যে হুমকি হতে চলেছেন। এসময়েই ভারতের ঐ গ্রুপগুলি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে ওঠে।


 
পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াও পাকিস্তান তৈরি করছে (অনেক ক্ষেত্রেই চীনের সহায়তায়) নিজস্ব ফাইটার বিমান JF-17, ট্রেইনার বিমান Super Mushshak, ট্যাঙ্ক Al-Khalid, ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল, ইত্যাদি। পাকিস্তান তার এই সক্ষমতা তৈরিতে বাংলাদেশের অবদানকে অস্বীকার করতে পারে না কোনভাবেই। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশের উচিত তার হিস্যা দাবি করা। এই হিস্যা হওয়া উচিত সেই দিকগুলিতে, যেখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের চাইতে ভালো করেছে - যেমন সামরিক ইন্ডাস্ট্রিতে।


একুশ শতকে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির উদাহরণ

বাংলাদেশের ভূরাজনীতি এখন সেই স্থানেই এসেছে, যেখানে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ডগুলি খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। বঙ্গোপসাগরে একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত যখন একযোগে কাজ করছে, তখন বাংলাদেশের একটা শক্ত ভূরাজনৈতিক অবস্থান জরুরি হয়ে পড়েছে। চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ; একইসাথে মুসলিম বিশ্বের সাথেও বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হওয়াটা জরুরি। এমতাবস্থায় পরাশক্তি এবং তার দোসর ভারতের ইন্ধনপ্রাপ্তদের সাথে সুর মিলিয়ে ভারতের স্বার্থ বাস্তবায়নের দিন শেষ। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের সাথে বঙ্গবন্ধুর দরকষাকষির মূলে ছিল পাকিস্তানের সম্পদের ন্যায্য হিস্যা। বঙ্গবন্ধু জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশের জন্যে পাকিস্তানের ৫৬% সম্পদ চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের উন্নয়নে বাংলাদেশের বিরাট ভূমিকা রয়েছে, যা কিনা পরাশক্তির ইন্ধনপুষ্ট পাকিস্তানের নেতৃত্ব বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। এভাবে পাকিস্তানের উন্নয়নে বাংলাদেশের মানুষের যে হক রয়েছে, তা আদায় করা হয়নি কখনোই। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এখন পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তান এমন একটা জিনিস পেরেছে, যা বাংলাদেশ পারেনি ৪৬ বছরে – সামরিক সক্ষমতা। পাকিস্তানের সাথে থাকার সময়ে পূর্ব বাংলার মানুষের যে দাবিগুলি ছিল, তার মাঝে একটা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন। পাকিস্তানের পশ্চিমাপুষ্ট নেতৃত্ব পূর্ব বাংলার মানুষকে সর্বদাই ঠকিয়েছে; প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও তা-ই। বিভাজনের পরে বাংলাদেশ সামরিক দিক থেকে উন্নতি করতে না পারলেও পাকিস্তান প্রভূত উন্নতি করেছে সামরিক ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার দিক থেকে। পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াও পাকিস্তান তৈরি করছে (অনেক ক্ষেত্রেই চীনের সহায়তায়) নিজস্ব ফাইটার বিমান JF-17, ট্রেইনার বিমান Super Mushshak, ট্যাঙ্ক Al-Khalid, ব্যালিস্টিক মিসাইল, ক্রুজ মিসাইল, ইত্যাদি। পাকিস্তান তার এই সক্ষমতা তৈরিতে বাংলাদেশের অবদানকে অস্বীকার করতে পারে না কোনভাবেই। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশের উচিত তার হিস্যা দাবি করা। এই হিস্যা হওয়া উচিত সেই দিকগুলিতে, যেখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের চাইতে ভালো করেছে। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি; তাই বলে বাংলাদেশের জনগণ কি সেটা ভুলে গেছে? মার্কিনপন্থী জামাত-ই-ইসলামীর এবং ভারতপন্থী আল্ট্রা-সেকুলারদের বঙ্গবন্ধুকে “ভারতের দালাল” হিসেবে প্রচার করার মাঝে বঙ্গবন্ধুর সেই প্রধানমন্ত্রীত্বের দাবি কি ঢাকা পড়ে যায়? নাকি তাঁর ভারতের বাঙ্গালীদের বিপ্লবী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবার সম্ভাবনাকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র চেষ্টা করে? অথবা তাঁর পুরো পাকিস্তান ছাড়াও ভারতের কোটি কোটি নির্যাতিত মুসলিমদের অবিসংবাদিত নেতা হবার মতো মহাবিপদ থেকে ভারতকে রক্ষা করে? নাকি ভারতের সাড়ে পাঁচশ’ বছরের মুসলিম শাসনের কথা মনে করিয়ে দেয়?

পৃথিবীর একমাত্র পারমাণবিক বোমা হামলা হয়েছে জাপানের উপরে; যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা। লাখো মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটেছে এতে। ১৯৪৫-পরবর্তী সময়ে জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিতে বাধ্য ছিল। তবে একুশ শতকে এসে যখন জাপানের সামরিক শক্তির পুণরুত্থান দেখা যাচ্ছে, তখন অস্বীকার করার উপায় নেই যে জাপান তার এই সামরিক সক্ষমতা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি নিয়েই। জাপান এখন সামরিক ইন্ডাস্ট্রির ‘পাওয়ারহাউজ’। বাংলাদেশকেও জাপানকে অনুসরণ করতে হবে সামরিক প্রযুক্তি এগিয়ে নিতে। পাকিস্তানের কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি আমদানি একদিকে যেমন ভারতকে ব্যালান্স করার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ, একইসাথে বাংলাদেশের মানুষের হক আদায়ের জন্যে জরুরি। জামাত-ই-ইসলামীর মত পরাশক্তির দালালেরা চাইবেই বিভাজনের রাজনীতি বহাল থাকুক। কিন্তু তাই বলে এই অঞ্চলের মুসলিমদের হক আদায় হবে না – এটা তো হতে পারে না।

------------------------

[1] ‘আঞ্চলিক যোগাযোগের ভূরাজনীতি – হিমালয়ে ভারত-চীন দ্বন্দ্ব’, সাম্প্রতিক দেশকাল, ১০ অগাস্ট ২০১৭

[2] ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ – শেখ মুজিবুর রহমান

[3] ‘The Bangladesh Military Coup and the CIA Link’ – B. Z. Khasru

[4] ‘ভারত স্বাধীন হল’ – মৌলানা আবুল কালাম আজাদ